Published : 30 Apr 2026, 11:06 AM
টানা বৃষ্টির সঙ্গে উজানের ঢলে নেত্রকোণার হাওর, সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে ডুবছে একের পর এক বোরো ফসলী জমি; ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কাঁচা ঘরবাড়ি। প্রধান নদীগুলোর পানি বেড়ে সংলগ্ন নীচু এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এপ্রিল মাসের শুরু থেকেই জেলায় বজ্রসহ বৃষ্টিপাত শুরু হয়। পাশাপাশি শিলাবৃষ্টিতে ক্ষতির মুখে পড়ে বোরো ফসল। বজ্রপাতে কৃষক, কৃষি শ্রমিকসহ অনেকেই মারাও যাচ্ছেন।
এর মধ্যে রোববার বিকাল থেকে শুরু হয় ভারিবৃষ্টি। এর পর থেকে থেমে থেমে চলতে থাকে বজ্রসহ বৃষ্টিপাত। বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় নেত্রকোণায় ১০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিবদ্ধ করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
বৃষ্টিতে প্রধান নদীগুলোয় পানি বাড়তে শুরু করেছে জানিয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা নাগাদ ভোগাই-কংস নদীর পানি জারিয়া-ঝানজাইল পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যা বুধবার বিকালে ছিল ৯৩ সেন্টিমিটার।
উপদাখালি নদীর কলমাকান্দা পয়েন্টে বিপৎসীমার ৭৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে বইছে। যা বুধবার বিকালে ছিল ৬০ সেন্টিমিটার।
তবে বাকি সোমেশ্বরী, মগড়া ও ধনু নদের পানি এখনো বিপৎসীমার নীচ দিয়ে বইছে বলে জানান তিনি।

এদিকে বৃষ্টিতে জেলার বোরো ফসলী জমিতে সৃষ্টি হওয়া জলাবদ্ধতা সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তীব্র হচ্ছে। এতে করে একের পর এক জমির পাকা বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকেরা।
কলমাকান্দার কৈলাটি ইউনিয়নের কনুড়া গ্রামের মন্তোষ বিশ্বশর্মা বলেন, “সোমবার ও মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে আমার ১৫ কাঠা জমির বোরো ধান পানিতে তলায়া গেছে। এর পুরাডাই নষ্ট অইয়া যাইতাছে। তাকায় দেহন ছাড়া আমরার কি আর করারে আছে।
“আরো কিচু জমির ধান পাকছিল। কিন্তু শ্রমিক পাইতাছি না। ধানের শীষ পানির উপরে কিছুডা ভাইস্যা আছে। অহনও কাডাইতে পারলে কিচুডা ধান পাইতাম।”
মদনের গোবিন্দশ্রী গ্রামের কৃষক সুজন মিয়া বলেন, “১২০ কাঠা জমিতে বোরো লাগাইছিলাম। এর মাঝে ১০০ কাঠার মতো কাইট্যা আনছি বহু কষ্টে। বাকি ২০ কাঠা পানিতে গেছেগা। আমার জমি গোবিন্দশ্রী হাওরে আছিল। বৃষ্টির পানি হাওরে আইটকা এই অবস্থাডা অইছে।”
টানা বৃষ্টিতে কেটে আনা ধান নিয়েও বিপাকে আছেন জানিয়ে তিনি আরও বলেন, যা ধান তুইল্যা আনছিলাম এই ধানেরও দাম পাইতাছি না। ধান না পারতাছি শুকাইতে, না পারতাছি ভিজা ধান বেচতে। গোলায়ও তুলতে পারতাছি না। ধান নষ্ট হওয়ার অবস্থায় খলায় পইড়া আছে। আমার গ্রামের অনেক কৃষকের একই অবস্থা । ”

অন্তত ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ফসল পানিতে
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে নেত্রকোণায় জেলায় এবার বোরো ধান আবাদ হয় এক লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর। এর মধ্যে হাওরে আবাদ হয় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমি। বাকি জমি আবাদ হয় জেলার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলে।
অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আমিরুল ইসলাম বলেন, টানা বৃষ্টিতে মদন, মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরীসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়াও জেলার সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের অর্ধশতাধিক বিলে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এতে করে হাওর ও বিলে থাকা অপেক্ষকৃত নীচু জমির বোরো ধান তলিয়ে যায়।
এ নাগাদ হাওরসহ জেলায় কৃষকের ৯ হাজার হেক্টরের বেশি জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়েছে। এখনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় আরো জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “বৃষ্টিপাতের কারণে ধান কাটা ব্যাহত হচ্ছে। যেখানে শুধু হাওরেই প্রতিদিন আড়াই হাজার হেক্টর জমির ধান কাটা হতো সেখানে বৃষ্টির জন্যে কমে এসেছে এক হাজারেরও কম হেক্টরে। এই অবস্তায় ছয় হাজার কৃষি শ্রমিক চেয়ে ঢাকায় পত্র পাঠিয়েছি।
তিনি বলেন, “হাওরসহ সারা জেলায় এ নাগাদ মোট ২২ শতাংশ জমির বোরো ফসল কর্তন করা হয়েছে আর হাওরে কর্তন হয়েছে ৬৫ শতাংশ। আগামী ১০ মের মধ্যে হাওরের পুরো ফসল কর্তনের লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।”
সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ৭৪১টি ঘরবাড়ি
এদিকে বজ্রসহ ভারিবৃষ্টির এমন প্রতিকূল আবহাওয়ায় শুধু কৃষিজমি নয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কৃষক ও স্থানীয়দের ঘরবাড়িও। প্রাণহানিও হয়েছে বজ্রপাতে।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার দপ্তরের তথ্য মতে, বৃষ্টিতে জেলার ১০ উপজেলায় সম্পূর্ণ ও আংশিকভাবে ৭৪১টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড় ও অতিবৃষ্টির কারণে ১৫ পরিবারের ৬০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এছাড়া এপ্রিল মাসে বজ্রপাতে কৃষক, কৃষি শ্রমিকসহ ৬ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন একজন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মুহাম্মদ রুহুল আমীন বলেন, “জেলার হাওরাঞ্চলসহ পুরো জেলায় ১৭ হাজার ৭১৭ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; যাদের বোরো ফসল পানিতে তলিয়েছে।”
নদ-নদীর পানি বেড়ে বন্যার পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় তা মোকাবেলায় প্রস্তুতির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা করা হয়েছে। বন্যায় আটকা পড়লে উদ্ধারে নৌযানসহ টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রীও প্রস্তুত রয়েছে। ত্রাণ চেয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে চাহিদাপত্র।”
চাহিদাপত্রে রয়েছে, ২৭০ টন জিআর চাল, ৭ লাখ টাকা জিআর ক্যাশ, ২ হাজার ৩৪০ বান্ডিল ঢেউটিন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনে ১৯ কোটি ৬৫ লাখ ৫১ হাজার টাকা, ৩ হাজার ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার, গোখাদ্যবাবদ ১০ লাখ টাকা, শিশু খাদ্যবাবদ ৭ লাখ টাকা, গৃহমঞ্জুরি বাবাদ ২৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা। এছাড়াও নগদ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে ২০ লাখ টাকা।
জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, “কৃষকের বোরো ধান কর্তনসহ বন্যা মোকাবেলায় সব ধরণের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে ইউএনওদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় ত্রাণ-সামগ্রী রয়েছে। আরও চাহিদাপত্র পাঠানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, “জনপ্রতিনিধিসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষদের সহযোগিতায় দুর্যোগ মোকাবেলা করা হবে। আশা করছি সবাই মিলে কাটিয়ে উঠতে পারবো।“