Published : 15 Dec 2025, 04:56 PM
একাত্তর সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের ‘আল-বদর, আল-শামস’ নয় পার্শ্ববর্তী দেশের লোকেরা হত্যা করেছে বলে দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু।
বুদ্ধিজীবী হত্যার জন্য ‘একটি রাজনৈতিক দলকে’ দায়ী করা হলেও তা সঠিক ইতিহাস নয় দাবি করে টিপু ওই রাজনৈতিক দলটিকে বর্তমান সরকারের কাছে ‘ইতিহাস সংশোধনের দাবি’ জানানোর আহ্বানও জানান।
রোববার নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। সোমবার বিএনপি নেতার এ বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ালে শুরু হয় আলোচনা ও সমালোচনা।
এদিকে রাজধানীর ফার্মগেইটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের এক আলোচনা সভায় একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ‘ভারতীয় সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ’ বলে দাবি করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।
জামায়াত নেতা গোলাম পরওয়ার বলেন, “বামপন্থি ও কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু বুদ্ধিজীবী এবং ভারতপন্থিরা দীর্ঘদিন ধরে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নাম জড়িয়ে আসছেন।
“তবে ইতিহাসের নানা তথ্য ও সত্য সামনে আসায় প্রমাণ হয়েছে, এই হত্যাকাণ্ড ভারতীয় সেনা ও গোয়েন্দাদের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। কারণ, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের প্রাক্কালে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।”
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে সভায় বিএনপি ছাড়াও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা অংশ নেন।
বিএনপি নেতা আবু আল ইউসুফ খান টিপু তার বক্তব্যের শুরুতে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন।
পরে তিনি বলেন, “আজকেও পত্রিকা পড়লাম। পত্রিকার পাতার সম্পাদকীয় কলাম ও বিভিন্ন জায়াগায় লিখেছে যে, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে আল-বদর, আল-শামস। আমাদের ইসলামিক রাজনৈতিক দলের নেতারা আছেন, তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, বিএনপিরে দোষারোপ করে (আপনারা) অনেক কথা বলেন।
“যখন আপনাদের দোষারোপ করে ইতিহাস লেখা হয়, আপনারা কেন সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্য বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছেন না?”
‘১৪ ডিসেম্বর তো কোনো আল-বদর, আল-শামস আমাদের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেন নাই’ দাবি করে টিপু বলেন, “হত্যা করেছিল (তারা), যারা সেদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব হবে কি হবে না বা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করতে চেয়েছিল।
“যারা দেশ স্বাধীন হতে দেবে কি দেবে না...! সেদিন পার্শ্ববর্তী কোনো এক দেশের লোকেরা পূর্ব-পাকিস্তান ও পশ্চিম-পাকিস্তানের মধ্যে যে যুদ্ধ বেঁধেছিল সেটাকে টার্গেট করে আমাদের বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করা হয়েছিল।”
“জহির রায়হান, শহীদুল্লাহ কায়সারসহ এমন অনেক মেধাবী বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করেছিল। যে সকল মেধাবীরা বেঁচে থাকলে অনেক আগেই দেশ স্বাধীন হত।”
জামায়াতকে উদ্দেশ করে বিএনপি নেতা বলেন, “আমি মনে করি, ইসলামিক দলগুলো যাদেরকে টার্গেট করে বিভিন্ন বাম সংগঠন, বাম-মনা সাংবাদিক এখনো আপনাদেরকে টার্গেট করে কথা বলেন, আর ইতিহাসের পাতায় আপনাদেরকে বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করে।
“কেন আপনারা এটা সংশোধন করেন না, কেন আপনারা দাবি জানান না? শুধু কোনো জায়গায় স্টেজে উঠলেই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে, বিএনপির বিরুদ্ধে (কথা) বলেন, কিন্তু কোনোটা প্রমাণ করতে পারেন না। অতএব রাজনৈতিক ইসলামিক দল, এখানে কাদেরকে বলছি, উনারা ভালো করে বুঝতেছেন।”
তিনি বলেন, “ইতিহাসটাকে সঠিক করে তুলে ধরার জন্য আপনারা সরকারের কাছে দাবি জানান। আগামী প্রজন্মের কাছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে আপনারাই শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত থাকবেন। অতএব ইতিহাস সঠিক যেন লেখা হয়, কারা হত্যা করেছে, সেটা যেন লেখা হয়।”
সভায় উপস্থিত জামায়াতের মহানগর কমিটির আমীর মাওলানা আবদুল জব্বার বিএনপি নেতা টিপুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আগামী সরকারের কাছে আমরা মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস রচনার দাবি জানাই।”
এ সময় জামায়াত নেতাকে থামিয়ে দিয়ে টিপু বলেন, “বিগত ১৬ বছর বা এর আগে স্বাধীনতার পর অনেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিল...অতএব সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার জন্যই আমি আহ্বান করছি।
“পাশাপাশি এই বক্তব্যে কারও যদি গাত্রদাহ হয়, তাহলে আগামীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় আপনারাও বিএনপির যাতে গাত্রদাহ না হয় সেইদিকে খেয়াল করে বক্তব্য দেবেন।”
এ সময় আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে প্রশাসনের তৎপরতা বৃদ্ধির কথাও বলেন টিপু।
বক্তব্যের শেষ দিকে আবারও বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস সঠিকভাবে তুলে ধরার দাবি জানিয়ে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব বলেন, “আবারও বুদ্ধিজীবী দিবসের ইতিহাস ডিসি সাহেবের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের কাছে তুলে ধরবেন। বুদ্ধিজীবী হত্যার ইতিহাস, বিজয় দিবসের ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস যেন সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়।”
“৫ অগাস্ট হয়ে গেল, অনেকে অনেক কথা বলি, কিন্তু এখনো স্বাধীনতার ঘোষকের যে ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের যে ইতিহাস, বুদ্ধিজীবীর ইতিহাস- এখনো কিন্তু পাঠ্যপুস্তকে সঠিকভাবে তুলে ধরা হয় নাই”, যোগ করে আগামী বছরেই প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকের ইতিহাস সংশোধনেরও দাবি জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে জেলা সিভিল সার্জন এ এফ এম মুশিউর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আলমগীর হুসাইন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী, মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান, জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব, মহানগর জামায়াতের সাবেক আমীর মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ, গণসংহতি আন্দোলনের জেলা সমন্বয়কারী তরিকুল ইসলাম, এনসিপির জেলা কমিটির সমন্বয়কারী আব্দুল্লাহ আল আমিন, ইসলামী আন্দোলনের মহানগর সভাপতি মুফতি মাসুম বিল্লাহ এবং গণঅধিকার পরিষদ জেলা সভাপতি মো. নাহিদ উপস্থিত ছিলেন।
সভায় তাৎক্ষণিক বিএনপি নেতা টিপুর বক্তব্য নিয়ে কেউ প্রতিবাদ বা বিরুদ্ধমত প্রকাশ না করলেও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই প্রতিবাদ এবং নিন্দা জানান।
এ বিষয়ে এনসিপি নেতা আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, “টিপু ভাই যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন তখন আমি আর রাজিব (জেলা বিএনপি নেতা) ভাই পাশাপাশি বসা ছিলাম। আমরা দুজনই তখন অবাক হয়েছি। নিজেরাও এটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম যে, ‘উনি এ ধরনের বক্তব্য কীভাবে দিলেন!’ আমাদের খুব অবাক করেছে তার বক্তব্য।
“প্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে ধারণার উপর ভিত্তি করে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন না। অনেকেই মনগড়া ইতিহাস বানাতে চাচ্ছে কিন্তু ওনার (টিপু) মতো দায়িত্বশীল জায়গা থেকে এই ধরনের বক্তব্য আসবে, তা আমরা এক্সপেক্ট করিনি।
“ওই সভায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে এমন চিন্তা করে আমরা সরাসরি প্রতিবাদ না জানালেও, কোনোভাবেই এই বক্তব্যকে সমর্থন করা যায় না। সভা শেষে টিপু ভাইকেও আমরা এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমতের কথা বলেছি।”
“মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকারীদের দায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীদের। এখানে কোনো বিতর্কের সুযোগ নাই। যদি কোনো বিতর্ক (ভবিষ্যতে) অ্যাকাডেমিকেলি তৈরিও হয়, তাও প্রমাণের ভিত্তিতে হতে হবে”, যোগ করেন এনসিপি নেতা।
সভায় উপস্থিত গণসংহতি আন্দোলনের নেতা তরিকুল ইসলাম সুজন বলেন, “যারা আজ এ বিষয়ে বিতর্ক তৈরি করছে, হয় তাদের ইতিহাস-জ্ঞান সীমিত, নয়তো তারা সচেতনভাবে দেশ-বিরোধীদের পক্ষাবলম্বন করছে।
“মুক্তিযুদ্ধে বিএনপির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। ইতিহাস বিকৃতির এই অপচেষ্টা অনাকাঙ্ক্ষিত। অতীতে ইতিহাসকে আওয়ামী লীগ দলীয়করণ করেছে, আজ দলীয়করণ নয়, কেউ কেউ ইতিহাসের মিথ্যাচার করছে।”
সোমবার বিকালে মোবাইল ফোনে বিএনপি নেতা টিপুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রোববার দেওয়া বক্তব্যের সাফাই দেন এবং বলেন, এটি তার ব্যক্তিগত মতামত, দলীয় নয়।
“পশ্চিম পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীদের চিনত না। তখন যুদ্ধটাকে আরও উস্কে দিতে এবং দেশকে মেধাশূন্য করতে তৃতীয় একটি পক্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। আমি বাংলাদেশের রাজনীতি যেহেতু করি, ইতিহাসের বই-পত্র ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনাতে এমন তথ্য পেয়েছি”, বলেন তিনি।
তবে নিজ দলের সদস্যসচিবের বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান।
মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, “আমি এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত না। এবং দলও এই কনসেপ্টের সঙ্গে একমত না।”
দলীয় নেতার এমন বক্তব্যের বিষয়টি জ্যেষ্ঠ নেতাদের নজরে আনা হয়েছে এবং তারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান সাখাওয়াত।
বুদ্ধিজীবী হত্যা 'ভারতীয় সেনাবাহিনীর ষড়যন্ত্রের অংশ': গোলাম পরওয়ার