Published : 26 Jul 2026, 10:56 AM
প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জেরে ভারতের যে শিক্ষামন্ত্রীকে সরে দাঁড়াতে হলো, সেই ধর্মেন্দ্র প্রধানের রাজনীতিতে উত্থান ঘটেছিল একই বিষয়ে আরেক আন্দোলনে।
আনন্দবাজার লিখেছে, তিন দশক আগে ১৯৯৭ সালে ওডিশায় প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে রাজপথে নেমেছিলেন তরুণ ধর্মেন্দ্র। পূর্ব ভারতের রাজ্যটিতে তখন ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেস, মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকীবল্লভ পট্টনায়ক।
তার সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে রাজ্যের রাজধানী ভুবনেশ্বরে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের কাছাকাছি প্রায় ১,৫০০ শিক্ষার্থী ধর্নায় বসেন। সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, যার বদৌলতে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন তিনি। রাজ্য সচিবালয়ের সামনে টানা আন্দোলনের ফলে প্রবল চাপে পড়ে যায় তৎকালীন কংগ্রেস সরকারও।
সেই সময় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ধর্মেন্দ্র। আরএসএসের ছাত্র সংগঠন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) নেতৃত্বে তিনি প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামেন। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য ছিল, এই ঘটনার দায় কোনোভাবেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জানকীবল্লভ পট্টনায়কের সরকার এড়াতে পারে না। তাদের অভিযোগ, কংগ্রেস-শাসিত ওডিশা সরকার প্রশ্নফাঁসের মাধ্যমে যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছেলেখেলা করছে।
ভুবেনশ্বরের উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনি ধর্মেন্দ্রের সঙ্গে সেই সময় আন্দোলনে শামিল হয়েছিলেন সেখানকার আরএমডি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ প্রশান্ত রাউত।
সেই অস্থির সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রশান্ত বলেন, আন্দোলনের শুরুর দিকে পুলিশ-প্রশাসন কিছুই বলেনি; বিক্ষোভও ছিল শান্তিপূর্ণ। কিন্তু পরে রণক্ষেত্রে রূপ নেয় ওই এলাকা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বেধড়ক মার খেতে হয়েছিল ধর্মেন্দ্রকেও। তার বেশ কয়েকটা হাড় ভেঙে গিয়েছিল। তবে আন্দোলনের জায়গা থেকে তিনি সরে যাননি।
আনন্দবাজার লিখেছে, ধর্মেন্দ্রের রাজনৈতিক জীবন গড়ে উঠেছে ছাত্রনেতা, সংগঠক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতাকে ভর করে। তার সাংগঠনিক ভূমিকার কারণেই ওডিশায় বিজেপির ভিত্তি শক্তিশালী হয়। বিজু জনতা দলের (বিজেডি) টানা দুই দশকেরও শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে প্রথমবারের মতো সেখানে সরকার গঠন করে বিজেপি।

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ওডিশায় বিজেপিকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে ক্ষমতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী নেতাদের অন্যতম কান্ডারি ধর্মেন্দ্র প্রধান। ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে উঠে আসা ধর্মেন্দ্রের সাংগঠনিক দক্ষতা ‘প্রশ্নাতীত’। বিজেপিতে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিন সেই কাজ করেন তিনি। ২০২১ সালে শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার আগে পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ছিল তার কাঁধে। এছাড়া সামলেছেন দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা মন্ত্রণালয়ও।
২০২১ সালে নিশাঙ্ক পোখরিয়ালের কাছ থেকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ গ্রহণের পর থেকে বিতর্ক পিছু ছাড়েনি ধর্মেন্দ্রের। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে শুরু করে ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অফ সেকেন্ডারি এডুকেশনের (সিবিএসই) সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে টানাপড়েন পর্যন্ত।

ভারতজুড়ে গত আট বছরে ৯০টিরও বেশি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। ফলে ধর্মেন্দ্রকে এ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে বহু বিতর্কের মুখোমুখি হতে হয়েছে।
আনন্দবাজার লিখেছে, পোড়খাওয়া রাজনীতিক ধর্মেন্দ্রকে পদত্যাগে বাধ্য করানোয় স্বাভাবিকভাবেই উল্লসিত ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) কর্মী-সমর্থকরা। শনিবার দুপুরে ধর্মেন্দ্রের ইস্তফার খবর দিল্লির যন্তর মন্তরে (আন্দোলনস্থল) পৌঁছানো মাত্র উল্লাসে ফেটে পড়েন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলনকারীর চোখে দেখা গিয়েছে আনন্দাশ্রু।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগকে ‘গণতন্ত্রের জয়’ বলে বর্ণনা করেছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তার দাবি, গত কয়েক দিন ধরে লাগাতার আন্দোলনের চাপে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।
যন্তর মন্তরে মঞ্চ থেকে অভিজিৎ বলেন, ‘‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফাই প্রমাণ করে যে আপনারা যদি ভয় না পান, সরকারের কাছে মাথা নত না করেন, তবে আমরা যে কারও পদত্যাগপত্র আদায় করতে পারি।”


ইস্তফার পর ধর্মেন্দ্র এক্স পোস্টে বলেন, “গত চার দশক ধরে আমি দেশের ছাত্র, শিক্ষক ও শিক্ষাক্ষেত্রে বদল আনার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে এসেছি। শক্তিশালী শিক্ষা ব্যবস্থাই একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রের ভিত গড়ে তুলতে পারে।
“দেশের যুবসমাজের আকাঙ্ক্ষা, অনুভূতি, ন্যায়সঙ্গত প্রত্যাশাকে আমি গভীর ভাবে শ্রদ্ধা করি। তরুণ প্রজন্মের স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করা আমাদের সকলের রাজনৈতিক এবং সামাজিক অঙ্গীকার। দেশের সেবা করার সুযোগ আমি পেয়েছি, তার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞ।”
ধর্মেন্দ্র দাবি করেন, ৩ মে অনুষ্ঠেয় নিট পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পরই তিনি তার দায়ভার স্বীকার করেছিলেন। কখনও নিজের দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করেননি। তার লক্ষ্য ছিল, কোনো মেধাবী ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ যেন নষ্ট না হয় এবং কারও সঙ্গে অন্যায় না ঘটে।

ধর্মেন্দ্র তার এক্স পোস্টে বলেছেন, সবশেষ ১০ দিনের ঘটনাবলিতে তিনি ‘খুবই ব্যথিত’। যন্তর মন্তরসহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা যাতে দেশবিরোধী শক্তিরা কাজে লাগাতে না পারে, দেশের ঐক্য অটুট থাকে, কোনো শিক্ষার্থী আইনি জটিলতায় না জড়ায় এবং তারা যাতে নিজেদের পড়াশোনা ও ক্যারিয়ারে মন দিতে পারে, সেই কথা ভেবেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।