Published : 05 Mar 2026, 02:22 PM
বসন্ত এলেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসজুড়ে থাকে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এ বছরের বসন্তে সেই সৌন্দর্যকে ম্লান করেছে মশার উৎপাত।
সন্ধ্যা নামলেই ক্যাম্পাসের আবাসিক হলগুলোতে শুরু হয় মশার দাপট; এতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবন যাপন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মওলানা ভাসানী হলের শিক্ষার্থীরা জানান, কয়েক সপ্তাহ ধরে হলে মশার উপদ্রব এতটাই বেড়েছে যে, সন্ধ্যার পর রুমে বসে আড্ডা দেওয়া বা গান বাজানোও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে মশারির ভেতরে সময় কাটাচ্ছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মশার উৎপাত নিয়ে প্রাণিবিদ্যা বিভাগের গবেষক কবিরুল বাশার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মশার মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ‘কিউলেক্স’ প্রজাতির মশা।”

“এই মশা শুধুমাত্র বিরক্তি তৈরি করেই সীমিত থাকে না বরং ‘ফাইলেরিয়াসিসের’ মতো রোগ ছড়িয়ে দেয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সমস্যা আরও ঘনীভূত হয়ে উঠছে।”
মওলানা ভাসানী হলের ৩১৩ নম্বর রুমের শিক্ষার্থী আমিনুর ইসলাম বলেন, “সাধারণত সন্ধ্যার পর এই রুমটি উকুলেলের টুংটাং শব্দে কিংবা গিটারের পরিচিত কোনো ধুনে মুখর হয়ে উঠত। শুধু আমাদের হল নয়, পাশের অন্যান্য হল থেকেও শিক্ষার্থীরা আসত প্রাণের টানে, আড্ডার জন্য।
“কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সেই চেনা আড্ডা নিস্তব্ধতায় মিলিয়ে গেছে। এখন রুমের সামনে দাঁড়ালে আর কোনো শিল্পীকে দেখা যায় না, চোখে পড়ে কেবল মশারি। যেন খণ্ড খণ্ড করে তাঁবু টানিয়ে রাখা হয়েছে।”
কথা বলার মাঝেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ শিক্ষার্থী ‘তালপাতার সেপাই’ ব্যান্ডের পরিচিত প্যারোডি গেয়ে ওঠেন।
“বিড়ি খাই আট আনার, সিগারেট জোটে না,
রাত হলে নেশাতুর ঘুমু,
বুকেও দাগ ওঠে না প্রেমিকার ঠোঁটে না,
আমি খাই মশাদের চুমু।”
তিনি বলেন, “রাতে মশার কামড়ে ঘুমানোই কঠিন হয়ে গেছে। মজা করে আমরা বলি-প্রেমিকার ঠোঁটে নয়, এখন মশার চুমুই বেশি খেতে হচ্ছে।”
অন্যান্য আবাসিক হলের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যা নামলেই মশার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়। রাতে পড়ার টেবিলে বই খোলা থাকে ঠিকই, কিন্তু মনোযোগ থাকে হাতের তালির ফাঁকে মশা মারার দিকে।

বীরপ্রতীক তারামন বিবি হলের জেরিন তাসনিম বৈশাখী বলছিলেন, “আমাদের হলে মশার দাপট এখন এমন যে, স্বাভাবিকভাবে থাকাই দায়। দিন নেই, রাত নেই- অবিরত এই দংশন আমাদের শারীরিক আর মানসিক প্রশান্তি কেড়ে নিচ্ছে।”
সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগের এ শিক্ষার্থী বলেন, “মশা থেকে বাঁচতে শিক্ষার্থীরা বেছে নিচ্ছেন কয়েল কিংবা লিকুইড। কিন্তু সেই কয়েলের কটু ধোঁয়া শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে। এরপরও এই ধোঁয়ার ভেতরেই মুখ গুঁজে পড়ে থাকতে হয়।”
কেন ক্যাম্পাসে মশার এমন অবাধ বিচরণ?
পরিবেশ বিজ্ঞানের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অরিত্র সাত্তারের মতে এটি কেবল পরিচ্ছন্নতার অভাব নয় বরং প্রকৃতির এক সূক্ষ্ম প্রতিশোধ। কয়েক বছর আগে পরীক্ষামূলকভাবে মশা মারতে যে ধোঁয়া বা ‘স্মগিং’ দেওয়া হয়েছিল, তা আসলে হিতে বিপরীত হয়েছে।

“ধোঁয়ার প্রকোপে মশা সাময়িক কমলেও চিরতরে হারিয়ে গেছে ব্যাঙের মতো উপকারী প্রাণীরা, যারা প্রাকৃতিকভাবে মশার লার্ভা খেয়ে বংশবিস্তার রোধ করত।”
এই বিভাগের মাহফুজ ইসলাম মেঘের ভাষায়, “ক্যাম্পাসের বড় লেকগুলো নয়, বরং অবহেলিত ডোবাগুলোই এখন মশার ‘আদর্শ নার্সারি’।
“ভাসানী হলের পুকুর, লাইব্রেরির পেছনে ঝোপ কিংবা রেজিস্ট্রার ভবনের পাশের বদ্ধ জলাশয়-এসব জায়গায় জমে থাকা পঁচা পাতা আর জৈব পদার্থ মশার লার্ভার জন্য তৈরি করেছে এক বিলাসী রাজপ্রাসাদ।”

শহীদ রফিক-জব্বার হলের নিরাপত্তাকর্মী কাজী জসিম উদ্দিন রাতের শিফটে দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি বলেন, “ডিউটি করার সময় দুটি মশার কয়েল জ্বললেও মশার কামড়ানো কমে না। এক জায়গায় বসে থাকতে পারি না। একটু বসলেই একসঙ্গে ১০-২০টি মশা এসে কামড়াতে শুরু করে। তখন উঠে হাঁটাহাঁটি করি।”
মশা দমনে কোনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি-না জানতে চাইলে জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আহসান লাবিবের কণ্ঠে ফুটে উঠল অসহায়ত্বের সুর।
তিনি বলেন, “প্রশাসনিকভাবে হয়তো স্প্রে বা লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে। কিন্তু জনবলসংকট আর নিয়মিত তদারকির অভাবে মশা নিধন কার্যক্রম মাঝেমধ্যেই মুখ থুবড়ে পড়ে।
“সামনে দীর্ঘ ছুটি, যখন ক্যাম্পাস আরও নির্জন হয়ে পড়বে, তখন এই মশাগুলো হয়তো আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।”
এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. আবুল কাসেমকে একধিক বার ফোন করেও সাড়া মিলে নাই।