ফরিদপুরে পানি সংকটে পাট জাগ দেওয়া নিয়ে বিপাকে কৃষক

পাটের আঁশের রং কালচে হওয়ায় বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন চাষি।

ফরিদপুর প্রতিনিধিশেখ মফিজুর রহমান শিপনবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 July 2022, 12:18 AM
Updated : 24 July 2022, 12:18 AM

পাটের জন্য বিখ্যাত ফরিদপুর জেলার চাষিরা এবার পানি সংকটে ভুগছেন; আবাদ ভাল হলেও পাট জাগ দেওয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।

জেলার বোয়ালমারী, নগরকান্দা, সালথা, মধুখালী, ভাঙাসহ বিভিন্ন উপজেলার চাষিরা বলেছেন, না কাটার কারণে কিছু পাট খেতেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অনেকে আবার পাট কেটে বাধ্য হয়ে অপরিষ্কার পানিতে জাগ দিচ্ছেন। ফলে পাটের আঁশের রং কালচে হওয়ায় বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম পাওয়া নিয়ে শঙ্কায় আছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হজরত আলী বলেন, “পাট জাগ দেওয়া নিয়ে জেলার কৃষক বিপদে আছে। বৃষ্টি নেই, নিচু জমিতে পানিও নেই। খেতে পাট মরে যাচ্ছে।

“যে জমিতে দুই-তিন ইঞ্চি পানি আছে সেখানে পাট জাগ দেওয়ায় গরমের কারণে তাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এতে পাটের রং নষ্ট হয়ে দাম কমে যাবে। পাট নিয়ে কোটি কোটি টাকা লোকশানের মুখে পড়েছে কৃষক।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় চলতি অর্থবছরে পাটের আবাদ হয়েছে ৮৫ হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে। এতে দুই লাখ ৪০০ মেট্রিক টন পাট উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

চাষিরা জানান, বৃষ্টি না হওয়ায় বেশির ভাগ জলাশয়ে পানি নেই। এ অবস্থায় অনেকে খেত থেকে পাট কাটার সাহস পাচ্ছেন না। সময়মতো খেত থেকে পাট না কাটায় গাছের গোড়ার দিকে আধ হাত পরিমাণ কালচে রং ধরে গেছে। কেউ কেউ ক্ষেত থেকে পাট কেটে ফেললেও পানির অভাবে জাগ দিতে না পেরে রাস্তার ওপর স্তুপ করে রেখেছেন। এ অবস্থায় পাটের গুণগত মান নষ্ট হয়ে ভালো দাম না পাওয়ার আশঙ্কায় আছেন তারা।

নগরকান্দা উপজেলার হিয়াবলদী গ্রামের কৃষক সরোয়ার মাতুব্বর (৫৭) জানান, তিনি এবার চার বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন। তিন বিঘা জমি ঢালু থাকায় সেখানের পাট কেটেছেন প্রায় ১৭-১৮ দিন আগে। পানি না আসায় এক বিঘা জমির পাট তিনি কাটেননি। অপেক্ষায় ছিলেন পানি আসার। কিন্তু ১৫ দিন অপেক্ষা করেও পানি না আসায় বাধ্য হয়ে ক্ষেত থেকে পাট কাটেন। দেরিতে পাট কাটায় পাতা পুড়ে আঁশের রং কালচে হয়ে যায়।

সালথা উপজেলার গোট্টি ইউনিয়নের কৃষক আলাউদ্দিন মিয়া বলেন, “আশপাশে পানি না থাকায় পাট কেটে ক্ষেত থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একটি খালে নিয়ে যেতে হয়েছে জাগ দেওয়ার জন্য। এতে শ্রমিক বাবদ অন্তত ১৮ হাজার টাকা বেশি খরচ হয়েছে।”

কৃষকরা জানান, পাট জাগ দিতে প্রায় চার থেকে পাঁচ হাত গভীর জলাশয় প্রয়োজন। অন্য বছর জুন মাসের শেষের দিকে খাল-বিল ও নালায় পানি চলে আসে। এ বছর বৃষ্টি কম হওয়ায় এবং নদ-নদীর পানি না আসায় সংকট দেখা দিয়েছে।

পাট জাগ দিতে নসিমন বা ভ্যানে করে নিয়ে যেতে হচ্ছে কয়েক কিলোমিটার দূর। এ জন্য শ্রমিক লাগছে বিঘাপ্রতি ১০ জন করে বেশি।

নগরকান্দা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তিলক কুমার ঘোষ বলেন, “পানির অভাবে জাগ দিতে না পারায় তীব্র রোদে উপজেলায় প্রায় ৪০ হেক্টর জমির পাট পুরোপুরি পুড়ে গেছে।”

সদর উপজেলার কানাইপুর বাজারের পাট ব্যবসায়ী আনন্দ সাহা, আরিফুজ্জামান চানসহ কয়েকজন বলেন, পাটের রং নষ্ট হয়ে গেলে দাম কমে যাবে। ভালো রংয়ের পাট যদি তিন হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি হয়, তাহলে রং নষ্ট হওয়া পাট আড়াই হাজার টাকার বেশি হবে না।

পাট অধিদপ্তরের ফরিদপুরের উপ-পরিচালক মরিয়ম বেগম বলেন, “পাট সহজে পচানোর জন্য পাট গবেষণা অধিদপ্তর ‘রিবন রেটিং পদ্ধতি’ চালু করেছিল। এ পদ্ধতিকে পাট কাটার পর পাটের ছাল আলাদা করে সে ছাল পচিয়ে নেওয়া হয়। এতে পানি কম লাগে। তবে খরচ বেড়ে যায় বলে কৃষক এ পদ্ধতি গ্রহণ করেনি। এ পদ্ধতির বাইরে পাট পচানোর ক্ষেত্রে নতুন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার করা যায়নি।”

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, “পানির সংকট রয়েছে এ কথা ঠিক, তবে আমরা প্রত্যেক উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিয়েছি, যেখানে জলাশয় রয়েছে সেখানে পাট জাগ দেওয়ার ব্যবস্থা করার।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক