দূর পাহাড়ের আলো রূপনা-ঋতুপর্ণা

রূপনা ও ঋতুপর্ণার সাফল্যে তার পরিবারের পাশাপাশি গর্বিত এলাকাবাসীও।

ফজলে এলাহীরাঙামাটি প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 Sept 2022, 05:44 AM
Updated : 21 Sept 2022, 05:44 AM

মঙ্গলবার দুপুরটা আর ১০টা দিনের মত ছিল না কালাসোনা চাকমার। মাঝবয়স পেরোনো এই নারীর চোখেমুখে খুশির ঝলক। একমাত্র মেয়ে রূপনা চাকমা যে দক্ষিণ এশিয়া জয় করে ফিরছে; তারই দ্যুতি মায়ের চোখে।

কালাসোনার স্বামী নেই, দুই ছেলে জুম চাষেই খুঁজে নিয়েছে জীবনের নির্ভরতা। এই মেয়েটাই যেন সংসারের চালিকাশক্তি। শত অভাব-অনটনের মধ্যেও দূর পাহাড়ের গায়ে রূপনাদের ছোট্ট কুঁড়েঘর থেকে আজ যেন বেরুচ্ছে আলোর রোশনাই।

রূপনার বাসায় মঙ্গলবার দুপুরে যখন জেলা প্রশাসকসহ বিশাল বহর হাজির, তা দেখে আপ্লুত হয়ে পড়েন কালাসোনা চাকমা। আপ্লুত জেলা প্রশাসকও। তিনি পাহাড়ের এই দুই খেলোয়াড়ের প্রত্যেকের পরিবারকে দেড় লাখ টাকার চেক ও মিষ্টি-ফলমূল উপহার হিসেবে দিয়েছেন।

নেপালের কাঠমান্ডুতে সোমবার ফাইনালে স্বাগতিক দলকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো নারী সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয় করে বাংলাদেশ।

বুধবার দুপুরে তারা দেশে ফিরবে। তাদের বরণ করে নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েছে বাফুফে।

মেয়ের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার অনুভূতির কথা জানতে চাইলে কালাসোনা চাকমা বলেন, “আমার মেয়ে যে আজ দেশ পেরিয়ে বিদেশে খেলতে গেছে আমার খুব ভালো লাগতেছে, আমি খুব খুশি। মেয়ের খেলা আমি মোবাইলে দেখেছি। খেলা শেষে মেয়ে ভিডিও কলে আমাকে কাপ দেখিয়ে বলেছে, মা অনেক কষ্টের বিনিময়ে এটা পেয়েছি। গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে।”

নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ির ভূঁইয়াদম এলাকায় রূপনা চাকমার বাড়ি যাওয়া সহজ নয়। প্রধান সড়ক থেকে প্রায় ২৫ মিনিট হেঁটে, ভাঙা নড়বড়ে এক সেতু পেরিয়ে যেতে হয়। সেতু এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে, যেকোনো সময় ভেঙে পড়বে মনে হচ্ছিলো। বাড়ি থেকে রূপনার স্কুলও অনেক দূরে। ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এর দশম শ্রেণির ছাত্রী সে।

রূপনার বড় ভাই শান্তি জীবন চাকমা বলেন, “বোনের খেলা আমি দেখতে পারি নাই, জমিতে কাজ করার কারণে। মা আমাকে ফোন করে বলেছে। আমি শুনে খুব খুশি হয়েছি। আমাদের বোন পুরো বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছে। ভাই হিসেবে আমি খুব গর্বিত।”

ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সুবিলাস চাকমা বলেন, “আমরা গ্রামবাসী খুবই খুশি। আজ রূপনার জন্য সারাদেশে আমাদের গ্রামটিও আলোচনায়। জেলা প্রশাসকসহ সবাই এসেছেন। এই গ্রামে কখনও এত বড় অফিসার আসেননি। আজ রূপনার জন্য এলেন সবাই।”

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, “চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাসই করতে পারবে না, এই মেয়েটা কোথা থেকে উঠে এসেছে। জীবন-সংগ্রাম কী জিনিস, তাই যেন নিজের চোখে দেখলাম।”

“আমি এই মেয়েটিকে বাড়ি করে দিব, কথা দিয়ে এসেছি। যেকোনোভাবেই হোক করব এটা।”

রূপনাদের প্রতিবেশী আলো বিকাশ চাকমা বলেন, “রূপনা আমাদের এলাকারই মেয়ে। ছোটবেলা থেকে আমরা তার ফুটবলের প্রতি আর্কষণ দেখেছি। সে মেয়েদের সঙ্গে তেমন মিশতো না; ছেলেদের সঙ্গে মিশে তাদের সঙ্গে খেলে। কালকে তার খেলা আমরা দেখেছি। নেপালের বিপক্ষে খেলে যে গৌরব অর্জন করেছে আমরা গ্রামবাসীরা সত্যিই খুব আনন্দিত ও গর্বিত।”

ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রিপনা চাকমা বলেন, “রূপনাদের পরিবারের অবস্থা তেমন ভালো না। জন্ম থেকে সে বাবার মুখ দেখে নাই। ছোটবেলা থেকে সে ফুটবল খেলতো। তার এই অর্জন আমাদের এলাকার মানুষের, বাংলাদেশের সকলের।”

ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চন্দ্রা দেওয়ান, তার সাবেক ও বর্তমান তিন ছাত্রী বাংলাদেশের জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাদের এই অসামান্য অর্জনে যারপরনাই খুশি চন্দ্রা।

তিনি বলেন, “রূপনা এখনও আমার স্কুলের ছাত্রী, ঋতুপর্ণাও এখানে পড়ত, সে এখন বিকেএসপিতে পড়ছে। আর মনিকা চাকমাও এই স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেছে। আমার ছাত্রীদের অর্জনে আমি গর্বিত। একজন মার যেমন তার সন্তানদের অর্জনে আনন্দে বুক ভরে যায়, আমারও একই অনুভূতি হচ্ছে।”

ঋতুপর্ণা চাকমার বাড়িও দুর্গম পাহাড়ি এলাকাতেই। রাঙামাটি শহর পেরিয়ে কাউখালি উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়িতে ঋতুপর্ণাদের বাড়ি। প্রধান সড়ক ছেড়ে প্রায় এক ঘণ্টা হাঁটতে হয়। মেঠোপথ আর ধানি জমির আল ভেঙে যেতে হয়। জেলার প্রশাসনের প্রতিনিধিদের দেখে আবেগে কেঁদে ফেলেন ঋতুপর্ণার মা বসুবতি চাকমা। মাত্র কয়েকদিন আগেই বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পরিবারের এক ছেলে মারা গেছে। সেই শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি। তবু মেয়ের অর্জনে হাসিমাখা মুখ।

বসুবতি চাকমা বলেন, “মেয়ের খেলা দেখেছিলাম, খুবই ভালো লেগেছে। দেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে, আমার মেয়ে সেই দলের সদস্য। এলাকার মানুষ আমাদের সম্মান দেখাচ্ছে, দেখেই ভালো লাগছে।”

ঘাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন বলেন, “আমরা শিগগির এই পথটি করে দিব। যে মেয়েটি আমাদের জন্য এত বড় অর্জন বয়ে নিয়ে এসেছে, তার জন্য এটা করবই আমরা।”

আরও পড়ুন:

Also Read: সাফ ফুটবলজয়ী রূপনা-ঋতুপর্ণার বাড়িতে রাঙামাটির জেলা প্রশাসক

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক