বৃষ্টির অভাবে পাট ও আমন নিয়ে বিপাকে ৬ জেলার চাষি

যশোরের চাষিরা ১০ শতাংশ জমির পাটও কেটে জাগ দিতে পারেননি।

যশোর প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 31 July 2022, 02:41 PM
Updated : 31 July 2022, 02:41 PM

বৃষ্টির দেখা না পাওয়ায় আমন ধান ও পাট নিয়ে বিপাকে পড়েছেন যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ছয় জেলার কৃষক।

যশোর, ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও মাগুরায় অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে আমনের মাঠ। ফলে এই অঞ্চলে এ বছর আমন আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।

অপরদিকে, পাটের ভবিষ্যত নিয়েও চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এসব জেলার চাষি। ভালো ফলন হলেও শেষমেষ পানির অভাবেই তাদের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হতে চলেছে বলে শঙ্কায় কৃষক।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই ছয় জেলায় নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ছয় হাজার ৯৯৫ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে।

তবে পাট কেটে জাগ দেওয়ার ভরা মৌসুম পেরিয়ে গেলেও এখনও পর্যন্ত এ অঞ্চলের চাষিরা ১০ শতাংশ জমির পাটও কেটে জাগ দিতে পারেননি। বাকি ৯০ শতাংশ জমির পাট কাটার ক্ষেত্রে বৃষ্টির ওপরই নির্ভর করছেন। বৃষ্টিপাত হলেও পুকুর, খাল-বিলে পানি জমার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

চাষিরা জানান, গত বছরে পাটের ভালো দাম পেয়ে এ বছর বেশি লাভের আশায় সাধ্যমতো পাট আবাদ করেছেন। কিন্তু চাষের শুরুর দিক থেকে প্রত্যাশিত বৃষ্টি না হওয়ার পাশাপাশি তীব্র খরার কারণে ক্ষেতের পাটের চারা নষ্ট হয়ে যায় কোথাও কোথাও। এ পরিস্থিতিতে অধিকাংশ চাষিই বাড়তি খরচ করে সেচের পানি দিয়ে পাট বাঁচিয়ে রাখেন।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই ছয় জেলায় এক লাখ ৬২ হাজার ৩৮৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও আবাদ হয়েছে এক লাখ ৬৯ হাজার ৩৮২ হেক্টর জমিতে। আবাদকৃত জমিতে ২০ লাখ ৩২ হাজার বেল পাট উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

এর মধ্যে যশোর জেলায় পাটের আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৮৮০ হেক্টর জমিতে। এ জেলায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯৮ হাজার ৫৬০ বেল পাট।

ঝিনাইদহে পাটের আবাদ হয়েছে ২৩ হাজার ৫৯০ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮৩ হাজার ৮০ বেল পাট।

মাগুরায় পাটের আবাদ হয়েছে ৩৬ হাজার ৯৩০ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে চার লাখ ৪৩ হাজার ১৬০ বেল পাট।

কুষ্টিয়ায় পাটের আবাদ হয়েছে ৪১ হাজার ৬৭৩ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার বেল পাট।

চুয়াডাঙ্গায় পাটের আবাদ হয়েছে ২০ হাজার ৭২৯ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৮ হাজার ৭৪৮ বেল এবং মেহেরপুর জেলায় ২১ হাজার ৫৮০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এ জেলায় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৫৮ হাজার ৯৬০ বেল।

যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের বিল হরিণার বিস্তীর্ণ মাঠ ঘুরে দেখা যায়, কৃষকরা পাট কেটে জমিতে ফেলে রেখেছেন। কোনো কোনো কৃষক তার ক্ষেতের উৎপাদিত পাট দুই কিলোমিটার দূরে নিয়ে খাল-বা ডোবায় জাগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বেশিরভাগ চাষিই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন ক্ষেতের পাট কোথায় জাগ দেবেন তা নিয়ে।

মানসম্মত পাট উৎপাদন নিয়ে শঙ্কিত চাষিরা জানান, পাটের ভালো দাম পেতে হলে রং ভালো হতে হবে। আর ভালো রং পেতে হলে খাল-বিল, নদী-নালায় পাট পচাতে হবে।

স্থানীয় চাষি কালিপদ দাস বলেন, “এ বছর বৃষ্টির অভাবে খাল-বিলে পানি জমেনি। যে কারণে পাট পচাতে আমরা কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছি না। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমরা নিশ্চিত পাট নিয়ে এবার পথে বসবো।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সৌমিত্র সরকার বলেন, এরই মধ্যে যশোরের আট উপজেলার চাষিরা তাদের ক্ষেতের পাট কাটতে শুরু করেছেন। ১০ শতাংশ জমির পাট কেটে জাগ দেওয়া হয়েছে। তবে পানির অভাবে পাট পচাতে কিছুটা সমস্যা হলেও সামনে ভারি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান।

তিনি জানান, শ্রাবণ মাসে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে কৃষককে কষ্ট করা লাগবে না। এ বছর পাটের দাম বাড়বে বলেও তিনি আশা করেন।

যশোর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. এখলাছ উদ্দিন বলেন, “বৃষ্টিহীনতার কারণে আমরা আমন ধানেও পিছিয়ে আছি। এখন দেখছি শ্রাবণের বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আশা করছি, পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলে কৃষকের সব অনিশ্চয়তা দূর হয়ে যাবে।”

এদিকে অনাবৃষ্টিতে পুড়ছে এ অঞ্চলের আমনের মাঠ। অন্যান্য বছরে এমন পরিস্থিতিতে পুকুর বা খালের পানি দিয়ে কৃষকরা কোনো রকম চাষাবাদ করলেও এবার সে পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে এ বছর আমন আবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোর অতিরিক্ত পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলার জন্য আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় চার লাখ ৫৫ হাজার ৩৫৪ হেক্টর জমি।

এর মধ্যে যশোর জেলায় এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৪৭ হেক্টর, ঝিনাইদহে এক লাখ চার হাজার ৭৫০ হেক্টর, মাগুরায় ৬১ হাজার ৪৭২ হেক্টর, কুষ্টিয়ায় ৮৮ হাজার ৮৯৫ হেক্টর, চুয়াডাঙ্গায় ৩৪ হাজার ৯২০ হেক্টর এবং মেহেরপুর জেলায় ২৬ হাজার ৩৭০ হেক্টর জমি রয়েছে।

এসব জমিতে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাতের ধান চাষ করার কথা রয়েছে। তবে, এই ছয় জেলার মধ্যে শুধু যশোর, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলায় এখন পর্যন্ত মাত্র দুই হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে আমনের চারা রোপন করা হয়েছে।

কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর জেলায় এখনও পর্যন্ত এক শতাংশ জমিতেও আমনের চারা রোপন করতে পারেননি চাষিরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. নূরুজ্জামান বলেন, শুধু যশোরেই নয়। প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে দেশের অনেক জেলাতেই প্রায় একই অবস্থা। এ ব্যাপারে আমরা কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছি।

তবে আমন মৌসুমের ধান রোপণের সময় এখনও খুব বেশি পিছিয়ে যায়নি। আগস্ট মাসের শেষ পর্যন্ত রোপণ করা যাবে। বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা করেন।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোর আঞ্চলিক কার্যালয়ের অতিরিক্ত পরিচালক মো. এখলাছ হোসেন বলেন, আমন আবাদ নিয়ে কৃষকের পাশাপাশি আমরাও চিন্তায় আছি। তবে এখনও চাষের সময় চলে যায়নি। খুব সহসা বৃষ্টি হলেই সমস্যা কেটে যাবে।

“এরই মধ্যে প্রায় এলাকাতেই ধানের চারা রোপন শুরু হয়েছে। প্রকৃতিতে যে আবহাওয়া বিরাজ করছে তাতে খুব তাড়াতাড়িই কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টি পাওয়া যাবে বলে আশা করছি”, বলেন এ কৃষিবিদ।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক