Published : 21 Jun 2024, 11:47 PM
নদ-নদীর পানি ক্রমেই বেড়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার মধ্যেই আরেক বিপদ ‘ভাঙনে’ দিশেহারা কৃষিপ্রধান জেলা কুড়িগ্রামের হাজারো মানুষ, দীর্ঘ হচ্ছে তাদের কষ্টের দিনরাত্রি।
তিস্তা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র, ধরলাসহ ১৬ নদীর পানি বাড়তে থাকায় কুড়িগ্রামের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে, ভোগান্তি বাড়ছে; দেখা দিয়েছে খাবার সংকটও। ব্রহ্মপুত্রের চরে গড়ে ওঠা কয়েকটি গ্রাম তলিয়ে সেখানকার বাসিন্দাদের দুর্বিষহ দিন যাচ্ছে।
সমতলে পানির নিচে চলে গেছে কাঁচা-পাকা বহু সড়ক। অনেকেই কলার গাছের ভেলা দিয়ে বাড়িতে যাতায়াত করছেন। বহু পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে কয়েকটি এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও।
সরেজমিন দেখা যায়, বন্যার পানি ঢুকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সবজি ও মাছ চাষিদের। ডুবে গেছে বাদাম, পাট, ভুট্টা, মরিচ ও সবজি ক্ষেত। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে চাষিদের আশঙ্কা।
শুক্রবার তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার ৫৫ সেন্টিমিটার এবং ধরলার ফুলবাড়ির শিমুলবাড়ি পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বয়ে গেছে। এতে করে নিমজ্জিত হয়েছে নতুন নতুন এলাকা।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী রাফসান জানি বলেন, শুক্রবার বেলা ৩টায় দুধকুমারের পাটেশ্বরী পয়েন্টে পানি সামান্য কমে এখন বিপৎসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে এবং তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে পানি ২৫ সেন্টিমিটার বেড়ে ৫৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে এবং ধরলার ফুলবাড়ি উপজেলার শিমুলবাড়ি পয়েন্টে ১০ সেন্টিমিটার কমে ১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
এভাবে পানি বাড়তে থাকলে অন্য সব নদ-নদীর পানিও বিপৎসীমা ছাড়িয়ে উপচে লোকালয় তলিয়ে দেবে বলে আশঙ্কা পাউবোর এ কর্মকর্তার।
এরই মধ্যে তিস্তা ও ধরলার দুই পাড়ে অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকা এবং চরে বসবাস করা কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে জানাচ্ছেন কুড়িগ্রামের স্থানীয় প্রশাসন।
সাত দিন ডুবে আছে চরের গ্রাম ‘বালা ডোবা’
উলিপুরের বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের একটি চরে গড়ে ওঠা বালা ডোবা গ্রামের শতাধিক পরিবার বন্যায় তলিয়ে যাওয়া ঘরবাড়িতেই থাকছেন। গবাদিপশু, হাস-মুরগি, সবজি কিছুই তারা রক্ষা করতে পারছেন না। অথচ এখন পর্যন্ত সরকারি ত্রাণের একটি দানাও পৌঁছায়নি চর বালা ডোবার মানুষের কাছে।
বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া বলছেন, বালা ডোবা গ্রামের চারপাশেই ব্রহ্মপুত্র। সেখানে নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই।
পানিভাসা চরটির বাসিন্দারা বলছেন, সাত দিন ধরে পানির মধ্যে বসবাস করছেন তারা। অনেকেই ঘরবাড়ি তালা দিয়ে লোকালয়ের বাঁধে বানানো আশ্রয়কেন্দ্র, স্কুল ও স্বজনদের বাড়িতে উঠেছেন। যাদের যাওয়ার জায়গা নেই, তারা জীবনটা নিয়ে কোনোভাবে বেঁচে আছে। ঘরে-বাইরে পানি, ঘরের ভেতরে খাটের একদিকে চুলা, অন্যদিকে বিছানাপত্র। বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার ফুরিয়ে যাচ্ছে।
কথা হয় বালা ডোবা গ্রামের জিন্নাত আলী-রঙমালা দম্পতির সঙ্গে। জিন্নাত বলেন, “হামরার ঘরে সাত দিন ধরে পানি। খাওয়ার কষ্ট, একবেলা রান্না করে দুবেলা খাওয়া ছাড়া উপায় নাই। কোথাও যাওয়ার উপায় নাই। গরু বাচুর নিয়ে খুব বিপদে আছি।”

সেখানকার আরেক বাসিন্দা নুরনাহার বেগম বলেন, “চরের সবাই খু্ব কষ্টে আছি। চেয়ারম্যান-মেম্বার এখন পর্যন্ত হামারগুলার কোন খোঁজ নেয় নাই। পানি তো বাড়তেছে, এমন পানি বাড়লে বাচ্চা-কাচ্ছা নিয়ে কই যামো।”
বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবলু মিয়া বলেন, “বালা ডোবা গ্রামের চারদিকে পানি। ওখানকার পরিবারগুলো খুব কষ্টে আছে। আমরা নদী ভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উপজেলা প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছি। আশা করছি, দ্রুত বালা ডোবা গ্রামের মানুষজন সহযোগিতা পাবে।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, বন্যাকবলিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ হাজার। একই সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে ১৪৪ টন চাল এবং নগদ ১০ লাখ ৩৫ হাজার টাকা ত্রাণ দেওয়া হয়েছে, যা বিতরণের প্রস্তুতি চলছে।
“নতুন করে ঢাকা থেকে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ১০ লাখ টাকা, ৯ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার ও ৫০০ টন চাল।”
পাউবোর অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পশ্চিমাঞ্চল) এ কে এম তাহমিদুল ইসলাম উলিপুরের বেগমগঞ্জসহ কয়েকটি ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
তিনি বলেন, “একদিকে বন্যা, আরেক দিকে নদীভাঙন কুড়িগ্রামের জন্য দুর্ভাগ্যের। এ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদীই ভাঙনপ্রবণ। এর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার বিধ্বংসী ভাঙনে মেতে ওঠে।”