পালিয়ে আসাদের ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত মিয়ানমার: বিজিবি প্রধান

বিজিবি ‘সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করে’ আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদককক্সবাজার প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Feb 2024, 08:10 AM
Updated : 7 Feb 2024, 08:10 AM

সংঘাতের মধ্যে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে নিতে দেশটি ‘প্রস্তুত’ বলে জানিয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। 

বিজিবি ‘সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করে’ আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। 

মিয়ানমারে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের লড়াইয়ের মধ্যে বুধবার বান্দরবানের তুমব্রু বিজিবি ক্যাম্প পরিদর্শন করেন এ বাহিনীর প্রধান আশরাফুজ্জামান। 

পরে তিনি ঘুমধুম উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে সংবাদ ব্রিফিংয়ে হাজির হন। মিয়ানমার থেকে আসা সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিজিপি) সদস্যসহ ২৬৪ জনকে ওই স্কুলেই বিজিবির হেফাজতে রাখা হয়েছে।

মহাপরিচালক বলেন, “এ পর্যন্ত আমরা ২৬৪ জনকে আশ্রয় দিয়েছি। এর মধ্যে ৮ জন আহতকে চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ২৬৪ জনের মধ্যে চারজন নারী ও শিশু রয়েছেন, যারা দুজন বিজিপি সদস্যের পরিবার।” 

মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেবে জানিয়ে বিজিবি প্রধান বলেন, “গত দুই দিনের তুলনায় বুধবার ফায়ারিং এর পরিমাণ একটু কম। আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ হচ্ছে। তারা এই ২৬৪ জনকে ফিরিয়ে নিতে প্রস্তুত। আমরা সেই বিষয়ে পরামর্শ করেছি এবং যত দ্রুত সম্ভব নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেছি।” 

টানা কয়েক দিনের যুদ্ধের এক পর্যায়ে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মি বিজিপির কয়েকটি ক্যাম্প দখল করে নিলে গত রোববার শুরু হয় অনুপ্রবেশ। প্রথম ১৪ জন বান্দরবানের তুমব্রু সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে। পরে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। 

সোমবার কক্সবাজারের পালংখালীর রহমতের বিল এলাকা দিয়ে আসেন আরো শতাধিক বিজিপি সদস্য। সব মিলিয়ে বিজিবির হেফাজতে থাকা অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা ২৬৪ জনে পৌঁছায়।  

এদিকে সীমান্তের ওপারে তীব্র গোলাগুলির মধ্যে এপারে প্রাণহানিতে ঘুমধুম ও পালংখালী সীমান্ত এলাকায় চলছে আতঙ্ক। সীমান্ত লাগোয়া গ্রামের বাসিন্দারা জীবন বাঁচাতে বাড়িঘর ছেড়ে আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি এবং সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠছেন। 

কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত সংলগ্ন ওইসব এলাকায় এক লাখের বেশি বাসিন্দা এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তাদের নিরাপদ দূরত্বে স্কুল ও কমিউনিটি সেন্টারে সরিয়ে নিতে কাজ করছে প্রশাসন। 

ওপারে মিয়ানমারের সীমান্ত রেখার নিয়ন্ত্রণ আসলে কাদের হাতে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো সুযোগ আছে কিনা, সেই প্রশ্ন রাখা হয়েছিল বিজিবির ব্রিফিংয়ে। 

জবাবে মহাপরিচালক বলেন, “আমাদের কাছে প্রাথমিক কিছু তথ্য এসেছে, তার ভিত্তিতে আমরা কিছু বলতে চাই না। তুমব্রু বিওপি থেকে আমি যেটা দেখে এলাম, সেখানে রাইট বিজিপির পোস্ট আছে সেখানে কিছু লোকজনকে চলাফেরা করতে দেখা যাচ্ছে। তবে তারা মিয়ানমার আর্মি, বিজিপি সদস্য, নাকি বিদ্রোহী– তা বোঝা যাচ্ছে না।

“তবে তারা যেই হোক না কেন, আমরা আমাদের সীমানার ভেতর যেন কোন ফায়ার না আসে সেটা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। একই সাথে কোনো রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বা শরণার্থী যেন অকারণে প্রবেশ না করে, সেটাও আমরা নিশ্চিত করব।”  

স্থানীয়রা বলছেন, ক্যাম্পগুলোতে এরমধ্যেই বেশ কিছু সশস্ত্র রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, আমরা কিছু উচ্ছৃঙ্খল সন্ত্রাসীকে পেয়েছি, তাদেরকে আমরা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করছি। তাদের দুজন বা তিনজনের কাছে অস্ত্র ছিল। বাকিরা নিরস্ত্র। তবে যেটা হয়, হয়তো দুজনকে দেখা গেল, কিন্তু প্রচার হল যে অনেকে অস্ত্রসহ ঢুকেছে। এরকম প্রচার থেকে সকলকে বিরত থাকার আহ্বান জানাই। 

“আপনারা দেখেছেন, মঙ্গলবারও আমরা দুই দফায় ৭৫ জনকে ফেরত পাঠিয়েছি, যারা নৌকায় করে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন। এরপর কোস্টগার্ডকে বলে সেখানে কোস্টগার্ডের টহল বাড়ানো হয়েছে।”  

সীমান্তের এ পরিস্থিতিতে কক্সবাজার বা টেকনাফ থেকে জাহাজে সেন্টমার্টিনে পর্যটন এখন নিরাপদ বলে মনে করছেন না বিজিবি মহাপরিচালক।

তিনি বলেন, “এ কটা দিন সেন্টমার্টিনে নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া কোনো ধরনের নৌযান চলাচল না করা নিরাপদ হবে বলে আমরা মনে করছি। তবে আমরা জনগণকে আতঙ্কিত করতে চাই না।” 

মিয়ানমার থেকে সোমবার বান্দরবানের ঘুমধুমে মর্টার শেল এসে পড়লে এক নারীসহ দুজনের প্রাণ যায়। মঙ্গলবারও ঘুমধুম ও পালংখালী সীমান্ত এলাকায় মার্টার শেল ও গোলার আঘাতে অন্তত পাঁচজনের আহত হওয়ার খবর জানান স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। অনেকের বাড়িঘরে গুলিও এসে পড়েছিল। 

এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী জানতে চাইলে বিজিবি প্রধান বলেন, “সংঘাতটা পুরোপুরি মিয়ানমারের অভ্যন্তরের। তারা যখন বর্ডার লাইনের কিছুটা ভেতরে ফায়ার করে তখন মর্টার শেল বা অন্য গোলাবারুদের কিছু অংশ বিচ্যুত হয়ে অন্যদিকে চলে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনাটুকু যেন জিরোতে চলে যায়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।

“মিয়ানমারের ডিফেন্স অ্যাটাশেকে ডেকে আমি সেই ব্যাপারে বলেছি। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও একই বিষয়ে রাষ্ট্রদূতকে কড়া ভাষায় বলেছেন। এই অবস্থায় এর চাইতে বেশি এই মুহূর্তে তো করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে যদি দেখি, এটা বেড়েই চলেছে, তখন আরো সজোরে প্রতিবাদ করে যেন ওটা বন্ধ করা যায়, সেটা আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করব। তবে গত দুই দিন ধরে গোলাবারুদ কমেছে, বুধবার একেবারেই কম।”

ব্রিফিংয়ে আসার আগে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম সীমান্ত এলাকা এবং আশপাশের বিজিবি ফাঁড়ি পরিদর্শন করে বিজিবি মহাপরিচালক সীমান্তে বিজিবি সদস্যদের খোঁজ খবর নেন এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাইকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সীমান্তে উদ্ভূত যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর থাকার নির্দেশ দেন।

পুরনো খবর

ওপারের যুদ্ধে বিরান হচ্ছে এপারের বসতিও