নেত্রকোণায় বোরো চাষের ধুম

এবার জেলায় হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে গত বছরের চেয়ে ৫৩০ হেক্টর বেশি জমিতে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

লাভলু পাল চৌধুরীনেত্রকোণা প্রতিনিধি . বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 12 Feb 2024, 05:28 AM
Updated : 12 Feb 2024, 05:28 AM

নেত্রকোণায় বোরো চাষের ধুম পড়েছে। ভোর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কৃষক-দিনমজুরের যেন দম ফেলার ফুরসত নেই। রাতেও অনেকে সেচের মেশিন পাহারা দেওয়ার জন্য মাঠের পাশেই কুঁড়েঘরে অবস্থান করছেন।

জেলার ১০ উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে কোথাও চারা রোপণ করা হচ্ছে, কোথাও আবার কৃষক ক্ষেতে সার-কীটনাশক দিচ্ছেন, কোথাও আবার মাঠের মধ্যে চলছে সেচের শ্যালো মেশিন। বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া সেই স্বচ্ছ জলে শীতের দুপুরে দাপাদাপি করছে শিশুরা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ২৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখান থেকে ১২ লাখ ৩ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন বেশি ধান উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

কৃষকরা জানান, শুরুর দিকে শীতের কিছুটা বৈরিতা থাকলেও তা কাটিয়ে তারা পুরোদমে বোরো রোপণ প্রায় শেষ করে এনেছেন। সরকারিভাবেও কিছু কৃষক সার, বীজের মত সহায়তা পেয়েছেন। ফলে আবহাওয়া যদি ভালো থাকে তাহলে ভালো ফলন আশা করছেন তারা।

নেত্রকোণা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নুরুজ্জামান জানান, এই জেলায় ধান উদ্বৃত্ত হয়। জেলার হাওর, সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে বোরো চাষ হয়।

এবার হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় জাত মিলিয়ে গত বছরের চেয়ে ৫৩০ হেক্টর বেশি জমিতে ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে উফশি ১ লাখ ৩৯ হাজার ৫৯০ হেক্টর, হাইব্রিড ৪৫ হাজার ৫৯৮ হেক্টর ও স্থানীয় জাতের ধান ১৭২ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে হাওরাঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার ৪০ হাজার ৯৭০ হাজার হেক্টরের পুরো জমিতেই রোপণ শেষ হয়েছে বলে জানান কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামান।

এসএল-৮ এইচ, জাগরণ, সোনারবাংলা, ব্রি-৮৮, ৮৯, ৯২, ৯৬, বীনা-২৫সহ ৪০ জাতের ধান আবাদ করা হচ্ছে। তাছাড়া এবার ১২ হাজার হেক্টর জমিতে জিংক সমৃদ্ধ ব্রি-৮৪, ৭৪, বীনা-২০ জাতের ধানও আবাদ করা হচ্ছে।

কেন্দুয়া উপজেলার দুল্লী গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, “আমার তিন একর জমিতে বোরো আবাদ করতাছি। শীতের ঠান্ডার লাইগ্যা কিছুটা দেরি হইছে জমি লাগাইতে। আড়াই একর লাগাইয়া ফালাইছি। বাকিটাও এক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ অইয়া যাইবো।”

সদর উপজেলার লক্ষ্মীগঞ্জ গ্রামের কৃষক আমিনুল হক এবার তার দুই একর জমির মধ্যে বেশিরভাগই উফশী জাতের ধান লাগিয়েছেন। এর মধ্যে ৫০ শতক জমিতে জিংক ধান রোপণ করেছেন।

তিনি বলছিলেন, “কৃষি বিভাগ থেইক্যা সার, বীজ পাইছি। আবহাওয়া ভালাই এখনও লাগাত। কিছুটা শীতের ঠান্ডার লাইগ্যা অসুবিধা অইছে। তবে আটকাই নাই।”

কলমাকান্দা উপজেলার নাজিরপুর গ্রামের কৃষক জালাল উদ্দিন বলেন, “গত বছরের চেয়ে এবার কিছুটা বেশি জমিতে আবাদ করছি। গত বছর করছিলাম ২২ কাঠা জমিতে; এইবার করছি ২৫ কাঠা জমিতে।

“ওখন নাগাদ সার, বীজ, চারার সংকট অয় নাই। আবহাওয়া এখনও অনুকূল। জমি লাগায়া প্রায় শেষ কইর‌্যা আইন্যা ফালাইছি।”

মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরী উপজেলা নিয়ে হাওরাঞ্চল। হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার আগ মুহূর্তে অনেক সময় উজান থেকে ঢল এসে হানা দেয়। কৃষক ফসল ঘরে তুলতে শঙ্কার মধ্যে পড়েন। তাই সেখানে আগাম জাতের ধান লাগানোর আগ্রহ বেশি কৃষকদের।

মদন উপজেলা মাঘান গ্রামের কৃষক জামাল মিয়া বলেন, “বৈশাখ মাসে ধান কাটার সময় ঝড়-তুফান থাকায় দ্রুত ধান লাগাইছি। সব জমি লাগাইয়া ফালাইছি। যাতে দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারি।”

খালিয়াজুরী উপজেলার গাজীপুর গ্রামের কৃষক সাহাব উদ্দিন বলেন, “আমরার প্রায় বছরই আগাম বন্যায় ফসল লইয়া যায়গা। তহন আমরার চাইয়া দেহন ছাড়া উপায় থাহে না। এই লাইগ্যা আগাম জাতের ধান লাগাইছি। এইবার ৬ একর জমিতে ধান লাগাইছি। আশা করতাছি, ঠিকঠাক ফসল তুলতে পারলে ভালাই ধান অইবো।”

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, সরকারের তরফে কৃষকদের সার, বীজ ও প্রযুক্তিগত নানা সহায়তা দেওয়া হয়েছে। জেলায় ৯০ হাজার কৃষকের মাঝে হাইব্রিড ও উফশী জাতের ৩৩০ মেট্রিক টন বীজ ধান ও ৫০০ টন ডিএপি এবং পটাশ সার বিতরণ করা হয়েছে।