Published : 28 Jun 2023, 10:19 AM
খেলা শেষে মিক্সড জোন দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সুনিল ছেত্রি। ‘আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি’-কথাটি তার কানে যেতেই থমকে দাঁড়ালেন, মুখে স্মিত হাসি। মাত্রই ম্যাচ শেষ করে আসার ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে তিনি বেশ অনেকটা সময় দিলেন বাংলাদেশের সংবাদকর্মীদের। কথা বললেন অনেক কিছু নিয়ে। বঙ্গবন্ধু সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে আসা বাংলাদেশ দল, নিজের ৯২তম আন্তর্জাতিক গোল, সাফে এতদিন গোলের রেকর্ডে একা থাকা আরেক তারকা আশফাক আলিকে (২৩ গোল) স্পর্শ করা, এই ৩৮ বছর বয়সেও তারুণ্যের দ্বীপ্তি ছড়িয়ে যাওয়া… এবং আরও কত কথা! ভারতীয় অধিনায়ক বললেন, ফুটবলপ্রেমীদের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার তাগিদ এখনও অনুক্ষণ অনুভব করেন বলেই বয়সের ভারকে স্রেফ তুড়ি মেরে ছুটে চলেছেন।
বেঙ্গালুরু শ্রী কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার কুয়েতের বিপক্ষে ম্যাচে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে অনিরুদ্ধ থাপার কর্ণার থেকে ভলিতে লক্ষ্যভেদ করেন সুনিল ছেত্রি। পরে দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে গোল হজম করে বসে ভারত। ১-১ ড্রয়ের ফলে সাফের অতিথি দল কুয়েত হয় ‘এ’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন, রেকর্ড আটবারের চ্যাম্পিয়ন ভারত হয়েছে গ্রুপ রানার্সআপ। সেই হতাশা পাশে রেখে তিনি কথা বললেন অনেক কিছু নিয়ে।
ভক্তদের মুখে ‘ইমমর্টাল নাম্বার ইলেভেন’ কথাটা শুনে কেমন অনুভূতি হয়?
ছেত্রি: এটা আমি মোটেও সিরিয়াসলি নেই না। দেশজুড়ে যে ভালোবাসা পাই, সেটাকে মূল্য দেই। বিশেষ করে এটা আমার ঘরের মাঠ, যখনই আমি মাঠে নামার সুযোগ পাই, নিজের সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করি। তাদের এই ভালোবাসার জন্য কৃতজ্ঞতা। তবে আবারও বলছি, এসব বিষয়টিকে খুব একটা গুরুত্ব দেই না।
এ নিয়ে আপনার আন্তর্জাতিক গোল হলো ৯২টি, নিশ্চয়ই সেঞ্চুরিতে চোখ রাখছেন?
ছেত্রি: এগুলো নিয়ে ভাবি না। আমি অহংকারী বা এরকম কিছু হতে চাই না। এই বিষয়গুলোতে কখনোই সিরিয়াস মনোযোগ দেই না। চার, পাঁচ বা ছয় বছর পর যখন থামব, তখন হাতে পানীয় নিয়ে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করব।

আলী আশফাকের সঙ্গে এখন আপনি সাফের সর্বোচ্চ গোলদাতা(২৩ গোল)। এই অর্জন আপনাকে কতটা স্পর্শ করছে?
ছেত্রি: এসবকে খুব বেশি সিরিয়াসলি নেই না।
৩৮ বছর বয়সেও যেন ১৮ বছর বয়সী তরুণদের মতো খেলে যাচ্ছেন। এখনও আপনি দলের সবচেয়ে ফিট খেলোয়াড়। গোলের পর গোল করে যাচ্ছেন...
ছেত্রি: ৩৮ বছর বয়স বলেই কাজটা অনেক সহজ হয়ে যায়, কারণ এই বয়সে আপনি যথাযথভাবে জানবেন আপনার জন্য কী অপেক্ষা করে আছে, কী আপনার ক্ষতির কারণ হতে পারে। তখন মনটা শান্ত থাকবে। আপনি অনেক ধীরস্থির হয়ে যাবেন। ৩৮ বছর বয়সী একটা মানুষের জন্য কাজগুলো অনেক সহজ।
সুনিল নিজের শরীটাকে কিভাবে দেখভাল করে?
ছেত্রি: যেটা খাওয়া প্রয়োজন, খাই এবং যেটা প্রয়োজন নয়, সেটা খাই না। আমি হাসিখুথি থাকি। প্রিয় মানুষদের নিয়ে থাকি। কঠোর পরিশ্রম করি। মানুষের কাছ থেকে প্রচুর ভালোবাসা পাই এবং তাদেরকেও কিছুটা ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করি।
বলা হয়ে থাকে, সুনিল ছেত্রিকে ছাড়া ভারতকে গোলের জন্য ধুঁকতে হয়। তো, আগামী দিনে কে আপনার উত্তরসূরি হতে পারেন?
ছেত্রি: আমাকে ছাড়া দল ভালো করে না-আমি মনে করি, এই কথাটি সত্য নয়। আমাকে ছাড়াও দল ভালো করেছে অতীতে। সুনিল ছেত্রিই সব নয়, আগামীতে যারা আসবে, তাদের অনেকে আমার চেয়ে ভালো করবে। এই মুহূর্তে যারা আছে, তাদের অনেকে ভালো খেলছে। আমি স্রেফ খুব সুদর্শন, মানুষ তাই সবসময় আমাকে নিয়ে কথা বলে (হাসি)।
ভারতীয় ফুটবল খুব দ্রুত উন্নতি করছে। এই উন্নতিতে আইএসএলের ভূমিকা কতখানি?
ছেত্রি: যে কয়টা টুর্নামেন্ট ভারতীয় ফুটবলের এগিয়ে যাওয়ার আবহ তৈরি করেছে, আএইসএল তাদের মধ্যে একটি। আইএসএল গত ৮ বছরে দারুণ করেছে। ভারতে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সম্মুখসারির একটি টুর্নামেন্ট, যেটি স্রেফ অর্থ ও সুনাম অর্জনের জন্য আসেনি। আইএসএল ফুটবলকে বহু দূর পর্যন্ত এগিয়ে নিচ্ছে, আর উন্নতিটা আপনার চোখে পড়বেই।

কুয়েতের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তে গোল হজম করতে হলো…
ছেত্রি: ক্লিনশিট রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আমরা, কিন্তু শেষ দিকে গোল হজম করলাম। ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই হতাশ, তবে আমরা এখনও অপরাজিত রয়েছি। যত দূর সম্ভব এই অজেয় যাত্রা ধরে রাখতে চাই।
গত সাফে আপনারা বাংলাদেশের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিলেন। এবার যদি দেখা হয়, আপনাদের ভাবনায় কি প্রতিশোধ থাকবে?
ছেত্রি: আগেই বলেছি, বাংলাদেশের খেলা এবার আমরা বেশি দেখিনি, কারণ ওরা আমাদের গ্রুপে নেই। যতটুকু শুনেছি, জেনেছি তারা অনেক শক্ত একটা দল, অনেক উন্নতি করেছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা জানি না আগামীকাল কী ফল হতে যাচ্ছে। আমরা জানি না, কে আমাদের প্রতিপক্ষ হবে। যখন আমাদের প্রতিপক্ষ ঠিক হবে, তখন আমরা তাদের অনেক অনেক ভিডিও দেখব, তাদের সম্পর্কে জানব। এর আগ পর্যন্ত বলতে চা,ই বাংলাদেশ অনেক ভালো খেলছে।
এমনিতে বর্তমান বাংলাদেশ দলটাকে নিয়ে কতটুকু ধারণা আছে আপনার?
ছেত্রি: আমরা বাংলাদেশের কয়েকটি ভিডিওর ক্লিপিংস দেখেছি, কারণ, তারা আমাদের গ্রুপে নেই। তাই তাদের ম্যাচও আমাদের খুব বেশি দেখা হয়নি। লেবাননের বিপক্ষে ম্যাচে ওদের প্রথমার্ধ আমরা দেখেছি। বাংলাদেশ তখন খুব ভালো খেলছিল। এরপর আর খুব বেশি দেখা হয়নি।
বাংলাদেশ দলের কাউকে কি আলাদা করে চোখে পড়েছে?
ছেত্রি: পুরো বাংলাদেশ দল। তারা আসলেই ভালো খেলছে।

আপনি দক্ষিণ এশিয়ার একজন কিংবদন্তি। বাংলাদেশে অসংখ্য খেলোয়াড় আপনাকে অনুসরণ করে, তাদের জন্য কোনো বার্তা আছে?
ছেত্রি: নিজের আরও উন্নতি করুন এবং ফুটবলটাকে উপভোগ করুন। আমরা যারা আমাদের দেশের জন্য খেলি, আমাদের একটা বড় দায়িত্ব হচ্ছে দেশের মানুষদের আদর্শ হওয়া। সুতরাং চেষ্টা করুন, নিজের এবং দলের আরও উন্নতি করুন।
এই অঞ্চলের সবচেয়ে শক্ত দল?
ছেত্রি: কুয়েত…ওহ আপনি এই অঞ্চলের সাফের দলগুলোর কথা জানতে চাইছেন। অনেকগুলো দল ভালো করছে। কিন্তু এই সাফের কথা বললে, এর আগে আমরা লেবাননের বিপক্ষে খেলেছি, তারা ভালো করছে। বাংলাদেশ সবসময় শক্ত প্রতিপক্ষ, তবে কুয়েত সবচেয়ে শক্ত দল।
বাংলাদেশে আপনার অনেক সমর্থক আছে। তাদের উদ্দেশে কিছু বলার আছে?
ছেত্রি: ভালো থাকবেন।