২০১৮ বিশ্বকাপ: ইউরোর আবহে ফ্রান্সের ‘দ্বিতীয়’

কোয়ার্টার-ফাইনালের ছয় দল ছিল ইউরোপের, সেমি-ফাইনালের চারটিই তাদের।

ইকবাল শাহরিয়ারবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 18 Nov 2022, 06:42 AM
Updated : 18 Nov 2022, 06:42 AM

এতো খেলোয়াড় যে, একটু এদিক-সেদিক করে প্রায় সমান শক্তির দুটি জাতীয় দল গড়া সম্ভব! তাই দারুণ পারফরম্যান্সের পরও জায়গা হয়নি অনেকেরই। ভিন্ন এক কারণে দলে রাখা হয়নি করিম বেনেজেমাকে। তার অভাব একবারের জন্যও অনুভব করেনি ফ্রান্স! এমনই গভীরতা ছিল তাদের স্কোয়াডের। অমিত শক্তির এই দলটিই জেতে বিশ্বকাপ, দ্বিতীয়বার।

কত বিতর্ক, কত বাধা আর সমালোচনা পেরিয়ে ২০১৮ সালে সফলভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করে রাশিয়া। ২০১০ সালের ২ জুন পর্তুগাল-স্পেন, নেদারল্যান্ডস-বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ডকে ভোটে হারিয়ে ২১তম আসর আয়োজনের দায়িত্ব পায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশটি।

এরপর কম জল ঘোলা হয়নি। ফিফার বিরুদ্ধে রাশিয়াকে অন্যায় সুবিধা দেয়ার অভিযোগ আনে ইংল্যান্ড।

১৪ জুন থেকে ১৫ জুলাই অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টে সরাসরি খেলে রাশিয়া। বাছাই পর্ব পেরিয়ে আসে ৩১ দল, এর ১৩টি ইউরোপের। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা থেকে আসে পাঁচটি করে দল। কনকাকাফ অঞ্চল থেকে তিনটি। 

বিশ্বকাপ অভিষেক হয় আইসল্যান্ড ও পানামার। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় গত আসরের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি!

প্রথম রাউন্ড:

ফরম্যাটে কোনো পরিবর্তন হয়নি। আগের মতোই ৩২ দল খেলে আট গ্রুপে। প্রতি গ্রুপের সেরা দুই দল যায় দ্বিতীয় রাউন্ডে। 

গ্রুপ এ: উরুগুয়ে, রাশিয়া, সৌদি আরব, মিশর

গ্রুপ বি: স্পেন,পর্তুগাল, ইরান, মরক্কো

গ্রুপ সি: ফ্রান্স, ডেনমার্ক, পেরু, অস্ট্রেলিয়া

গ্রুপ ডি: ক্রোয়েশিয়া, আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া, আইসল্যান্ড

গ্রুপ ই: ব্রাজিল, সুইজারল্যান্ড, সার্বিয়া, কোস্টা রিকা

গ্রুপ এফ: সুইডেন, মেক্সিকো, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি

গ্রুপ জি: বেলজিয়াম, ইংল্যান্ড, তিউনিসিয়া, পানামা

গ্রুপ এইচ: কলম্বিয়া, জাপান, সেনেগাল, পোল্যান্ড 

গ্রুপ ‘এ’ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় উরুগুয়ে ও রাশিয়া। এই গ্রুপে কোনো ম্যাচ ড্র হয়নি। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় উরুগুয়ে। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ রাশিয়া। সৌদি আরবের কাছে হেরে শূন্য হাতে ফেরে মিশর। 

গ্রুপ ‘বি’ থেকে পরের ধাপে যায় স্পেন ও পর্তুগাল। এক জয় ও দুই ড্রয়ে দুই দেশের পয়েন্ট ছিল ৫। গোল পার্থক্যও ছিল সমান +১। গোল বেশি দেওয়ায় গ্রুপ সেরা হয় স্পেন। 

একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় ইরান। মরক্কোর প্রাপ্তি স্পেনের বিপক্ষে ড্র। 

স্পেনের বিপক্ষে ৩-৩ ব্যবধানে ড্রয়ের ম্যাচে আসরের প্রথম হ্যাটট্রিক করেন পর্তুগাল অধিনায়ক ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।

গ্রুপ ‘সি’ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় ফ্রান্স ও ডেনমার্ক। দুই জয় ও এক ড্রয়ে গ্রুপ সেরা হয় ফ্রান্স। এক জয় ও দুই ড্রয়ে রানার্সআপ ডেনমার্ক। 

এক জয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে ফেরে পেরু। ১ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে থেকে আসর শেষ করে অস্ট্রেলিয়া। 

গ্রুপ ‘ডি’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় ক্রোয়েশিয়া ও আর্জেন্টিনা। তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় ক্রোয়েশিয়া। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৩ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে বসেছিল তারা। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে মার্কোস রোহোর ৮৬তম মিনিটের গোল তাদের এনে দেয় ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ৩ পয়েন্ট। 

নাইজেরিয়ার প্রাপ্তি ৩ পয়েন্ট। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ড্রয়ের সুখস্মৃতি নিয়ে আসর শেষ করে আইসল্যান্ড। 

গ্রুপ ‘ই’ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যায় ব্রাজিল ও সুইজারল্যান্ড। দুই জয় ও এক ড্রয়ে ৭ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা ব্রাজিল। এক জয় ও দুই ড্রয়ে রানার্সআপ সুইজারল্যান্ড। 

এক জয়ে ৩ পয়েন্ট পায় সার্বিয়া। কোস্টা রিকা এবার তেমন কোনো চমক দেখাতে পারেনি। ১ পয়েন্ট নিয়ে তলানিতে থেকে বিদায় নেয় তারা।  

গ্রুপ ‘এফ’ যেন ছিল মৃত্যুকূপ। সেখান থেকে শেষ ষোলোয় যায় সুইডেন ও মেক্সিকো। দুটি করে জয়ে এই দুই দলের পয়েন্ট ছিল ৬। গোল পার্থক্যে এগিয়ে থেকে গ্রুপ সেরা হয় সু্ইডেন। 

এক জয়ে তিন পয়েন্ট নিয়ে নিয়ে তৃতীয় দক্ষিণ কোরিয়া। শেষ ম্যাচে তাদের বিপক্ষেই হেরে ১৯৩৮ সালের পর প্রথমবার গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয় জার্মানি। 

গ্রুপ ‘জি’ থেকে পরের রাউন্ডে যায় বেলজিয়াম ও ইংল্যান্ড। ‘এ’ গ্রুপের মতো এখানেও কোনো ম্যাচ ড্র হয়নি। 

তিন জয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় বেলজিয়াম। দুই জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে রানার্সআপ ইংল্যান্ড। পানামাকে হারিয়ে একটি জয় পায় তিউনিসিয়া। 

গ্রুপ ‘এইচ’ থেকে শেষ ষোলোয় যায় কলম্বিয়া ও জাপান। দুটি জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ সেরা হয় কলম্বিয়া। একটি করে জয় ও ড্রয়ে ৪ পয়েন্ট করে নিয়ে পরের জায়গাটির জন্য লড়াইয়ে ছিল জাপান ও সেনেগাল। 

এই দুই দলকে বিচ্ছিন্ন করাই ছিল কঠিন! পয়েন্টের পাশাপাশি গোল পার্থক্য, গোল দেওয়া, গোল হজম করা সবাই ছিল সমান! নিজেদের মধ্যে ম্যাচের ফল ২-২ ড্র। শেষ পর্যন্ত ফেয়ার প্লে পয়েন্টে এগিয়ে যায় জাপান। 

দ্বিতীয় রাউন্ড 

শেষ ষোলোয় মুখোমুখি হয়: ফ্রান্স-আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে-পর্তুগাল, স্পেন-রাশিয়া, ক্রোয়েশিয়া-ডেনমার্ক, ব্রাজিল-মেক্সিকো, বেলজিয়াম-জাপান, সুইডেন-সুইজারল্যান্ড ও কলম্বিয়া-ইংল্যান্ড। 

৩০ জুনের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ৪-৩ গোলে হারায় ফ্রান্স। শুরুতে এগিয়ে যায় তারাই। পরে দুই গোল দিয়ে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা। ১১ মিনিটের মধ্যে তিন গোল দিয়ে চালকের আসনে বসে ফ্রান্স। শেষ দিকে সের্হিও আগুয়েরো ব্যবধান কমালেও ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিতে পারেনি গত আসরের রানার্সআপরা। 

পরের ম্যাচে পর্তুগালকে ২-১ গোলে হারায় উরুগুয়ে। 

পরদিন টাইব্রেকারে স্পেনকে ৪-৩ গোলে হারায় রাশিয়া। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ১-১ ড্র ছিল। পরে অতিরিক্ত সময়েও কোনো গোল পায়নি তারা। 

পরের ম্যাচেও ঘটে একই ঘটনা। টাইব্রেকারে ডেনমার্ককে ৩-২ গোলে হারায় ক্রোয়েশিয়া। প্রথম মিনিটেই এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। চতুর্থ মিনিটে সমতা ফেরায় ক্রোয়েশিয়া। পরের ১১৬ মিনিট গোল পায়নি কোনো দলই।  

২ জুলাইয়ের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকোকে ২-০ গোলে হারায় ব্রাজিল। পরের ম্যাচে ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও বেলজিয়ামের কাছে ৩-২ ব্যবধানে হারে জাপান। 

পরদিন সুইজারল্যান্ডকে ১-০ গোলে হারায় সুইডেন। পরের ম্যাচে টাইব্রেকারে কলম্বিয়াকে ৪-৩ হারায় ইংল্যান্ড। নির্ধারিত সময়ে ম্যাচ ১-১ ড্র ছিল। অতিরিক্ত সময়ে গোল পায়নি কোনো দলই। 

কোয়ার্টার-ফাইনাল 

শেষ আটে মুখোমুখি হয়: উরুগুয়ে-ফ্রান্স, ব্রাজিল-বেলজিয়াম, সুইডেন-ইংল্যান্ড ও রাশিয়া-ক্রোয়েশিয়া। আট দলের ছয়টিই ইউরোপের। 

৬ জুলাইয়ের প্রথম ম্যাচে উরুগুয়েকে ২-০ গোলে হারায় ফ্রান্স। পরের ম্যাচে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হারে ব্রাজিল। টুর্নামেন্টের বাকি অংশ পরিণত হয় যেন ইউরোয়। চার সেমি-ফাইনালিস্টই যে ছিল ইউরোপের।

৭ জুলাইয়ের প্রথম ম্যাচে সুইডেনকে ২-০ গোলে হারায় ইংল্যান্ড। 

পরের ম্যাচে নির্ধারিত সময়ে একটি করে গোল করে রাশিয়া ও ক্রোয়েশিয়া। অতিরিক্ত সময়েও করে তারা একটি করে গোল। টাইব্রেকারে আর পারেনি স্বাগতিকরা। হেরে যায় ৪-৩ ব্যবধানে। 

সেমি-ফাইনাল 

১০ জুলাই সামুয়েল উমতিতির একমাত্র গোলে বেলজিয়ামকে হারিয়ে ফাইনালে যায় ফ্রান্স। 

পরদিন নির্ধারিত সময়ে ১-১ ড্র থাকার পর অতিরিক্ত সময়ে ব্যবধান গড়ে দেন মারিও মানজুকিচ। ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে প্রথমবারের মতো ফাইনালে যায় ক্রোয়েশিয়া। 

তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডকে ২-০ গোলে হারায় বেলজিয়াম। 

ফাইনাল 

১৫ জুলাই, ২০১৮। মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৭৮ হাজারের বেশি দর্শক। মুখোমুখি ইউরোপের দুই দেশ ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়া। 

১৮তম মিনিটে মানজুকিচের আত্মঘাতী গোলে পিছিয়ে পড়ে ক্রোয়েশিয়া। ১০ মিনিট পর সমতা টানেন ইভান পেরিসিচ। 

সফল স্পট কিকে ৩৮তম মিনিটে ফ্রান্সকে এগিয়ে নেন অঁতোয়ান গ্রিজমান। দ্বিতীয়ার্ধে পল পগবা ও কিলিয়ান এমবাপের দুই গোলে ৪-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় ফ্রান্স 

৬৯তম মিনিটে ব্যবধান কমান মানজুকিচ। তবে ম্যাচে আর ফিরতে পারেনি ক্রোয়েশিয়া। ৪-২ গোলে জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ঘরে নেয় ফ্রান্স।  

২১তম বিশ্বকাপ 

·                    স্বাগতিকঃ রাশিয়া

·                    চ্যাম্পিয়নঃ ফ্রান্স

·                    রানার্স আপঃ ক্রোয়েশিয়া

·                    মোট ম্যাচঃ ৬৪

·                    মোট গোলঃ ১৬৯

·                    গোল গড়ঃ ২.৬৪   

·                    সর্বোচ্চ গোলদাতাঃ হ্যারি কেন (ইংল্যান্ড) ৬ গোল

·                    সেরা খেলোয়াড়ঃ  লুকা মদ্রিচ (ক্রোয়েশিয়া)

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক