Published : 17 Jun 2026, 01:12 PM
মানবদেহ আর মহাকাশের শূন্যতা দুটি একে অপরের একেবারেই পরিপন্থী। কোনো সুরক্ষা ছাড়া মহাকাশে পা রাখলে মানুষের দেহের দফারফা হতে সময় লাগবে না।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট এনগ্যাজেট প্রতিবেদনে লিখেছে, কেবল ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে তিনি জ্ঞান হারাবেন, আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঘটে যাবে মৃত্যু। ফলে সেখানে টিকে থাকার জন্য একদম সঠিক মহাকাশ স্যুট বা পোশাক পরাটা অতি জরুরি।
নাসা’র আসন্ন ‘আর্টেমিস থ্রি’ ও ‘আর্টেমিস ফোর’ মিশনের নভোচারীরা এমনই এক আধুনিক স্যুট পরে চাঁদে যাচ্ছেন, যেটি তৈরি করেছে ‘অ্যাক্সিওম স্পেস’। স্যুটটি ডিজাইনে তাদের সাহায্য করেছে জনপ্রিয় বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড প্রাডা।
ভেতরের পোশাক
নভোচারীদের চেনা পরিচিত সেই ভারী, ফোলা সাদা স্যুটের নিচে তারা দেহের সঙ্গে একদম লেপ্টে থাকা বিশেষ এক পোশাক পরেন। বিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম ‘লিকুইড কুলিং অ্যান্ড ভেন্টিলেশন গার্মেন্ট’, যা নভোচারীদের জন্য আরামদায়ক পোশাক হিসেবে কাজ করে।
আগের যুগের ভেতরের স্যুটগুলো দেখতে কিছুটা ‘দুনিয়া-সেরা দামি পাজামা’র মতো হলেও নতুন এ সংস্করণটি দেখতে একেবারে মার্ভেল কমিকসের সুপারহিরোদের পোশাকের মতো জমকালো ও আকর্ষণীয়।
দেখতে চমৎকার হওয়ায় এ নতুন স্যুটটি হয়ত নাসার প্রচারণায় ও নতুন ফান্ড বা তহবিল জোগাতে বেশ সাহায্য করবে। তবে এর আসল ম্যাজিক লুকিয়ে আছে এর কার্যকারিতায়।
এ স্যুটের ভেতরে জালের মতো বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে জটিল ও সূক্ষ্ম এক ধরনের টিউব বা নল। এ ব্যবস্থাটি না থাকলে মহাকাশে মানুষ দ্রুত হিটস্ট্রোক ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে মারা যেতেন।
এর কারণ হচ্ছে, মহাকাশের শূন্যতায় দেহের ভেতরের তাপ নিজে থেকে বাইরে বের হতে পারে না। ফলে দেহকে কৃত্রিমভাবে ঠান্ডা রাখার কোনো বিকল্প নেই। তার ওপর চাঁদের মাটিতে নভোচারীদের অনেক শারীরিক পরিশ্রম করতে হবে, যা দেহকে আরও দ্রুত উত্তপ্ত করে তুলবে। ফলে ফ্যাশনের ছোঁয়া থাকলেও পোশাকটি নভোচারীদের জীবন বাঁচানোর ‘পরম বন্ধু’।
এ বিশেষ পোশাকের ভেতরে থাকা টিউব বা নলগুলোর মধ্য দিয়ে অনবরত ঠান্ডা পানি প্রবাহিত হয়। এ পানি দেহের প্রধান বিভিন্ন মাংসপেশির সংস্পর্শে এসে ভেতরের বিপাকীয় তাপ শুষে নেয়।
এরপর সেই গরম হয়ে যাওয়া পানিকে পাম্প করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় নভোচারীদের পিঠে থাকা বড় আকৃতির ব্যাকপ্যাকে, যাকে বলে ‘পোর্টেবল লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম’ বা বহনযোগ্য জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা।
সবচেয়ে ভরসার কথা, এখানে ব্যাকআপ হিসেবে আরও সম্পূর্ণ বিকল্প কুলিং সার্কিট বা ঠান্ডা করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যাতে মূল ব্যবস্থাটি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গেলেও নভোচারী নিরাপদে থাকেন। জীবন-মরণের প্রশ্নে এমন ব্যাকআপ থাকা স্বস্তিদায়ক।
স্বাভাবিকভাবেই অনেকের প্রশ্ন জাগতে পারে, এ বৈজ্ঞানিক পোশাকে প্রাডা’র মতো ফ্যাশন ব্র্যান্ডের কাজ কী?
‘অ্যাক্সিওম স্পেস’ বলেছে, প্রাডা’র উন্নত বুননশৈলী ও নিখুঁত পোশাক তৈরির সক্ষমতাই তাদের এ প্রজেক্টে টেনে এনেছে। স্যুটটি উন্মোচনের অনুষ্ঠানে প্রাডা’র পক্ষ থেকে মঞ্চে হাজির হয়েছিলেন কোম্পানিটির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা।
ভালো হোক বা মন্দ সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব হচ্ছে নলে ভরা একজোড়া সাধারণ ভেতরের পোশোকের চেয়ে যদি কোনো পোশাক দেখতে ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’র স্যুটের মতো চমৎকার হয় তবে তা মানুষের মন কাড়ে বেশি।
নাসা ও প্রাডার এ অভিনব জুটিও ঠিক এই কাজটিই করেছে, যেখানে তারা বিজ্ঞানকে করে তুলেছে আকর্ষণীয়।
বাইরের পোশাক
এবার আসা যাক সেই চেনা-পরিচিত ভারী ও ফোলা সাদা রঙের বাইরের স্যুটটিতে, যা সাধারণত টিভিতে দেখে যায়। এর পোশাকি নাম ‘অ্যাক্সিওম এক্সট্রাভেহিকুলার মোবিলিটি ইউনিট’ এবং এটা তৈরিতেও রয়েছে প্রাডার ছোঁয়া।
বাইরের মহাকাশ স্যুটের সবচেয়ে প্রধান কাজ বায়ুচাপ বা প্রেসার নিয়ন্ত্রণ করা। এ ব্যবস্থাটি না থাকলে মহাকাশে নভোচারীদের অবস্থা কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না!
মহাকাশের চরম নিম্ন বায়ুচাপের কারণে ফুসফুসের বাতাস আচমকা ফুলে ফেঁপে উঠে দেহের ভেতরের নরম কোষগুলো ছিঁড়ে ফেলবে। একইসঙ্গে শূন্যস্থানে তরল পদার্থের স্ফুটনাঙ্ক কমে যায়। ফলে পেশিতে থাকা পানি বাষ্প হতে শুরু করবে ও নভোচারীরা ‘চার্লি অ্যান্ড দ্য চকোলেট ফ্যাক্টরি’র ভায়োলেট বিউরেগার্ডের মতো ফুলে ঢোল হয়ে যাবেন! কেবল তাই নয়, রক্তে বুদবুদ তৈরি হওয়ার কারণে এক মিনিটের মধ্যে দেহের রক্তসঞ্চালন পুরো বন্ধ হয়ে যাবে।
যেহেতু নভোচারীরা বেঁচে ফিরতে চান ফলে বাইরের স্যুটটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যা দেহের আশপাশের বায়ুচাপকে একদম নিরাপদ ও স্বাভাবিক রাখে। এর সাদা রং সূর্যের তীব্র তাপকে প্রতিফলিত করে ফিরিয়ে দেয় এবং চাদের ক্ষতিকর ধুলাবালি থেকে দেহকে রক্ষা করে। চাঁদের এসব সূক্ষ্ম ধূলিকণা ফুসফুসে ঢুকলে তা মাসের পর মাস আটকে থাকতে পারে।
বাইরের স্যুটেও রয়েছে নলের এক জটিল কারসাজি। নভোচারীর পিঠের ব্যাকপ্যাক থেকে একটি ভেন্টিলেশন লুপ অনবরত হেলমেটের ভেতরে ও মুখের সামনে টাটকা অক্সিজেন সরবরাহ করে।
শুনতে আরামদায়ক মনে হলেও এর আসল উদ্দেশ্য জীবন বাঁচানো। নভোচারী নিজে যে কার্বন ডাই অক্সাইড ত্যাগ করছেন তা যেন হেলমেটের ভেতর জমে দমবন্ধ পরিস্থিতির তৈরি না করে এ ব্যবস্থাটি সেটাই নিশ্চিত করে। এটি মুখ থেকে বেরিয়ে আসা বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডকে সরিয়ে নিয়ে আবার ব্যাকপ্যাকে থাকা লাইফ সাপোর্ট সিস্টেমে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে গ্যাসটি ফিল্টার হয়ে আবার বিশুদ্ধ অক্সিজেন হিসেবে ফেরত আসে। ভেতরের স্যুটের মতো এ বাইরের স্যুটেও জরুরি অবস্থার জন্য একাধিক ব্যাকআপ নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এ স্যুটটি পরে নভোচারীরা অনায়াসে আট ঘণ্টারও বেশি সময় মহাকাশে বা চাঁদের মাটিতে হেঁটে বেড়াতে পারবেন। অ্যাপোলো মিশনের যুগের স্যুটের মতো এটা কেবল নির্দিষ্ট একজনের মাপে তৈরি নয়। নারী ও পুরুষ উভয়ের দেহের যে কোনো গড়ন ও উচ্চতার সঙ্গে সহজেই খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
হেলমেট ও এর সামনের কাচে বিশেষ কোটিং বা প্রলেপ ব্যবহৃত হয়েছে, যা নভোচারীদের দেখার সক্ষমতা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি গ্লাভস, যা ‘বর্তমানে ব্যবহৃত গ্লাভসগুলোর চেয়ে প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক গুণ এগিয়ে’ বলে দাবি এর নির্মাতা কোম্পানি অ্যাক্সিওম স্পেসের।
এবার চাঁদের বুকে যাত্রার পালা
২০২৭ সালে নাসার ‘আরর্টেমিস থ্রি’ মিশনটি পরিচালিত হবে। এ মিশনের মূল উদ্দেশ্য পৃথিবীর কাছাকাছি কক্ষপথে এ নতুন মহাকাশ স্যুট ও নতুন লুনার ল্যান্ডার বা চাঁদে নামানোর যানের পরীক্ষামূলক মহড়া চালানো। আর এটাই মূল ও সবচেয়ে বড় অভিযানের পথ তৈরি করবে।
সব ঠিক থাকলে ২০২৮ সালে মহাকাশে উঠে যাবে ‘আর্টেমিস ফোর’ মিশন। ১৯৭২ সালের ঐতিহাসিক ‘অ্যাপোলো ১৭’ মিশনের পর এটাই হতে যাচ্ছে মানুষের আবার চাঁদের বুকে পা রাখার প্রথম কোনো মিশন।
এ মিশনটি আরও একটি কারণে ইতিহাস গড়বে। কারণ, এবারই প্রথম মানুষ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে পা রেখে অনুসন্ধান চালাবে। সেখানকার পরিবেশ প্রচণ্ড বৈরী ও চরম শীতল। নভোচারীরা সেখানে প্রায় এক সপ্তাহ সময় কাটাবেন, বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করবেন ও বরফাকৃতির পানির সন্ধান করবেন।
অ্যাক্সিওম বলেছে, স্যুটটি চাঁদের দক্ষিণ মেরুর তীব্রতম ঠাণ্ডাতেও অন্তত দুই ঘণ্টা পর্যন্ত নভোচারীদের সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে পারবে।
সেখানে গিয়ে তারা পানির সন্ধান পাক আর না পাক, অন্তত একটা বিষয় নিশ্চিত যে, স্যুটটি পরে চাঁদের বুকে হাঁটার সময় নভোচারীদের দেখতে একদম সুপারহিরোদের মতোই লাগবে।