Published : 11 Apr 2026, 07:51 PM
“বইনের মুখখান শেষবারের মত দেখবার চাই। আমাগো সরকারের কাছে দাবি জানাই, আমার বইনের লাশটা দেশে আনবার ব্যবস্থা কইরা দেন।”
বিলাপ করতে করতে কথাগুলো বলছিলেন লেবাননে ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত নারী শ্রমিক দিপালী আক্তারের ছোট বোন লাইজু বেগম।
বুধবার সন্ধ্যায় বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন দিপালী। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে মারা যান। শুক্রবার এক শোকবার্তায় দিপালী মৃত্যুর খবর জানায় লেবাননে বাংলাদেশ দূতাবাস।

নিহত ৩৪ বছর বয়সী দিপালী ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলার চর হরিরামপুর ইউনিয়নের পূর্ব শালেপুর গ্রামের শেখ মোফাজ্জল ওরফে মোকা শেখের মেয়ে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে চতুর্থ ছিলেন দিপালী। লেবাননে গৃহকর্মী হিসেবে একটি পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই পরিবারে ছিল অভাব-অনটন। না খেয়ে কেটেছে অনেক রাত। চরাঞ্চলে প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে কোনও রকমে টিকে ছিলেন দিপালী। জীবন বাঁচাতে পদ্মা থেকে মাছ ধরে কিংবা চরের কাশবন থেকে কাশফুল এনে বিক্রি করতেন। দিপালীর মা রাজিয়া বেগম আট বছর আগে বজ্রপাতে মারা যান।
পরিবারের দুঃখ ঘোচাতে ১৯ বছর বয়সে ২০১১ সালে গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে প্রথমবার লেবাননে যান দিপালী। সেখানে দীর্ঘদিন থাকার পর ২০১৮ সালে দেশে ফিরে আসেন দিপালী। ২০২৩ সালে আবার লেবাননে যান তিনি। বিদেশে যাওয়ার পর দেশে প্রতি মাসে টাকা পাঠাতেন।
সেই টাকায় দুবোনের বিয়ে হয়। বাড়িতে টিনের ঘর ওঠে। দ্বিতীয়বার বিদেশে যাওয়ার কয়েক মাস আগে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন দিপালী। কাজ কর্ম তেমন একটা করতে পারতেন না। সবশেষে ২০২৪ সালের এপ্রিলে আবার পাড়ি জমান লেবাননে।
বৈরুতের একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলের বিমান হামলা চালালে দিপালী আহত হন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি স্থানীয় একটি হাসপাতালে মারা যান।
সারা জীবন সংসারের অভাব, দরিদ্রতা ঘোচাতে যিনি বিদেশের মাটিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন সেই দীপালী আক্তারের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। দিপালীকে হারিয়ে স্তব্দ গোটা পরিবার।
ঘটনার দিন বুধবার দিপালীর সঙ্গে স্বজনদের শেষবার কথা হয় বলে জানান ছোট বোন লাইজু। তিনি বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে তার বোন বেশ কষ্টে ছিলেন। দুইবেলা রুটি খেয়ে দিন কাটাতেন। যে বাড়িতে কাজ করতেন, সেই বাড়ি থেকে অন্যত্র চলে যান জীবন বাঁচাতে।

লাইজু বলেন, দিপালী তাকে ফোন করে বলেন, যে বাড়িতে কাজ করেন সেই বাড়ির সদস্যসহ তিনি অন্য এলাকায় গেছেন। আগে যেখানে ছিলেন সেখানে যুদ্ধের ভয়াবহতা বেশি। কিছুদিন এখানে থাকার পর যুদ্ধ বন্ধ হলে আগের যায়গায় যাবেন। দিপালী খুব কষ্টে আছেন বলে ফোনে জানান। এরপর আর যোগাযোগ হয়নি।
দিপালীর বাবা মোফাজ্জেল বলেন, “তারে দ্যাশে আইন্যা মাটি দিবার চাই। আপনারা আমার মাইয়াড্যারে আনবার ব্যবস্থা কইরা দ্যান।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য শেখ ফালু বলেন, “পরিবারটি খুব অসচ্ছল। মেয়েটি অনেক কষ্ট করে বিদেশে গিয়ে কাজ করছিল। এমন মর্মান্তিক মৃত্যু খুবই দুঃখজনক। আমরা চাই দ্রুত মরদেহ দেশে এনে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হোক।”
চরভদ্রাসন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুরাইয়া মমতাজ বলেন, “নিহতের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। লাশ দেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আমরা সার্বিকভাবে পরিবারটির পাশে আছি এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে লাশ দেশে আনার চেষ্টা চলছে।”
আরও পড়ুন-
গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে ২ বছর আগে লেবাননে যান ফরিদপুরের দিপালী