২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 18 May 2026, 08:39 AM
গোলের সুযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রে সময়ের সেরাদের একজন পেদ্রি। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাই। পাস দিতে পারেন, খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, যখন মনে হয় যাওয়ার কোনো জায়গা নেই, তখনও প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন- সব গুণাবলীই আছে তার মাঝে। সৃজনশীল এক মিডফিল্ডার।
ক্লাব ও জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ এই খেলোয়াড় সেরা ছন্দে থাকলে আগামী ১৯ জুলাই নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপ ফাইনালে পৌঁছানোর জন্য নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে স্পেন।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন স্পেনের মিডফিল্ডার পেদ্রি।
ফুটবলের আঙিনায় পেদ্রির অর্জন
২৩ বছর বয়সেই বার্সেলোনার হয়ে প্রায় আড়াইশ ও স্পেনের হয়ে ৪০ ম্যাচ খেলেছেন পেদ্রি। এর মধ্যে জাতীয় দলের হয়ে ৩১ ম্যাচে তিনি ছিলেন শুরুর একাদশে। তবে এই সংখ্যাগুলো ফুটবলার পেদ্রির একটি অংশই শুধু তুলে ধরতে পারে।
মাঠে তার দক্ষতা স্বচক্ষে না দেখলে এই মিডফিল্ডারের জাদুর পূর্ণ মর্ম বোঝা সম্ভব নয়। স্প্যানিশ ফুটবলের দ্বিতীয় স্তরের দল লাস পালমাসের হয়ে নিজের দক্ষতা শাণিত করে আরও বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত ছিলেন পেদ্রি। ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক হয় তার। প্রায় ছয় বছর পরও তিনি ক্লাবটির ‘তিকি-তাকা’ পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছেন।
স্পেনের শীর্ষ লিগে প্রথম মৌসুমের পর ২০২০ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে অসাধারণ এক আসর কাটান পেদ্রি। সেবার স্পেনকে সেমি-ফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। যদিও টাইব্রেকারে ইতালির বিপক্ষে হেরে তাদের যাত্রা শেষ হয়।
ইউরো অভিযানের ১৮ মাসের কম সময়ের মধ্যে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে আবারও স্পেন দলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন পেদ্রি। শেষ ষোলোতে মরক্কোর বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে বাদ পড়ার আগে দলের চারটি ম্যাচেই তিনি ছিলেন একাদশে। ২০২৪ সালে চোট সমস্যায় জর্জরিত থাকা সত্ত্বেও, স্পেনের ইউরো জয়ে অবদান রাখেন তিনি।
জাতীয় দলের জার্সিতে ওই সাফল্যের পাশাপাশি বার্সেলোনার হয়ে তিনটি লা লিগা, দুটি কোপা দেল রে ও তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপ জিতেছেন পেদ্রি।

কোচ ও গ্রেটদের চোখে পেদ্রি
“পেদ্রি সত্যিকারের অলরাউন্ডার ও খুবই পেশাদার। সত্যি বলতে সে যখন কোনো ভুল করে, তখন সেটা আরও বেশি খবর হয়। সে প্রায় সবকিছুই ভালোভাবে করে এবং মনে হয় যেন সবকিছুই তার সহজাত। তার খেলায় রয়েছে স্থিরতা, ধৈর্য ও স্বতঃস্ফূর্ততা। সতীর্থদের সেরাটা বের করে আনার এক বিশেষ ক্ষমতা তার আছে। সে স্পেশাল ফুটবলার।”
- লুইস দে লা ফুয়েন্তে, স্পেন কোচ
“আমার চোখে, সে খুবই বুদ্ধিমান খেলোয়াড়, বিশেষ করে তার মতো এত অল্প বয়সী একজন হিসেবে। সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হলো তার খেলার স্বাভাবিকতা। সে বাড়তি চিন্তা করে না; শুধু খেলে যায়। তার খেলায় আনন্দ ও উদ্দীপনা স্পষ্ট দেখা যায়। আশা করি, সে বার্সা ও স্পেনের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠবে। তার মাথায় যথেষ্ট বুদ্ধি আছে। তার বয়স এবং ইতোমধ্যে অর্জিত অভিজ্ঞতা বিবেচনা করলে, আমরা এমন একজন খেলোয়াড়ের কথা বলছি যে তার নিজেরই এক স্বতন্ত্র শ্রেণিতে পড়ে।”
- আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, বার্সেলোনা ও স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার
“এই ইউরোতে পেদ্রি যা অর্জন করেছে, তা কোনো বড় টুর্নামেন্টে ১৮ বছর বয়সী কোনো খেলোয়াড়ের কাছ থেকে কখনও দেখিনি- বিশ্বকাপেও না, ইউরোতেও না, এমনকি অলিম্পিকেও না। সে যেভাবে খেলেছে, যেভাবে খেলাটা বোঝে, ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করে এবং এই ধরনের ম্যাচে চাপ সামলায়, এমনটা আগে কখনও দেখিনি। অবিশ্বাস্য।”
- ২০২০ ইউরোর সেমি-ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে হারের পর তখনকার স্পেন কোচ লুইস এনরিকে।
“পেদ্রি তার চারপাশের সবাইকে আরও ভালো করে তোলে। সে দলে ভারসাম্য আনে, দলকে একত্রিত করে এবং খেলার মোড় আমাদের পক্ষে ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করে।”
- হান্সি ফ্লিক, বার্সেলোনা কোচ
“প্রতিভার দিক থেকে, তার মতো খেলোয়াড় কোথাও দেখিনি। সত্যিই তাই। বিশ্ব মঞ্চে তার মতো খেলোয়াড় আর দেখিনি। তার মধ্যে (কেভিন) ডে ব্রুইনে ও (লুকা) মদ্রিচের কিছু গুণের মিল আছে, তবে পেদ্রি এক অনন্য প্রতিভা। সে আমাকে ইনিয়েস্তার কথা অনেক মনে করিয়ে দেয়।”
- শাভি এর্নান্দেস, স্পেনের সাবেক মিডফিল্ডার ও বার্সেলোনার সাবেক কোচ
পরিসংখ্যানের আলোয় পেদ্রি
• ২০১৯ সালের ১৮ অগাস্ট পেশাদার ফুটবলে পেদ্রির অভিষেক হয় ১৬ বছর বয়সে, লাস পালমাসের হয়ে।
• অভিষেকের এক মাস পর ১৯ সেপ্টেম্বর প্রথম গোলের দেখা পান পেদ্রি। ১৬ বছর ৯ মাস ২৩ দিন বয়সে গোল করে লাস পালমাসের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হন তিনি।
• বার্সেলোনার হয়ে পেদ্রির লা লিগায় অভিষেক হয় ২০২০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এর এক মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৭ অক্টোবর লিগে প্রথমবার শুরুর একাদশে খেলার সুযোগ পান তিনি।
• ২০২০ সালের ২০ অক্টোবর হাঙ্গেরির ক্লাব ফেরেন্সিভারোসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেক হয় পেদ্রির। ঘরের মাঠে বার্সেলোনার ৫-১ ব্যবধানে জয়ের ম্যাচে দলের চতুর্থ গোলটি করেন তিনি, যা ক্লাবটির হয়ে তার প্রথম গোল।
• ২০১৯ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে পেদ্রি স্পেনের হয়ে খেলেন এবং দলকে কোয়ার্টার-ফাইনালে তোলায় অবদান রাখেন।
• ২০২০ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে মাঠে নেমে ইউরো বা বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে খেলা সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হন পেদ্রি। ১৮ বছর ৬ মাস ১৮ দিন বয়সে সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্টটিতে অভিষেক হয় তার।
বিশ্বকাপে পেদ্রি
২০২২ সালের বিশ্বকাপে লুইস এনরিকের স্পেন দলের খুব গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন পেদ্রি। শেষ ষোলোয় মরক্কোর বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয় স্পেন। চার বছর পরের বিশ্বকাপে দে লা ফুয়েন্তের স্পেন দলেরও অপরিহার্য অংশ পেদ্রি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে পেদ্রি ও স্পেনের প্রত্যাশা
ঐতিহ্যগতভাবে স্পেনের সেরা দলগুলো গড়ে উঠেছে শক্তিশালী মাঝমাঠকে কেন্দ্র করে। শাভি ইনিয়েস্তা, শাবি আলোন্সো, সেস ফাব্রেগাস যুগের পর থেকে নামগুলো হয়তো বদলে গেছে, কিন্তু মূলনীতি এখনও টিকে আছে।
সেই দায়িত্ব এখন রদ্রি, পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, মিকেল মেরিনো, মার্তিন সুবিমেন্দির কাঁধে। এর সঙ্গে লামিন ইয়ামালের জাদুকরি পারফরম্যান্স যোগ করলে এবারের বিশ্বকাপের শক্ত ফেভারিটদের একটি স্পেন।
আগামী ১৫ জুন ৬ লাখ জনসংখ্যার দেশ কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শিরোপা পুনরুদ্ধারের অভিযান শুরু করবে ২০১০ সালের চ্যাম্পিয়নরা। ‘এইচ’ গ্রুপে অপর দুই দল উরুগুয়ে ও সৌদি আরব।