Published : 06 Jul 2026, 12:26 PM
বগুড়ার ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।
বিশেষ করে ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের [তীর রক্ষার জন্য কংক্রিট পাথরের বাঁধ] মধ্যবর্তী এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, গত ১২ দিনের অব্যাহত ভাঙনে রোববার পর্যন্ত শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান স্পারের মধ্যবর্তী প্রায় ২০০ মিটার এলাকা যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙন প্রতিরোধে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে দিনরাত বালিভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলার কাজ চলছে।
যমুনা নদীর পশ্চিম পাড়ে (বগুড়ার ধুনট অংশে) যেসব মানুষ বসবাস করেন, তারা ভাঙনের কারণে চরম উদ্বেগের মধ্যে আছেন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীর তীর ঘেঁষে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণেই এ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে।
পাউবো বগুড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, “শহড়াবাড়ি স্পারের উজান অংশে ভাঙন দেখা দেওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়েছিল।
“পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে জিও টিউব ও জিও টেক্সটাইল ব্যাগ ফেলা হয়েছে। এতে আপাতত এলাকা অনেকটাই ঝুঁকিমুক্ত রয়েছে।”
রোববার বিকালে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তিনি দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পাউবোর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে স্থায়ীভাবে ভাঙনরোধে একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রথম দফায় এ এলাকায় ভাঙন শুরু হয়। সে সময় শহড়াবাড়ি ঘাটের নয়টি দোকানসহ বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি যমুনায় বিলীন হয়ে যায়। পরে পাউবো জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে ভাঙন নিয়ন্ত্রণে আনলেও প্রায় ১২ দিন আগে আবারও নতুন করে ভাঙন শুরু হয়।
পাউবো বলছে, ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে একাধিকবার যমুনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে তীরবর্তী গ্রামের বসতভিটা, আবাদি জমি, রাস্তাঘাটসহ অনেক অবকাঠামো নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
যমুনার প্রবল ভাঙনে ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের বৈশাখী চর, রাঁধানগর, বথুয়ারভিটা, নিউ সারিয়াকান্দি, আটারচর, পুকুরিয়া, ভুতবাড়ি, কৈয়াগাড়িসহ ৮ থেকে ১০টি জনপদ মানচিত্র থেকে অনেক আগেই নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে।
যমুনার ভাঙনে লোকালয়, বসতভিটা, ঘরবাড়ি ছাড়াও আবাদি জমি হারিয়ে এখন নিঃস্ব হাজারো মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। যমুনায় মাছ ধরে এবং শুস্ক মৌসুমে জেগে ওঠা চরে ফসল উৎপাদন করে ভাঙন কবলিত মানুষের সংসার চলে।
পাউবো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধকে নদীভাঙনের ঝুঁকি থেকে রক্ষায় ২০০৩ সালে তারা প্রায় ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে শহড়বাড়ি ও বানিয়াজান এলাকায় যমুনা নদীতে দুটি স্পার নির্মাণ করে। এসব তীররক্ষা কাঠামো নির্মাণের পর নদীর মূল স্রোত তীর থেকে দূরে সরে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ওই এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিরাপদ ছিল।
তবে ২০২১ সালে প্রবল ভাঙনে বানিয়াজান ও শহড়বাড়ি এলাকার এসব স্থাপনার সামনের প্রায় ৫০ মিটার অংশ যমুনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। একই সময়ে নদীভাঙনে জনপদের বেশ কিছু অংশও নদীতে হারিয়ে যায়। এরপর থেকে দুটি তীররক্ষা কাঠামো এবং সেগুলোর মধ্যবর্তী প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আর কোনো উল্লেখযোগ্য ভাঙন দেখা যায়নি।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই বছর ধরে দুই স্পারের মধ্যবর্তী এলাকায় বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর ইজারাদাররা নির্ধারিত স্থান থেকে বালু উত্তোলন না করে যমুনার ডান তীরঘেঁষা এলাকা থেকে বালু উত্তোলন করছেন।
তাদের দাবি, নদীতীরের কাছাকাছি এভাবে বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে এবং ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, যমুনার প্রবল স্রোতে তীররক্ষা কাঠামোর বেশ কয়েকটি অংশ ধসে গেছে। এতে শহড়াবাড়ী ও বানিয়াজান এলাকার নদীভাঙন পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ন কবির জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মিটার এলাকা ভেঙে গেছে। তবে শহড়াবাড়ী ও বানিয়াজান তীররক্ষা কাঠামোর মধ্যবর্তী প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিটার এলাকা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, “এই অংশে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিরক্ষামূলক কাজ করতে হবে। অন্যথায় দুটি তীররক্ষা কাঠামো এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ হুমকির মুখে পড়তে পারে।”
বানিয়াজান গ্রামের বাসিন্দা সাজেদুল হক বলেন, “যমুনা নদীর ভাঙনরোধে শহড়াবাড়ী ও বানিয়াজান এলাকায় দুটি স্পার নির্মাণের পাশাপাশি ২০০৭ সালে নদীর ডান তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ করা হয়।
“কিন্তু প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে যমুনার ভাঙনের কারণে বাঁধ ও তীররক্ষা কাঠামো হুমকির মুখে পড়ে।”
শিমুলবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আলতাফ হোসেন অভিযোগ করেন,“শুষ্ক মৌসুমে পাউবো কোনো কার্যকর আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয় না। বর্ষা শুরু হলেই বালুভর্তি জিওব্যাগ বা বস্তা ফেলানোর তৎপরতা দেখা যায়।
“এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না।”
শহড়াবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা সোহরাব আলী বলছিলেন, “গত কয়েক দিনের ভাঙনে শহড়াবাড়ি আশপাশের এলাকার অনেক কৃষকের আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
“জমি হারিয়ে অনেক পরিবার চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং কেউ কেউ প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছেন।”
বালু উত্তোলনের কারণে শহড়াবাড়ি ও বানিয়াজান এলাকায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে-স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় ধুনট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আরিফ উল্লাহ নিজামীর কাছে।
উত্তরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “নদী তীরবর্তী এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে যমুনায় বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। শহড়াবাড়ী ষ্পার এলাকায় ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে পাউবো কাজ করেছে।”