কয়রায় ধসে যাওয়া বাঁধের মেরামত হলো স্বেচ্ছাশ্রমে, কাটেনি আতঙ্ক

জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাইকিং করে গ্রামবাসীকে বাঁধের কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়।

শুভ্র শচীন, খুলনা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Nov 2022, 05:05 AM
Updated : 12 Nov 2022, 05:05 AM

খুলনার কয়রা উপজেলার শাকবাড়িয়া নদীর ধসে যাওয়া বেড়িবাঁধটি স্বেচ্ছাশ্রমে প্রাথমিকভাবে মেরামত করতে পারলেও আবার ভেঙে যাওয়ায় শঙ্কায় রয়েছে এলাকাবাসী।

বৃহস্পতিবার ভোরে উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়নের খাশিটানা গ্রামের পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের ১৩-১৪/১ নম্বর পোল্ডারের ২০০ মিটার অংশ ধসে যায়। তবে এ সময় নদীতে ভাটা চলায় লোকালয়ে পানি ঢোকেনি।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকুনুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার সকালে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে মাইকিং করে গ্রামবাসীকে বাঁধের কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়। সকাল থেকেই সাধারণ মানুষ এগিয়ে এসেছেন; স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধটি মেরামত করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, এ সময় কেউ বস্তায় মাটি তুলে দেন আবার কেউ মাটির বস্তা নিয়ে বাঁধের ভাঙা জায়গায় ফেলেন। দুপুরের দিকে বিরতি দিয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কাজ করে জোয়ারের আগেই বাঁধটি মেরামত করে ফেলেন এলাকার লোকজন।

দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জানান, ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধটি ব্লক দিয়ে সংস্কার করা হয়েছিল।

এরপর গত বছর থেকে ওই বাঁধে আবার ভাঙন দেখা দেয়। তিন মাস আগে কিছু জিও ব্যাগ দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হলেও বাঁধটি টেকসইভাবে সংস্কার করা হয়নি।

“বৃহস্পতিবার ভোরে আবারও বাঁধের ২০০ মিটার অংশ ধসে যায়। তবে এসময় নদীতে ভাটা চলায় লোকালয়ে পানি প্রবেশ করতে পারেনি।” বলেন তিনি।

বেড়িবাঁধ ভাঙনে বাঁধসংলগ্ন খাশিটানা, আংটিহারা, ঘড়িলাল, জড়শিং ও ছোট আংটিহারা গ্রামের প্রায় সাত হাজার মানুষ হুমকিতে রয়েছে বলে জানান এ ইউপি চেয়ারম্যান।

তিনি বলেন, “নদীর লোনাপানিতে ডুবে যাওয়ায় আশঙ্কায় রয়েছে প্রায় ২০০ একর আমন ফসলের ক্ষেতসহ অসংখ্য মাছের ঘের। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রাথমিকভাবে পানি প্রবেশ ঠেকাতে পারলেও জোয়ারে ভেঙে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।”

কয়রা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম শফিকুল ইসলাম বলেন, “ভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ উপকূলে এখন নিয়মিত বিষয়। ভাঙনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করে জীবিকা চালানো এ এলাকার মানুষ উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।”

বাঁধের ভেঙে পড়া অংশটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাতক্ষীরা বিভাগ-২-এর আওতায় পড়েছে। সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহনেওয়াজ তালুকদার বলেন, “ধসে যাওয়া বাঁধটি সংস্কারের জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের বস্তা, বাঁশ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে ভাঙন কবলিত ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হবে।“

এছাড়া দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের পানখালি বেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেওয়ায় শঙ্কার মধ্যে রয়েছেন এলাকাবাসী।

পানখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ সাব্বির আহমেদ বলেন, গত মঙ্গলবার ভোরের ভাটায় ৩১ নম্বর পোল্ডারের পানখালি বেড়িবাঁধের ১০০ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতির কারণেই বাঁধ ভেঙেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, “বাঁধটি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আগে ফাটল ধরলে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বললেও তারা এগিয়ে আসেননি। যেকোনও মুহূর্তে বাঁধের বাকিঅংশ বিলীন হয়ে এলাকা প্লাবিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।”

এ বিষয়ে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সুজাত কর্মকার জানান, পানখালিতে নদীগর্ভে বিলীন হওয়া বাঁধের ভাঙনের স্থলে বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ও সিনথেটিক ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। ওইস্থানে জিও টিউব এবং মাটির কাজের প্রস্তুতি চলছে।

দাকোপ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবুল হোসেন বলেন, “অর্ধশত বছর আগে নির্মিত এসব বেড়িবাঁধ এখন আর টিকছে না। সক্ষমতা হারিয়েছে।”

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার দত্ত বলেন, উপকূলে পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মাটির কণাগুলো একে অপরের সঙ্গে আঁকড়ে ধরে রাখার ক্ষমতা হারাচ্ছে, ঝুরঝুরে হয়ে যাচ্ছে। ফলে ভাঙন বাড়ছে, বেড়িবাঁধগুলো টিকছে না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক