Published : 09 Nov 2025, 01:39 AM
ঢাকায় সকালে অফিসগামীদের হুড়োহুড়ি, সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিতে বাবা-মায়েদের ছোটাছুটি নিয়মিত চিত্র, যে কারণে সড়কে যানজটের ভোগান্তিও নিত্যদিনের সঙ্গী।
কিন্তু যানজট পরিস্থিতিকে আরও অসহনীয় করে তুলেছে বিভিন্ন এলাকায় মূল সড়কের ওপর বা সড়কের পাশের ফুটপাথে বসা বড়-সড় কাঁচাবাজার।
ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে চলতে গিয়ে নাকাল হচ্ছে ব্যস্ততার মধ্যে থাকা পথচলতি মানুষ।

রাজধানীর মিরপুর ও মোহাম্মদপুর এলাকায় এমন দুটো বাজার ঘুরে দেখা গেল, বাজারের ভিড় সামলে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে নাকাল পুলিশও। কর্মকর্তারা বলছেন, ‘পুলিশের একার পক্ষে’ এগুলো বন্ধ করা সম্ভব না।
সম্প্রতি এক সকালে গিয়ে দেখা গেল, রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর থেকে টেকনিক্যাল মোড়মুখী সড়কটা অর্ধেকেরও বেশি বন্ধ করে বসেছে বাজার। সকালের হুড়োহুড়ি-ছোটাছুটির মধ্যেই নির্বিঘ্নে চলছে মাছের বাজারের দর কষাকষি, মুরগী বিক্রেতার হাঁক-ডাক, সবজিওয়ালদের চেঁচামেচি।
কাঁচাবাজার থেকে শুরু করে ফল, বেকারি আইটেম এমনকি, বাজারে আসা লোকজনের জন্য ফুটপাথে বসে গেছে ভাত-রুটির রেস্তোঁরা পর্যন্ত।
বাজারের শাক বিক্রেতা মো. শাকিল বলছিলেন, “এই বাজার বহুদিন হইল বইতাছে। পুরা মিরপুরে এটাই একটা বাজার যেখানে বইতে কাউরে পয়সা দিতে হয় না। এই কারণে ব্যবসায়ীদের ভিড় বেশি।”
বাজারে মাছ, সবজি, মুরগি, ফল ব্যবসায়ী সব মিলিয়ে বিক্রেতা পাঁচশর বেশি। ক্রেতারা আছেন, আছে ক্রেতাদের আনা যানবাহন এবং বাজারের ক্রেতাদের পরিবহনের অপেক্ষায় থাকা অটোরিকশা, রিকশার জটলা। সব মিলিয়ে যে রাস্তায় চারটি বাস পাশাপাশি চলতে পারার কথা সে রাস্তায় একটি বাসের চলাই দায় হয়ে দাঁড়ায়।
বাজারে আগত ক্রেতা-বিক্রেতার ঠেলাঠেলি এড়িয়ে রাস্তাটার সামান্য অংশ যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখতেই যেন ঘাম ঝরে যায় পুলিশের।
সেখানে কাজ করতে দেখা গেল ট্রাফিক বিভাগের দুজন কনস্টেবল, একজন এএসআই, একজন সার্জেন্ট ও একজন ইন্সপেক্টরকে।
সার্জেন্ট তরিকুল ও কনস্টেবল বুলবুলকে দেখা গেল হাত দিয়ে ভ্যানগুলোকে ভেতরে যেতে ইশারা করছেন। আর সার্জেন্ট তরিকুল ওপাশ থেকে যানবাহনগুলোকে যাওয়ার ইশারা করছেন। তবে রাস্তা না থাকলে যানবাহনগুলো যাবে কোথায়? কিছুক্ষণ পরপরই দাঁড়িয়ে পড়ে সবকিছু।
এই বাজারে মাছ কাটার কাজ করেন হাবিব। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে চলে আসেন এখানে। ফুটপাথে বটি নিয়ে বসেন, ৬টার মধ্যেই বাজার শুরু হয়ে দুপুর গড়িয়ে যায় শেষ হতে হতে।
হাবিব বলছিলেন, বাজারের পুরোটা সময়ই এখানে যানজট লেগে থাকে।
এই বাজারের ঠিক উল্টো দিকে ডেল্টা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রাজধানীতে ক্যান্সার চিকিৎসার অন্যতম বেসরকারি হাসপাতাল এটি। তার পাশে ডেল্টা মেডিকল কলেজ ও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিউট। আর বাজার থেকে ৫০ মিটার দূরে মিরপুর বাঙলা কলেজের সামনে যে ইউটার্ন করার জায়গাটি রয়েছে, সেখানে ভোর থেকেই ভিড় লেগে থাকে আন্তঃজেলা বাসের। বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রাত্রীকালীন বাসগুলো এই ইউটার্নের আগে-পরে সর্বশেষ যাত্রী নামিয়ে এখানে গাড়ি ঘুরিয়ে টেকনিক্যাল মোড় হয়ে শহরের বাইরে চলে যায়।
সাতক্ষীরা থেকে আনা মাছ বিক্রি করছিলেন মো. সুমন। তিনি বলছিলেন, “বাজারে অনেক ক্রেতা আসেন প্রতিদিন। বিক্রিও হয় ভালোই। আবার চাঁদাও দিতে হয় না। যার কারণে দিনকে দিন বাজারের পরিধি বাড়ছেই।”

বাজারের উল্টো পাশের মহল্লা টোলারবাগের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার বলেন, “বাজারটা যে খুব বেশি পুরনো, তা নয়। করোনার পরপর এক-দুইজন করে মাছ বিক্রেতা, শাক বিক্রেতা বসতে বসতে এটা বাজার হয়ে গেছে। ২০২৩ সালের দিকে এটা বন্ধও করে দিয়েছিল পুলিশ। গত বছরের ৫ অগাস্টের পর আবারও বসতে শুরু করেছে।”
সাত্তার বলছিলেন, “আশপাশের সুপারশপ বা মিরপুরের অন্য বাজারের তুলনায় এখানে দাম তুলনামূলক কম। যে কারণে ক্রেতাও আসে প্রচুর।”
এই এলাকার ট্রাফিক ইন্সপেক্টর আল আমিনের সঙ্গে কথা হল সেখানে। তিনি বলেন, “ভাই, এটা আমার গলার কাঁটা। গত ২০ বছর ধরেই নাকি বাজার বসছে।”
কারা বসাচ্ছে এই বাজার জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “এখানে কোন নেতা নাই। এক দিক থেকে উঠিয়ে দিলে আরেক দিকে গিয়ে বসে। আমরা চেষ্টা করি, একদিক থেকে ‘লাইন আপ’ করে রাখতে, যাতে যানবাহনগুলো চলতে পারে।”
কেন ওঠানো যাচ্ছে না এই বাজার, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভাই এটা পুলিশ, সেনাবাহিনী, মোবাইল কোর্ট এরকম সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া উঠানো সম্ভব না। একদিক থেকে উঠালে আরেকদিকে গিয়ে বসে।
“অথচ এর কারণে প্রতিদিন সকালে আমাদের হন্যে হয়ে এই এলাকায় কাজ করতে হয়। আপনারা একটু লিখেন, সবাই জানুক।”
মিরপুর থেকে সাভারের পথে চলাচলকারী রাজধানী পরিবহন বাসের চালক আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, “এই রাস্তায় যানজট ঠেলতে ঠেলতে জীবন যায়। সকাল বেলায় লোকজনের এতো তাড়া আর এরা বড় রাস্তার উপর বাজার বসাই রাখছে, কেউ কিচ্ছু কয় না। এতো বড় রাস্তাটাতে একটা গাড়ি ‘ফাঁসলে’ (নষ্ট হয়ে গেলে) কষ্ট হয়ে যায়।”

সকালের মোহাম্মদপুরটা হয়ে ওঠে তীব্র যানজটের কেন্দ্র। বছিলা সেতু হয়ে কেরানীগঞ্জের একটি অংশের মানুষ যাতায়াত করেন মোহাম্মদপুরের ওপর দিয়ে। মোহাম্মদপুরের আসাদ এভিনিউ, ইকবাল রোড, বাবর রোড হয়ে কলেজ গেট পর্যন্ত দুই বর্গকিলোমিটারের মধ্যে রয়েছে অন্তত আধাডজন নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এমনিতেই যানজটে থমকে থাকে সড়কগুলো। এর মাঝেই প্রতিদিন সকালে রেসিডেন্সিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সীমানা দেয়াল ঘেঁষা ফুটপাথে প্রায় চার ঘণ্টাব্যাপী বসে বিরাট এক বাজার। একেবারে গণভবন ক্রসিং থেকে মোহাম্মদপুর ফার্টিলিটি সেন্টার পর্যন্ত রাস্তার এমাথা থেকে ওমাথা প্রায় পৌনে এক কিলোমিটার বিস্তৃত বাজারটির সামনেই পুলিশের তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের উপকমিশনারের (ডিসি) কার্যালয়।
বাজারটা যে শুধু ফুটপাথ জুড়ে বসে, তা না। রাস্তার ওপর পিকআপ ভ্যান বা কাভার্ড ভ্যানেও বিক্রি হয় জিনিসপত্র। আর ফুটপাথ ঘেঁষে রাখা হয় বাজার করতে আসা মানুষজনের গাড়ি-মোটরসাইকেল। রিকশাচালকেরাও এখানে যাত্রীর অপেক্ষায় থাকেন, আর সামনের গণভবন ক্রসিংয়ে রিকশা ঘোরানোর সুযোগ না থাকায় রিকশাগুলো চলে উল্টোপথে। যার ফলে সরু লেনের রাস্তাটি কিছুক্ষণ পরপরই আটকে যায়।
এই বাজারের বিক্রেতা মিরন বলছিলেন, মূলত সকালে যারা স্কুলে বাচ্চা নিয়ে আসেন বা জিয়া উদ্যানে হাঁটতে বের হন তারাই এই বাজারের মূল ক্রেতা। স্কুল বন্ধ থাকলে ক্রেতা কমে যায়।
এখানে নিয়মিত আসেন ব্যবসায়ী ইমরান ওয়াহিদ। তিনি বলেন, এই বাজার বহুদিন থেকেই বসছে। ২০২৩ সালের দিকে পুলিশ একবার বন্ধ করে দিয়েছিল। গতবছরের ৫ অগাস্টের পর থেকে আবার বসছে। এবার যেন বাজারের পরিধি বেড়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের একজন কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাজারটা সমস্যা, কিন্তু পুলিশের পক্ষে এটা উচ্ছেদ করা সম্ভব না। সকালে এদিকে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, বিকাল থেকে রিংরোড এলাকায় ভ্যানে করে কাপড়-জুতার ব্যবসায়ীরা প্রায় রাস্তা বন্ধ করে ফেলে।
“আমরা কোনোটাই উচ্ছেদ করতে পারছি না। কিন্তু মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে ব্যাপক।”
বাজার নিয়ে হতাশার সুর তেজগাঁও ট্রাফিক বিভাগের ডিসি রফিকুল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি বলছেন, “এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। এটা করা পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব না।”
রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি, রাস্তাগুলো যেন সকালে বাধাহীন থাকে, যানবাহনগুলো যেন চলাচল করতে পারে।”