বাঁকখালীতে কাগজের জাহাজে সম্প্রীতির বার্তা
কক্সবাজারের রামুতে নৌকার ওপর সাজানো হয় কাগজ দিয়ে তৈরি নানা আকৃতির কল্প জাহাজ।
কাগজে গড়া কল্পিত জাহাজ, নদীর দুই তীরে হাজারো দর্শনার্থী আর নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের মিলন মেলা। কক্সবাজারের রামুতে বাঁকখালী নদীর তীরে জাহাজ ভাসা উৎসব যেন ঐতিহ্যের পাশাপাশি সম্প্রীতিরও এক বর্ণিল আয়োজন।
বৌদ্ধ ধর্মীয় ইতিহাসের স্মৃতি ধারণ করে চলে আসা এই উৎসব এখন আর কোনো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; নদীর দুই তীরে একত্র হওয়া মানুষের কাছে এটি হয়ে উঠেছে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের প্রতীক।
সোমবার দুপুরের পর থেকেই বাঁকখালী নদীর দুই তীরে আসতে শুরু করেন মানুষ। নৌকার ওপর সাজানো হয় কাগজ দিয়ে তৈরি নানা আকৃতির কল্প জাহাজ। বর্ণিল এসব নৌকা দেখতে নদীর পাড়ে ভিড় করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা দর্শনার্থীরা।
উৎসবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। তিনি জাহাজ ভাসা উৎসবকে জাতীয় উৎসবের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আপনারা যে কথা বলেছেন, এই কর্মসূচিটাকে জাতীয় উৎসব হিসেবে আমরা গ্রহণ করতে পারি কি-না, আমরা নিশ্চয়ই এরকম উৎসবকে আমাদের জাতীয় উৎসবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সিদ্ধান্ত নেব।
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আপনাদের এখান থেকে ফিরে গিয়ে আপনাদের এই বর্ণাঢ্য, বর্ণিল ও আনন্দময় উৎসবের সবকিছু সম্পর্কে জানাব।”
আড়াই হাজার বছরের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে ‘কল্প জাহাজ’
রামু সীমা বিহারের প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষুর ভাষ্য অনুযায়ী, কল্প জাহাজ উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গৌতম বুদ্ধের নদীপথে যাত্রার স্মৃতি।
তিনি বলেন, আড়াই হাজার বছর আগে মগধ থেকে বৈশালী যাওয়ার সময় গৌতম বুদ্ধ গঙ্গা নদীপথে জাহাজে করে যাত্রা করেছিলেন। সে সময় বৈশালীতে দুর্ভিক্ষ ও নানা উপদ্রব দেখা দিলে সেখানকার রাজার আমন্ত্রণে বুদ্ধ সেখানে যান। তার সেই যাত্রার স্মৃতি উদ্যাপনের ধারার সঙ্গে কল্পজাহাজ উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যযুক্ত।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, তার জানা মতে, অন্তত ৩০০ বছর আগে মিয়ানমারে এ উৎসবের প্রচলন শুরু হয়। পরে প্রায় এক শতাব্দী আগে রামুতেও এর আয়োজন শুরু হয়। প্রথম দিকে স্থানীয় রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষ উৎসবটি উদ্যাপন করতেন। পরে বড়ুয়া ও রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণে তা আরও বিস্তৃত হয়।
সময়ের সঙ্গে উৎসবের পরিসর বেড়েছে। এখন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এটি স্থানীয় মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু বলেন, “এখানে নির্দিষ্ট কোনো জাতিগোষ্ঠী বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মানুষ শুধু অংশগ্রহণ করেন বা উপভোগ করেন, তা নয়। এখানে সকল ধর্ম-বর্ণের মানুষ উপস্থিত হন। এটি একটা মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।”
তিনি বলেন, এমন আয়োজন প্রতিবেশীদের মধ্যে বন্ধুত্ব, ভ্রাতৃত্ব ও ধর্মীয় সম্প্রীতির সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে। ভবিষ্যতেও সবাই মিলে শান্তিপূর্ণভাবে এ উৎসব উদ্যাপনের প্রত্যাশা তার।
অশুভের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ানোর বার্তা
উৎসবের ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বার্তাও তুলে ধরেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম।
তিনি বলেন, প্রবারণা বৌদ্ধ ধর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। এর মর্মবাণী অশুভ, খারাপ ও অকল্যাণকর বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করা। এই শিক্ষা সব ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া প্রয়োজন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আমরা সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াব, এই বোধ মানুষের মধ্যে তৈরি হওয়া দরকার।”
বাঁকখালীর তীরে উৎসবে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি শুধু বৌদ্ধদের অনুষ্ঠান নয়। এখানে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ একত্র হয়েছেন।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়, পাহাড়ের মানুষ ও সমতলের মানুষের মধ্যে বিভাজন নয় বরং সবাইকে বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে একই ছাতার নিচে দেখতে চান তারা। রাষ্ট্রে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থানই বৈচিত্র্যকে অর্থবহ করে তোলে।
জাতীয় স্বীকৃতির পাশাপাশি প্রবারণায় সরকারি ছুটি দাবি
জাহাজ ভাসা উৎসবের প্রধান সমন্বয়ক অর্পণ বড়ুয়া বলেন, উৎসবটির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বিবেচনায় তারা এর স্বীকৃতি চান। পাশাপাশি প্রবারণা পূর্ণিমায় সরকারি ছুটিরও দাবি জানান তারা।
তার মতে, জাহাজ ভাসা উৎসবের মধ্য দিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্প্রীতির সুযোগ তৈরি হয়। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।
উৎসবটি এখন সব সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে জানিয়ে রামুর সংগীতশিল্পী মানসী বড়ুয়াও মনে করেন, ধর্মীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে এমন আয়োজন বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি রামুর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের একটি দাবিও উঠে আসে অনুষ্ঠানে। ২০১২ সালে রামুতে বৌদ্ধবিহার ও বসতিতে হামলার ঘটনার বিচার চান তারা।
