Published : 27 Oct 2024, 12:22 AM
প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ শুরু করেন রাজবাড়ীর চাষিরা।
রোপণের ৯০ দিনের মধ্যে তোলা যায় বলে একটু বেশি লাভের আশায় চাষিরা এ জাতের পেঁয়াজের আগাম চাষ করেন।
কিন্তু এবার সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে কয়েক দফায় অতিবৃষ্টির কারণে রাজবাড়ীতে এ জাতের পেঁয়াজের আবাদ শুরু হয়েছে বেশ দেরিতে। এতে ফলন ও বাজারে দাম কম পাওয়ার শঙ্কায় আছেন চাষিরা।
যদিও ফলন কম হওয়ার বিষয়টি মানতে নারাজ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা।

রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চাষিরা এখনো পুরোদমে মুড়িকাটা পেঁয়াজ রোপন শুরু করতে পারেননি।
এর প্রধান কারণ হল, দফায় দফায় বৃষ্টি। এখনো পেঁয়াজ রোপনের অধিকাংশ জমি বৃষ্টির পানিতে নরম হয়ে আছে। অনেক জমিতে পানিও জমে আছে। যে কারণে পেঁয়াজ রোপন করতে পারছেন না চাষিরা।
গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের চাষি আবেদ আলী বলেন, “খুবই ঝামেলায় আছি পেঁয়াজ রোপন নিয়ে। এক মাস ধরে শুধু বৃষ্টিই হচ্ছে। কয়েকদিন আগে পেঁয়াজ রোপনের জন্য জমি চাষ করেছি। কিন্তু বৃষ্টির কারণে রোপন করতে পারি নাই। সময় মত রোপন করতে পারলে এক মাস পর পেঁয়াজ উঠাতে পারতাম। অথচ এবছর এখনো রোপন করতে পারি নাই।”

আরেক চাষি সাত্তার মোল্লা বলেন, “আমার মত অনেক চাষি পেঁয়াজ না লাগিয়ে বসে আছেন। বৃষ্টিতে জমি নরম হয়ে আছে। এর মাঝে তো রোপন করা যায় না। অনেকেই আবার ভাবছে, এ বছর পেঁয়াজই রোপন করবে না।”
ওই এলাকার চাষি আবুল কাশেম বলেন, “বৃষ্টিপাতের কারণে আগাম মুড়িকাটা পেয়াজ আবাদ শুরু করতে একমাস পিছিয়ে গেছে। এ বছর বীজ পেঁয়াজ, সার সব কিছুর দাম বেড়েছে। দেরিতে পেঁয়াজ রোপন করায় কাঙ্ক্ষিত ফলন পাব কিনা সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।”
পেঁয়াজ চাষে খরচ বেড়েছে
এ বছর রাজবাড়ীতে আগাম জাতের মুড়িকাটা পেঁয়াজের চাষ পিছিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার দাবিও করছেন চাষিরা।
সদর উপজেলার উড়াকান্দা এলাকার চাষি রিয়াজ বলেন, “গত বছরের থেকে এ বছর মুড়িকাটা পেঁয়াজ চাষে খরচ বেড়েছে। গতবছর বীজ পেঁয়াজ প্রতি মণ কিনেছি সাড়ে ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা করে। কিন্তু এ বছর কিনতে হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা মণ।
তার দাবি, প্রতি বিঘায় ১০ মণ করে বীজ পেঁয়াজের দরকার পড়ে। আর ৮ হাজার টাকা মণ ধরলেও এক বিঘার জন্য পেঁয়াজের বীজের দামই পড়ে ৮০ হাজার টাকা। সার, চাষ, শ্রমিক খরচ পড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।

আর যারা জমি লিজ নিয়ে চাষ করবেন, তাদের খরচ আরও বেশি হবে। কারণ এক বিঘা জমি লিজে বছরে দিতে হয় ৪০ হাজার টাকা।
দামের বিষয়ে রিয়াজ বলেন, “আড়াই হাজার টাকা মণ করে পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারলে আমাদের টাকা উঠবে। তার বেশি বিক্রি করতে পারলে লাভ হবে। আর যদি কমে বিক্রি হয় তাহলে লোকসান হবে। এটা আসলে নির্ভর করবে বাজারের ওপর।”
মাহাতাব বিশ্বাস নামে আরেক চাষি বলেন, “এক বিঘেয় বীজ পিজ লাগতেছে ১০ মণ করে। ইবার প্রতি মণ পিজ বীজ কিনতি হচ্ছে ১০ হাজার টাকা করে। ১০ মণ পিজির দাম লাগতেছে ১ লাখ টাকা। আরও সার ওষুধ, চাষ, পড়ে ত খরচ তো আছেই। যাদের জমি লিজ নিয়া আছে তারে তো আরও বেশি খরচ। সুময় মতো পিজ লাগাতি পারলি ফলন ভালো পাতাম সাথে দামটাও।
“বৃষ্টির জন্নি এবার মেলা দেরি হয়ে গেল তারপরও আশা করতেছি, ভালো ফলন পাব। ফলন ভালো হলি বিঘায় ৬০-৭০ মণ পিজি পাবো।“
চাষি মাহাতাব আরও বলেন, “প্রায় কৃষকই এখনো পিজ লাগাতে পারে নাই, বৃষ্টির জন্নি। দেখতেছেন না, পিজ লাগানের জন্নি জমি চাষ দিয়ে রাখছে। কিন্তু বৃষ্টির জন্নি লাগাতি পরতেছে নে। জমি নরম হয়ে আছে।”

আর বৃষ্টি না হলে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে এ জাতের পেঁয়াজ রোপন পুরোদমে শুরু হওয়ার কথা জানালেন এ চাষি।
রাজবাড়ী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা গোলাম রাসূল বলেন, “পেঁয়াজ উৎপাদনে দেশের তৃতীয় অবস্থানে রাজবাড়ী জেলা। সারা দেশের ১৪ শতাংশ পেঁয়াজ এই জেলায় হয়ে থাকে। এ বছর জেলায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ হওয়ার কথা রয়েছে। যা থেকে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন।
রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলাতে মুড়িকাটা পেঁয়াজের আবাদ বেশি হয় জানিয়ে তিনি বলেন, “অতিবৃষ্টির কারণে এবছর পেঁয়াজ রোপন দেরি হচ্ছে। দেরিতে রোপন হলেও উৎপাদনে কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে পেঁয়াজের বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে।
“চাষিরা সময় মত রোপন করতে পারলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নতুন পেঁয়াজ মাঠ থেকে তোলা যেত। কিন্তু একমাস দেরিতে রোপনের কারণে উত্তোলন করতেও দেরি হবে। এতে বাজারে দামটা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”