Published : 02 Sep 2025, 01:55 AM
ভোটার বেড়েছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার দৌড়েও সামনে এসেছেন; নতুন বাস্তবতায় এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে সংখ্যার বিচারে জয়-পরাজয়ের বড় নির্ধারক হতে পারেন নারী শিক্ষার্থীরা।
ভোট সামনে রেখে উৎসাহের পাশাপাশি প্রত্যাশার বিষয়েও উচ্চকণ্ঠ এই ভোটাররা। আবাসিক হল, অ্যাকাডেমিক ও ক্যাম্পাসের পরিবেশ নিয়ে নানা প্রত্যাশার কথা বলছেন ছাত্রীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ছাত্রীদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, হলে আসন সমস্যা, ক্যান্টিনের খাবারের মান, ডাবলিং প্রথা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং নিরাপদ ক্যাম্পাসের মতো মৌলিক বিষয়।

আবার এসবের সঙ্গে পরিবহন বাসের সংখ্যা বাড়ানো, হলকেন্দ্রিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ততার সুযোগ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন প্রত্যাশার কথা বলেছেন অনাবাসিক ছাত্রীরা।
ছয় বছরের বেশি সময় পর ৯ সেপ্টেম্বর ভোটের তারিখ রেখে ডাকসু এবং হল সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এবারের নির্বাচনে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৭৪। তার মধ্যে ছাত্রী ভোটার ১৮ হাজার ৯৫৯ জন।
২০১৯ সালের সর্বশেষ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিলেন ৪৩ হাজার ২৫৫ জন। তার মধ্যে মেয়ে ভোটারের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার ৩১২।
এবার ডাকসুতে ২৮টি পদের নির্বাচনে ৪৭১ প্রার্থীর মধ্যে ৬২ পদে প্রার্থী হয়েছেন ছাত্রীরা। ভিপি, জিএস এবং এজিএস পদের সঙ্গে বেশিরভাগ সম্পাদকীয় পদের জন্য মাঠে নেমেছেন তারা।
হল সংসদগুলোতে ভোট হচ্ছে ভিসি-জিএসসহ ১৩ পদে। মেয়েদের হল পাঁচটি, ছেলেদের ১৩টি।
২০১৯ সালে ডাকসুর ২৫টি পদের বিপরীতে মোট প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ২২৯। ভিপি, জিএস ও এজিএসসহ পাঁচটি পদ মিলিয়ে মোট নারী প্রার্থী ছিলেন ২৮ জন।
২০১৯ সালে প্রায় ৫৮৬ জন ছাত্রীর বিপরীতে একজন ছাত্রী প্রার্থী ছিলেন, এবার ৩০৬ জনের বিপরীতে প্রার্থী একজন।

পাঁচ ছাত্রী হলে হল সংসদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ১৮৫ জন শিক্ষার্থী। প্রতি হল সংসদে পদের সংখ্যা ১৩টি।
রোকেয়া হলের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মিম আক্তারের দাবি, “আমাদের হলে প্রথম দরকার ফ্রিজ আর ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নয়ন। ডাবলিং প্রথা বন্ধ করতে হবে।”
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বাইরে প্রার্থীদের এগিয়ে আসার প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি চাই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এগিয়ে আসুক, কারণ তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নেই। তবে অনেকে রাজনৈতিক পরিচয় লুকিয়ে প্রচার চালাচ্ছে, আমি তাদের কাউকে ভোট দেব না।”
আর জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সাবরিন বলছেন, “আমি এখনও সবার ইশতেহারগুলো পড়ছি এবং দেখছি। এখান থেকে যারটা মনে হবে আমাদের জন্য কাজ করবেন এবং আমাদের চাওয়াটাই যার কাছে মুখ্য হবে তাকে ভোট দেব এবার সে কোনো রাজনৈতিক দলের হোক বা স্বতন্ত্র। নিজ দলীয় আদর্শ এবং চিন্তা নয়, যে আমাদের কথা ভাববে তাকেই বেছে নেব।”
অন্যদিকে, রোকেয়া হলের ফিন্যান্স বিভাগের সামিয়া রহমান মনে করেন, হলে ‘বাংক বেডের’ সংখ্যা আরও না বাড়ালে আবাসন সমস্যার সমাধান হবে না।
তার ভাষায়, “বেড শেয়ার করা খুব কষ্টকর।”
হলে ঢোকা ও বের হওয়ার সময়ে পরিবর্তন আনার দাবি জানিয়ে সামিয়া বলেন, “রাত ১২টা পর্যন্ত বিনা হয়রানিতে হলে ঢুকতে চাই। পাশাপাশি সিট ব্যবস্থাপনা আর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত তদারকি করতে হবে। তবে আস্থা রাখা কঠিন কারণ ক্ষমতায় গেলে অনেকেই ভোল পাল্টে ফেলে।”
কুয়েত মৈত্রী হলের ২০১৯–২০ সেশনের শিক্ষার্থী সুরাইয়া ফাতেমা বলেন, “সবচেয়ে বড় সমস্যা সিট। সিকদার মনোয়ারা ভবনের (ঝুঁকিপূর্ণে ঘোষিত) আসল অবস্থা কী, সেটা প্রমাণসহ জানতে চাই। দ্বিতীয় সমস্যা হলো ক্যান্টিন। হলে ওঠা মানে নিম্নমানের খাবার মেনে নেওয়া এটা আর চলবে না। প্রতিদিনের খাবারে যেন একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকে।”
তিনি যোগ করেন, “প্রার্থীরা যেন শুধু ভোটের জন্য প্রতিশ্রুতি না দেয়। আমার হলে যেভাবে অবস্থা, তারও তো একই অবস্থা সেই জায়গায় সৎ থেকে কাজ করুক।”
সুফিয়া কামাল হলের শিক্ষার্থী অর্জিতা সূত্রধর ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।
তার মতে, “বছরের পর বছর গেঁড়ে বসে থাকা প্রথা বন্ধ হওয়া জরুরি। প্রতি বছর নির্বাচন হলে জবাবদিহিতা বাড়বে।”

শামসুন নাহার হলের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ফাতেমাতুজ জোহরা শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্বকে প্রধান ‘শর্ত’ হিসেবে দেখছেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাই সৎ, যোগ্য ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রার্থী। বর্তমানে হলে খাবারের নিম্নমান, অপ্রতুল সিট আর প্রশাসনিক জটিলতা আমাদের বড় সমস্যা। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা যেন এসব বাস্তবভাবে সমাধান করেন।”
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী বুশরা জাহান বলেন, “নিরাপদ ক্যাম্পাস, ধূমপান ও ছিন্নমূল মানুষ মুক্ত পরিবেশ চাই। প্রতিটি বেডে একজন, ক্যান্টিনের খাবারের মানোন্নয়ন আর হল স্টোর বাড়াতে হবে। দলীয় স্বার্থ নয়, শিক্ষার্থীর স্বার্থই প্রাধান্য পাক।”
এছাড়া বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের দুই শিক্ষার্থীও একই দাবি তুলেছেন। প্রথমজন বলেন, “আমাদের হলে সিট সংকট তীব্র। আমি চাই এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হোক।”
আরেকজন বলেন, “ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ে আমরা সবসময় সমস্যায় পড়ি। তাছাড়া রাতে হলে ফেরার সময় হয়রানি ছাড়া প্রবেশের নিশ্চয়তা চাই।”
অনাবাসিক শিক্ষার্থী হিসেবে ক্লাস-পরীক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ, ফলাফল প্রকাশে স্বচ্ছতা, ডিজিটাল ব্যবস্থা উন্নয়নে পদক্ষেপ দেখতে চাইছেন জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের ইসরাত জাহান সাবরিন।
তিনি বলেন, “ক্যাম্পাসে বাস সংখ্যা বাড়ানো, নিরাপদ যাতায়াত, লাইব্রেরি সময় বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী ক্যান্টিন। ক্যাম্পাসে হয়রানি ও সহিংসতা বন্ধ, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

“কালচারাল, স্পোর্টস আর অ্যাকাডেমিক ক্লাবগুলোতে সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। হল সংসদের কাছে প্রত্যাশা, সিট বণ্টন স্বচ্ছ হোক যোগ্যতার ভিত্তিতে, রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া।”
সাবরিন বলেন, “হলে যে সুবিধা থাকে ডাইনিং, লাইব্রেরি, স্পোর্টস সেগুলো নন-রেসিডেন্ট স্টুডেন্টদের জন্যও আংশিক উন্মুক্ত করা। প্রার্থীদের প্রতি প্রত্যাশা রাজনীতির নামে সন্ত্রাস বা ভয়ের পরিবেশ না তৈরি করা।
“প্রকৃত ছাত্রদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা, যেমন টিউশন ফি, পরিবহন, লাইব্রেরি, হেলথ সার্ভিস। ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য সমান নিরাপত্তা ও সুযোগ। ক্যাম্পাসে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা।”