ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের ১৯ প্রতিষ্ঠানে পাসের হার শূন্য, কারণ দর্শানোর নোটিস
এ বছর ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৭৩ হাজার ৪২০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৬ হাজার ৩৫৪ জন।
ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের অধীনে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ১০২ জন শিক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
শতভাগ অকৃতকার্য হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার দুটি কলেজও রয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে এবার সাতজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেননি। এর মধ্যে একটি কলেজে পরীক্ষার্থী ছিলেন মাত্র একজন।
ফলাফলের এমন চিত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম ও পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড।
‘জবাব সন্তোষজনক না হলে’ শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ এমপিও বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে বোর্ড কর্তৃপক্ষ।
বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ বছর ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৭৩ হাজার ৪২০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৩৬ হাজার ৩৫৪ জন। পাসের হার ৫১ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২ হাজার ১৩৭ জন। বোর্ডের অধীন ৩১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯টিতে পাসের হার শূন্য।
জেলাভিত্তিক হিসাবে শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহে। এ জেলার সাতটি প্রতিষ্ঠানের ৪৩ জন পরীক্ষার্থীর কেউ পাস করতে পারেননি।
আর নেত্রকোনার ছয়টি প্রতিষ্ঠানের ৩৩ জন, জামালপুরের চারটি প্রতিষ্ঠানের ১৮ জন এবং শেরপুরের দুটি প্রতিষ্ঠানের আটজন পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছেন।
শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষার্থী ছিলেন ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার ‘এইচ এ ডিজিটাল’ কলেজে। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
অন্যদিকে নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার ‘এমবিশন মডেল কলেজ’ থেকে ১৬ জন পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেননি।
ময়মনসিংহের সাত প্রতিষ্ঠান
ময়মনসিংহ জেলার শতভাগ অকৃতকার্য সাতটি প্রতিষ্ঠান হল-তারাকান্দার এইচ এ ডিজিটাল কলেজ (২৬ জন), ঈশ্বরগঞ্জের কোনাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ (৬ জন), হালুয়াঘাটের বাঘাইতলা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় (৫ জন), ত্রিশালের আউলিয়া নগর কলেজ (৫ জন), নান্দাইলের অ্যাডভোকেট আব্দুল হাই কলেজ (২ জন), ঈশ্বরগঞ্জের চরজিথর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ (১ জন) এবং নান্দাইলের বেরীলা কে এ হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ (১ জন)।
এর মধ্যে তারাকান্দার এইচ এ ডিজিটাল কলেজের নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়ে কোনো শিক্ষা কার্যক্রমের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, একসময় ভাড়া করা জায়গায় কলেজটির কার্যক্রম চললেও বর্তমানে সেখানে পাঠদান হয় না। নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম বন্ধ থাকা এবং শিক্ষক ও প্রশাসনিক তদারকির অভাবে প্রতিষ্ঠানটি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ জ ম. রেজাউল করিম খান বলেন, “শতভাগ ফেল করা ১৯টি কলেজের মধ্যে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার এইচ এ ডিজিটাল কলেজটি রয়েছে। তারা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠদানের অনুমতি নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। এখন তাদের কলেজের অবস্থান আছে কি-না বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ঈশ্বরগঞ্জের চরজিথর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. সেলিম জানান, কাগজে-কলমে কলেজটিতে ১০ জন শিক্ষক ছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে সাতজন শিক্ষক কর্মরত থাকলেও কেউ কলেজে আসেন না।
কলেজ শাখাটি এমপিওভুক্ত না হওয়ায় শিক্ষকরা বেতন পান না। এ কারণে তারা শিক্ষা কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন না। প্রায় ১০ বছর বিনা পারিশ্রমিকে পাঠদান করেছেন তারা। বর্তমানে কলেজ শাখাটি কার্যত শিক্ষকশূন্য। এবার প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র পরীক্ষার্থীও অকৃতকার্য হয়েছেন।
অধ্যক্ষ আরও বলেন, বারবার নোটিশ দিয়েও শিক্ষকদের কলেজে আনতে পারেননি তিনি।
কলেজের গভর্নিং বডির সঙ্গে আলোচনা করে কলেজ শাখার নিবন্ধন বাতিলের আবেদন করবেন।
কোনাপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার ছয়জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন।
প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. আব্দুল লতিফ বলেন, “এ বছর প্রথমবারের মতো কলেজটি নিবন্ধন পেয়েছে। কলেজ শাখায় তিনজন শিক্ষক রয়েছেন। পাশাপাশি স্কুল শাখার দুজন শিক্ষক অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কলেজে ক্লাস নিয়েছেন। প্রথমবার পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ছয়জনের কেউ পাস করতে পারেননি।”
তিনি বলেন, শুরুতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছে। আগামীতে আরও ভালোভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে ভালো ফলের আশা করছেন তারা।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, তিনি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে উপজেলায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। কলেজ দুটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই। দুটি প্রতিষ্ঠানের সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন।
নেত্রকোনা ও জামালপুরের ছয় প্রতিষ্ঠান
নেত্রকোনার শতভাগ অকৃতকার্য ছয়টি প্রতিষ্ঠান হলো—পূর্বধলার এমবিশন মডেল কলেজ (১৬ জন), জুবাইদা জহুর উদ্দিন সরকার মহিলা কলেজ (৬ জন), খালিশাপুর উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় (৪ জন), নেত্রকোনা সদরের ভাষা সৈনিক আবুল হোসেন কলেজ (৪ জন), কলমাকান্দা মহিলা কলেজ (২ জন) এবং কেন্দুয়ার গোপালপুর মডেল কলেজ (১ জন)।
জামালপুরের চারটি প্রতিষ্ঠান হলো- ইসলামপুরের গোয়ালচর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ (৭ জন), জামালপুর সদরের শ্রীপুর কুমারিয়া নাসুবা আকন্দ গার্লস স্কুল (৬ জন), মাদারগঞ্জের নলবেছা উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ (৪ জন) এবং মেলান্দহের এস. এম. শিক্ষা মুখলেছুর রহমান কলেজ (১ জন)।
শেরপুরের দুটি প্রতিষ্ঠান হল- সদরের মনমথ দে কলেজ (৭ জন) এবং ঝিনাইগাতীর আলহাজ্ব এস এম এ ওয়ারেজ নঈম মডেল কলেজ (১ জন)।
জবাব সন্তোষজনক না হলে এমপিও বাতিল
ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম খান বলেন, বোর্ডের অধীনে এবার ৩১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১৯টি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেননি।
এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হলে প্রয়োজনে শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ এমপিও বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
