শেরপুরে ‘ফাতেমা রানীর তীর্থস্থানে’ পুণ্যার্থীদের আলোক শোভাযাত্রা
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান ধর্মীয় এ সমাবেশ প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়।
‘মানবতার জননী ফাতেমা রানী মা মারিয়া’- এই মূল সুরকে সামনে রেখে শেরপুরে শুরু হয়েছে ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের ফাতেমা রানীর ২৯তম বার্ষিক তীর্থোৎসব।
নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লীতে বৃহস্পতিবার শুরু হওয়া এ উৎসবে অংশ নিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আসা হাজার হাজার পুণ্যার্থী।
উৎসবের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার রাতে প্রায় অর্ধলক্ষ পুণ্যার্থীর হাতে প্রজ্বলিত মোমবাতির আলোয় আলোকিত হয়ে উঠে গারো পাহাড়ের এ তীর্থস্থান।
‘মা মারিয়া’র প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, তার কাছে আশীর্বাদ ও কৃপা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে এ আলোক শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে আঁকাবাঁকা দুই কিলোমিটারের বেশি পাহাড়ি পথে পাড়ি দেন পুণ্যার্থীরা।
প্রজ্বলিত মোমবাতি হাতে নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিনও।
আয়োজক কমিটির সমন্বয়ক ও বারোমারী মিশনের ফাদার তরুণ বানোয়ারী বলেন, ১৯৪২ সালে গারো পাহাড়ের বুকে প্রায় ৪২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় বারোমারী সাধু লিওর ধর্মপল্লী। পর্তুগালের ফাতেমা নগরীর আদলে গড়ে ওঠা এ স্থানটিকে ১৯৯৮ সাল থেকে বার্ষিক তীর্থস্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ খ্রিস্টান ধর্মীয় এ সমাবেশ প্রতি বছর অক্টোবর মাসের শেষ বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অনুষ্ঠিত হয়। এতে আলোক শোভাযাত্রা, প্রার্থনা, নিশি জাগরণ, জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিস্টযোগসহ নানা ধর্মীয় আয়োজনে অংশ নেন পুণ্যার্থীরা।
বৃহস্পতিবার উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ মোমবাতি হাতে আলোক শোভাযাত্রা শেষে রাত ১১টায় মা মারিয়ার মূর্তিকে সামনে রেখে বিশাল প্যান্ডেলে আরাধনা করা হয়। এরপর রাত ১২টায় নিরাময় অনুষ্ঠান ও নিশি জাগরণের মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের ধর্মীয় আয়োজন শেষ হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার জীবন্ত ক্রুশের পথ ও মহাখ্রিস্টযোগের আয়োজন করা হয়।
ফাদার তরুণ বানোয়ারী আরও বলেন, আবহাওয়া ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অন্যবারের তুলনায় এবার ভক্তদের উপস্থিতিও বেশি। এবারের অনুষ্ঠানে প্রধান পুরোহিত ছিলেন ময়মনসিংহ ধর্মপ্রদেশের বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি।
বিশপ পনেল পল কুবি সিএসসি বলেন, “আমরা ভক্তরা মা মারিয়ার মাধ্যমে আল্লাহ, ঈশ্বর ও ভগবানের কাছে প্রার্থনা করলে তিনি তা পূর্ণ করেন। মানুষের চাহিদা ও প্রয়োজন পূরণ করেন। এআইসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি যেন মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক, তা প্রার্থনা করি। ”
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তীর্থযাত্রীরা বলেন, প্রতিবছর এখানে এসে তারা মনের আশা পূরণ এবং অতীতের ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়ে মা মারিয়ার কাছে প্রার্থনা করেন।
তারা বলেন, মা মারিয়ার কাছে এলে মনে এক ধরনের শান্তি পান। এখানে এসে পরিবারের জন্য কিছু কেনাকাটাও করেন তারা। সব মিলিয়ে বছরে একবার অনেকের সঙ্গে দেখা হয়, এটাও একটা ব্যাপার।
এদিকে তীর্থোৎসবের পাশে বিশাল মাঠ জুড়ে নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে মেলা বসেছে। এখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে নির্বিঘ্নে কেনাকাটা করতে দেখা গেছে।
উৎসব ঘিরে নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
শেরপুরের পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম বলেন, চার শতাধিক পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্যরা নিরাপত্তায় কাজ করছেন। এ ছাড়া এসআরবি, বিজিবি, আনসারসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করছেন।
শেরপুরের জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়েছে।
পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সতর্কতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। সুশৃঙ্খল ও নিরাপদ পরিবেশে তীর্থোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে, বলেন তিনি।
