Published : 15 Jun 2026, 10:42 PM
খুলনার কয়রা উপজেলায় কোরবানির ঈদে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের টাকা বণ্টন ও তালিকা প্রণয়ন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।
ওই তালিকায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা-৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) আবু ওবাইদাসহ কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তি ও দলীয় নেতাকর্মীর নাম রয়েছে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, “নিয়ম অনুযায়ী ত্রাণ তহবিলের টাকা হতদরিদ্র ও দুস্থদের মধ্যে বিতরণের কথা। তবে কোনো উৎসব উপলক্ষে বিশেষ বরাদ্দের তালিকা সংসদ সদস্য নিজেদের লোক দিয়েই করিয়ে থাকেন।”
তালিকায় এপিএস আবু ওবাইদার নাম তিন নম্বরে রয়েছে।
কয়রার বাসিন্দা ও স্থানীয় সংবাদকর্মী ইউনুস আলী বলেন, উপজেলা সদরের বাসিন্দা আবু ওবাইদার পরিবার এলাকায় সম্পদশালী হিসেবে পরিচিত। তার স্ত্রী একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা।
তালিকার থাকা অন্যরাও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং জামায়াতে ইসলামীর কর্মী বলে তিনি দাবি করেন।
কয়রা উপজেলার তালিকার এক নম্বরে রয়েছেন আহসান হাবিব, যিনি সংসদ সদস্যের ভাগনে। ছয় নম্বরে থাকা আসমাতুল্লাহ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি এবং দশ নম্বরে থাকা মাজহারুল ইসলাম কয়রা সদর ইউনিয়ন ছাত্রশিবিরের সভাপতি।
মাজহারুল ইসলাম চিংড়ি চাষের সঙ্গে যুক্ত এবং তার পরিবার সচ্ছল বলে স্থানীয়রা জানান। তালিকার ১৫২ নম্বরে তার বাবা নুরুল ইসলাম সরদারের নাম রয়েছে।
অপরদিকে সংসদ সদস্যের আত্মীয়স্বজন ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীকে বরাদ্দ থেকে চার হাজার করে এবং অন্যদের দুই হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
তালিকাভুক্ত নাসিমা খাতুন, রেহেনা পারভীন, ফাতেমা খাতুন, তাসলিমা বেগমসহ কয়েকজন বলেন, কোরবানির ঈদে তাদের উপজেলা পরিষদে ডেকে দুই হাজার করে টাকা দিয়ে বলা হয়, এটি এমপির পক্ষ থেকে ঈদের খরচ।
তবে অন্যদের চার হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য জানার পর তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের অনুকূলে কোরবানির ঈদ উপলক্ষে ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এর মধ্যে কয়রা উপজেলায় ২০১ জনের তালিকা করে চার লাখ ১৫ হাজার টাকা বিতরণ দেখানো হয়েছে। বাকি টাকা পাইকগাছা উপজেলায় বিতরণের কথা রয়েছে।
সংসদ সদস্যের এপিএস আবু ওবাইদাকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এই তালিকা আপনাদের কাছে থাকার কথা নয়। এটি গোপন থাকার কথা ছিল।”
টাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি মন্তব্য এড়িয়ে যান।
সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা আবুল কালাম আজাদকে মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।
কয়রা উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মিজানুর রহমান বলেন, তালিকায় বেশির ভাগই গরিব ও অসহায় মানুষের নাম আছে। এর মধ্যে কিছু দলীয় লোকজন থাকতে পারে, তবে তারাও দরিদ্র বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, এপিএসের নাম তালিকায় কীভাবে এসেছে তা তার জানা নেই।
কয়রা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বাবুলের অভিযোগ, “এমপি সাহেব গরিব মানুষের হক নষ্ট করে দলীয় নেতাকর্মী ও আত্মীয়-স্বজনকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলের টাকা দিয়েছেন।”
তিনি বলেন, তালিকায় থাকা বেশির ভাগই সচ্ছল। এটি জেনে-বুঝেই করা হয়েছে, যা ঠিক হয়নি।
স্থানীয় আরেক বিএনপি নেতা বলেন, “এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর তার কিছু আত্মীয় ও দলীয় লোকজন এলাকায় সব সরকারি উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও উপজেলার অফিসগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে সুবিধা নিচ্ছেন।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, ত্রাণ তহবিলের টাকা যাদের পাওয়ার কথা, তাদের বঞ্চিত করে যদি সচ্ছল আত্মীয় ও দলীয় নেতাকর্মীদের দেওয়া হয়- সেটা অন্যায়।
তিনি বলেন, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই রাজনৈতিক নেতাদের স্বজনপ্রীতি ও দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে।