২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 06 May 2026, 08:57 AM
প্রাণশক্তিতে পূর্ণ এক উইঙ্গার, মুহূর্তে গড়ে দিতে পারেন ব্যবধান। আক্রমণে যেমন ভূমিকা রাখেন, রক্ষণেও দলকে সাহায্য করেন প্রাণপণে। বিশ্বকাপে ব্রাজিলের দীর্ঘ শিরোপা খরা কাটাতে মহাগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারেন রাফিনিয়া।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন ব্রাজিলের উইঙ্গার রাফিনিয়া।
২০১৬ সালে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে অচেনা এক টিনএজার পাড়ি জমান ইউরোপে। এক দশক পর, ২৯ বছর বয়সে নিজের সময়ের সেরা খেলোয়াড়দের একজন এবং দর্শকপ্রিয় তারকাদের একজন হিসেবে রাফিনিয়া খেলতে যাচ্ছেন উত্তর আমরিকা বিশ্বকাপে। নিজের প্রতিভার ওপর বিশ্বাস রেখে অধ্যাবসায়, সহনশীলতা ও কঠোর পরিশ্রমে সাফল্যের পথে ছুটে চলছেন রাফিনিয়া। দুর্দান্ত অভিযাত্রায় এই গ্রীষ্ম হতে পারে তার প্রাপ্তির মুকুটের সবচেয়ে ঝলমলে রত্ন।

ফুটবলের আঙিনায় রাফিনিয়ার অর্জন
পোর্তো আলেগ্রের রিও গ্রান্দে দো সলে জন্ম রাফিনিয়ার। যেখান থেকে উঠে এসেছেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দুঙ্গা, ক্লাউদিয়ো তাফারেল, ব্রাঙ্কো ও রোনালদিনিয়ো।
তাদের মতো ক্যারিয়ারের শুরুতেই তারকা খ্যাতি পেয়ে যাননি রাফিনিয়া। বরং নিজের ছাপ ফেলতে যথেষ্ট সময় লাগে তার। পথটা ভীষণ কঠিন ছিল তার জন্য। বেড়ে ওঠার সময়টায় শীর্ণ দেহের জন্য তাকে নিয়ে সংশয়ে ছিলেন ব্রাজিলের বিভিন্ন ক্লাবের কোচ ও কর্মকর্তারা। একটা সময় তো হাল প্রায় ছেড়ে দিচ্ছিলেন রাফিনিয়া।
তবে শেষ পর্যন্ত পথ খুঁজে পান তিনি পর্তুগালে, ভিতোরিয়া দে গিমাইস ক্লাবে। সেখান থেকে যান পর্তুগালেরই আরেক ক্লাব স্পোর্তিংয়ে। এরপর ফ্রান্সের ক্লাব রেন, ইংল্যান্ডের লিডসে খেলেন। সেখান থেকে বার্সেলোনায় এসে দ্যুতিময় ফুটবলে হয়ে উঠেছেন সময়ের সেরাদের একজন।
দুর্দান্ত এক গোলস্কোরারের বাইরেও নানা পজিশনে ও ভূমিকায় খেলতে পারদর্শী রাফিনিয়া। উদাহরণ হিসেবে বার্সেলোনায় তার খেলার সময়ের কথাই বলা যায়। এখানে তিনি দুই উইংয়েই খেলেন, প্রয়োজন হলে প্লেমেকারের ভূমিকাতেও মাঠে নামেন। তবে মাঠে তার ভূমিকা যাই হোক না কেন, গোল করা কিংবা গোলে অবদান রাখার কাজটা করেন নিয়মিত।
২০২৩ ও ২০২৫ সালে কাতালান ক্লাবটির লা লিগা জয়ে তার ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এবারও শিরোপার খুব কাছে আছে বার্সেলোনা। দলটির হয়ে ২০২৪-২৫ মৌসুমে তিনি জিতেছেন কোপা দেল রে। এছাড়া জিতেছেন তিনটি স্প্যানিশ সুপার কাপও। এর আগে ২০১৯ সালে স্পোর্তিংয়ের হয়ে জিতেছিলেন ঘরোয়া ডাবল।
এখন পর্যন্ত তার সেরা সময় কেটেছে ২০২৪-২৫ মৌসুমে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন তিনি। ব্রাজিলের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে হন লা লিগার বর্ষসেরা। এছাড়া আরও কিছু ব্যক্তিগত অর্জন ধরা দিয়েছে তার হাতে। ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারদের সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও ছিলেন তিনি।

কোচ ও সতীর্থদের চোখে রাফিনিয়া
“তার মতো খেলোয়াড় কখনও পাইনি। বল পায়ে কিংবা বল ছাড়া- দুই ক্ষেত্রেই রাফিনিয়া অবিশ্বাস্য গতিময়। সে স্পেশাল এবং অল্প কথায় বলতে গেলে, বার্সেলোনায় যে ঘরানার ফুটবল আমি দেখতে চাই, ঠিক সেটাই সে খেলে।”
- হান্সি ফ্লিক
“সে এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের একজন। তার উপস্থিতি আমাদের আক্রমণে আরও বেশি বিকল্প এনে দেয় এবং ভক্তদের রোমাঞ্চিত করে। আমি মনে করি, সে আমাদের জন্য সত্যিকারের গেম চেঞ্জার হতে পারে।”
- কার্লো আনচেলত্তি
“সে যেন মাঠকে প্রসারিত করে তোলে এবং সে খুব উঁচু মানের। তার সঙ্গে খেলা আমার কাজটা সহজ করে দেয়।”
- ভিনিসিউস জুনিয়র
“রাফিনিয়া বিস্ময়কর একজন। জাতীয় দলে (তার থেকে) আমরা যেটা অনেক দিন ধরে দেখছি, সেটা এখন লোকে দেখছে- শুধু তার ফুটবল সামর্থ্য নয়, তার প্রচেষ্টা ও নেতৃত্বগুণও। দায়িত্ব নিতে সে সবসময়ই এগিয়ে আসে।”
- মার্কিনিয়োস
“সে আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে আমাদের অনেক সাহায্য করে এবং দলে সব তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য উদাহরণ তৈরি করে। আমি যখন প্রথম সিনিয়র দলে যোগ দিই, তখন থেকে সে আমাকে সাহায্য করছে।”
- লামিনে ইয়ামাল

পরিসংখ্যানের আলোয় রাফিনিয়া
• ২০২৪-২৫ মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ২২ গোলে অবদান রাখেন রাফিনিয়া, স্পর্শ করেন ২০১৩-১৪ আসরে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর গড়া কীর্তি। ১৪ ম্যাচে ১৩টি গোল করেন রাফিনিয়া, অবদান রাখেন ৯ গোলে। সেই আসরে এই দুই তালিকার কোনোটিতেই তাকে পেছনে ফেলতে পারেননি কেউ।
• চলতি মৌসুমে রাফিনিয়া খেলেছেন এমন ৩১ ম্যাচের কেবল দুটিতে হেরেছে বার্সেলোনা। তাকে ছাড়া ১৭ ম্যাচের ছয়টিতে হেরেছে স্প্যানিশ চ্যাম্পিয়নরা। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার-ফাইনালের ফিরতি লেগে ৭-২ ব্যবধানের স্মরণীয় জয়ে দুটি গোল করেন রাফিনিয়া, দুটি গোলের ভিত গড়ে দেন, একটি পেনাল্টি আদায় করেন এবং চমৎকার একটি ফ্রি কিক করেন, যা থেকে শেষ পর্যন্ত আসে আরেকটি গোল।
• দলে গোলের দায়িত্ব নেওয়া রাফিনিয়ার জন্য নতুন কিছু নয়। বার্সেলোনায় এসে আরও উন্নতি করার আগে ২০২১-২২ মৌসুমে ১১ গোল করে ছিলেন লিডসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এর আগে ২০১৯-২০ মৌসুমে ছিলেন রেনের আক্রমণভাগের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

বিশ্বকাপ মঞ্চে রাফিনিয়া
উত্তর আমেরিকা আসর দিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপে খেলবেন রাফিনিয়া। দেশের হয়ে মাত্র ১১ ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে কাতার আসরে খেলেন তিনি। সার্বিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্ব মঞ্চে শুরু হয় তার যাত্রা।
প্রথম ১১ ম্যাচে পাঁচ গোল করেন রাফিনিয়া, আরও অবদান রাখেন চারটিতে। নেইমার, ভিনিসিউস ও রিশার্লিসনের সঙ্গে গড়ে তোলেন দারুণ এক আক্রমণভাগ। দল অন্তঃপ্রাণ রাফিনিয়া বিশ্বকাপে সব ম্যাচেই ছিলেন শুরুর একাদশে।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে রাফিনিয়া ও ব্রাজিলের প্রত্যাশা
ভিনিসিউস জুনিয়রের মতো গত আসরের পর মাঠ ও মাঠের বাইরে কেবলই সামনে ছুটে চলেছেন রাফিনিয়া। বার্সেলোনার তৃতীয় অধিনায়ক তিনি।
এখন ব্রাজিল দলেও খুব গুরুত্বপূর্ণ রাফিনিয়া। বিভিন্ন পজিশনে তার খেলার সামর্থ্য কোচ কার্লো আনচেলত্তির কৌশল সাজানোয় খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট থেকে তার সেরে ওঠার জন্য অপেক্ষা আছেন ইতালিয়ান কোচ। তার আশা, ষষ্ঠ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন পূরণে দলকে সামনে থেকে পথ দেখাবেন রাফিনিয়া।
আগামী ১৩ জুন মরক্কোর বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপে যাত্রা শুরু হবে ব্রাজিলের। ‘সি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড।