Published : 30 May 2026, 05:07 PM
বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি সুন্দরবন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের পাশাপাশি হরিণের জন্যও বিখ্যাত। বনের জীববৈচিত্র-খাদ্য শৃঙ্খল রক্ষার জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি পর্যটকদেরও আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকে দৃষ্টিনন্দন নিরীহ প্রাণীটি।
কিন্তু মাংসের লোভে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্যে হুমকির মুখে পড়ছে এই হরিণ। সারা বছরই হরিণের মাংসের চাহিদা থাকলেও উৎসব আসলেই তা বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানান সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা।
এ ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ফাঁদে আটকা পড়া এবং জবাই করা হরিণ, হরিণের মাংস-চামড়া, ফাঁদসহ আটক হয়েছেন বেশ কয়েকজন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানান, সুন্দরবনে দেড়শরও অধিক চোরাশিকারি চক্র সক্রিয়। এসব পেশাদার শিকারিরা জেলের ছদ্মবেশে মাছ ধরার জালের সঙ্গে দড়ি নিয়ে বনে যান।
বনের ভেতরেই সেই দড়ি দিয়ে ফাঁদ তৈরি করে হরিণের যাতায়াতের পথে পেতে রাখেন। প্রাণীগুলো সেই ফাঁদে আটকা পড়লে বনের ভেতরে মাংস কেটে লোকালয়ে এনে বিক্রি এবং স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাথাসহ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে পাচার করা হয়।

শিকার শেষে ফেরার সময় ফাঁদগুলো বস্তায় ভরে জঙ্গলের ভেতর মাটি খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। সময়-সুযোগ মিললে তারা আবার শিকারে আসেন।
এসব শিকারিদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকে এজেন্ট-ব্যবসায়ীদের। এই এজেন্টদের মাধ্যমে কখনো অগ্রিম অর্ডার, আবার কখনো মাংস এনে তারপর বিক্রি করা হয়। এই চক্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে যায় হরিণের মাংস।
আবার ক্রেতারাও অনেক সময় প্রতারণা ভেবে হরিণ নিজ চোখে না দেখে মাংস কিনতে চান না। তখন চোরাশিকারিরা জীবন্ত হরিণ লোকালয়ে এনে জবাই করেন।
সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় প্রতি কেজি হরিণের মাংস ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় পাওয়া যায়। তবে জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১০০০ টাকা থেকে ২০০০ টাকা পর্যন্ত। আর আস্ত একটি জীবিত হরিণের দাম চাওয়া হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।
গত ১১ মে পূর্ব সুন্দরবন সংলগ্ন বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার চরদোয়ানী গ্রামে অভিযান চালিয়ে সংঘবদ্ধ চোরা শিকারিদের কবল থেকে এমন দুটি জীবিত হরিণ উদ্ধার করেছে বনরক্ষীরা।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান চালালে বনরক্ষীদের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা হাজীবাড়ি মসজিদের কাছে পুকুরে একটি হরিণ ফেলে দিয়ে পালিয়ে যায়।
অপর হরিণটি উদ্ধার হয়েছে একই দিন বেলা ২টার দিকে কালিয়ারখাল এলাকা থেকে। তখনও বনরক্ষীদের দেখে শিকারিরা পালিয়ে যায়। উদ্ধার করা হরিণগুলো পরে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে।
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান জানিয়েছেন, উৎসব-পার্বণ উপলক্ষ্যে একশ্রেণির অসাধু লোকজন সুন্দরবনের সম্পদ লুণ্ঠনের চেষ্টা চালায়। এ সময় চোরা হরিণ শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। তবে তাদের দমনে সার্বক্ষণিক টহল জোরদারসহ কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গত ১২ মে দুপুরে খুলনার ডুমুরিয়ায় হরিণের মাংসসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে পুলিশ।
পর জব্দ করা সেই মাংস ভাগ করে নেওয়া এবং আটক ব্যক্তিকে ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে দুই পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে।
প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় পুলিশের ওই দুই সদস্যকে খুলনা পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।
বন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে গত বছরের মে থেকে ডিসেম্বর সময়ে ৬১ হাজার ১০ ফুট মালা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। ছিটকা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৩৮০টি। এছাড়া ২ হাজার হাঁটা ফাঁদ ও ২০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে।
এসব ফাঁদ উদ্ধারের ঘটনায় ৬৯ জনকে আসামি করে মোট ২২টি মামলা করেছে পূর্ব বন বিভাগ। এসব মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৬২ জনকে।
অন্যদিকে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ফুট মালা ফাঁদ এবং ১ হাজার ২০০ ফুট গলা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। হাঁটা ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে ৭৪৮টি। পশ্চিম বন বিভাগ মামলা করেছে ৫০টি। আসামি করা হয়েছে ১৩০ জনকে। তাদের মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন ১৯ জন।
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, “সুন্দরবনে বাঘের প্রধান খাবার হরিণ শিকার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। উৎসবে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বেশি বেড়ে যায়। ধনাঢ্যব্যক্তিরা হরিণের মাংস দিয়ে উৎসব পালন করেন। এ সময় দৌরাত্ম্য বাড়ে স্থানীয় চিহ্নিত কয়েকটি চোরা শিকারিচক্রের। ”
শুভ্র শচীন বলেন, মাঝেমধ্যে দুই একটি অভিযানে হরিণের মাংস, চামড়া, মাথা উদ্ধার হলেও মূল চোরাশিকারি ও পাচারকারী আটক হয় না। আর যে পরিমাণ মাংস ও চামড়া আটক হয়, তার থেকে কয়েকগুণ বেশি পরিমাণ হরিণ শিকার করা হয়।
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হরিণের মাংস বহনকারীরাই ধরা পড়ে। আর যারা আটক হন, তারা দুর্বল আইনের কারণে কয়েকদিন পর জেল থেকে ফিরে একই কাজে লিপ্ত হন।
বন বিভাগ ও পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে আটক হরিণ শিকারিদের তথ্যে দেখা গেছে, বনের পাশে যাদের বাড়ি, তারাই বেশি হরিণ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে সুন্দরবন প্রভাবিত খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা, সাতক্ষীরার শ্যামনগর এবং বাগেরহাটের মোংলা ও শরণখোলার মানুষ বেশি হরিণ শিকার করেন। এসব উপজেলার গ্রামগুলোতে বেশিরভাগই শ্রমজীবী মানুষের বসবাস।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা সবসময় তৎপর রয়েছে। বনে পেতে রাখা বিপুল পরিমাণ ফাঁদ উদ্ধার ও ধ্বংস করায় হরিণ শিকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক সব ধরনের অপরাধ দমনে সচেষ্ট রয়েছেন বন কর্মকর্তা-প্রহরীরা।
তিনি বলেন, সুন্দরবনে বিচ্ছিন্ন কিছু হরিণ শিকারের ঘটনা ঘটলেও সেটা আগের চেয়ে তুলনামূলক অনেক কম। শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই সমন্বিত অভিযানে মাংসসহ হরিণ শিকারি ধরা পড়ছে। বিপুল পরিমাণে ফাঁদ জব্দ হচ্ছে।

তবে সম্প্রতি বনদস্যুদের তৎপরতা, সীমিত জনবল ও ভৌগোলিক জটিলতা এখনো সুন্দরবন রক্ষায় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে, বলেন তিনি।
এ বিষয়ে কার্যক্রম জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা সদর দফতর) এবং খুলনার রেঞ্জ ডিআইজির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সুন্দরবন ও উপকূলীয় অঞ্চল দস্যুমুক্ত এবং চোরাচালান ও অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন সুরক্ষা ও উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কমিউনিটিভিত্তিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হবে।
তার দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে বন বিভাগের প্রচার-প্রচারণা ও সচেতনতা কার্যক্রমের ফলে বনসংলগ্ন মানুষের আচরণেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। কারণ সুন্দরবনের প্রতি উপকূলের মানুষের অগাধ ভালবাসা।
কোনো অনৈতিক কাজে বন বিভাগের কারও জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী।