Published : 11 Jul 2024, 08:41 PM
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় পুলিশের হামলার প্রতিবাদে রেললাইন অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেশন বাজার সংলগ্ন এলাকার ঢাকা-রাজশাহী রেললাইন অবরোধ করেন তারা। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত অবরোধের পর রেলপথ থেকে সরে যান তারা।
এর আগে বিকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করতে যাওয়ার পথে চট্টগ্রামের টাইগারপাস এলাকায় ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ লাঠিপেটা, কাঁদুনে গ্যাস ও ফাঁকা গুলি করে।
এর প্রতিবাদে বিকাল সাড়ে ৫টায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে ঝটিকা মিছিল বের শিক্ষার্থীরা। পরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন আবাসিক হল ধরে ক্যাম্পাস সংলগ্ন স্টেশন বাজারের রেললাইনে অবস্থান নেয়। তীব্র বৃষ্টির মধ্যেও শিক্ষার্থীরা রেলপথ অবরোধ অব্যাহত রাখেন।

এসময় শিক্ষার্থীদের 'সারা বাংলায় খবর দে, কোটা প্রথার কবর দে' 'বঙ্গবন্ধুর বাংলায় বৈষম্যর ঠাঁই নাই', 'লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে, 'কোটা না মেধা, মেধা মেধা', 'কুমিল্লায় হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই', 'রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়', 'আমার ভাই আহত কেন, প্রশাসন জবাব চাই' ইত্যাদি বলে স্লোগান দিতে দেখা যায়।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী বাদশা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ আন্দোলন তো শুধু আমাদের না নিজেদের জন্য নয়; এটা প্রতিটা মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন। চট্টগ্রামে দেখেন ২২ কি.মি দূরে এসে আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা।
“জানতে পেরেছি কুমিল্লা ও চট্টগ্রামে আমাদের ভাইদের ওপর হামলা চালানো হয়েছে। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। এছাড়া আমাদের এক দফা দাবি মেনে নেওয়ার দাবি জানাই। "
এর আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেটের আমতলা চত্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারি চাকরিতে কোটাপদ্ধতি সংস্কারের এক দফা দাবিতে সারাদেশের সঙ্গে সমন্বয় করে পরবর্তী কর্মসূচি দেওয়ার কথা জানিয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়কারীরা।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী মেহেদী সজীব জানান, আন্দোলনকে বেগবান করতে শুক্রবার-শনিবার রাজশাহীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আন্তঃহল ও বিভাগের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বসে জনসংযোগ করার কথা জানায়। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় যে কোনো সময় মাঠে নামার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরিতে সব কোটা বাতিল করে পরিপত্র জারি করে সরকার। এক রিট আবেদনের রায়ে গত ৫ জুন মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাই কোর্ট।

এরপর থেকেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নতুন করে আন্দোলনে নামেন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণরা। প্রথম কয়েক দিন মিছিল, মানববন্ধনের মত কর্মসূচি থাকলেও এ সপ্তাহের শুরু থেকে শুরু হয় তাদের অবরোধ কর্মসূচি, যার নাম তারা দিয়েছে ‘বাংলা ব্লকেড’।
‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে আন্দোলনকারীরা শুরুতে চার দফা দাবিতে বিক্ষোভ করলেও এখন তারা মাঠে রয়েছে এক দফা নিয়ে।
তাদের দাবি হল- সব গ্রেডে সব ধরনের ‘অযৌক্তিক ও বৈষম্যমূলক’ কোটা বাতিল করে সংবিধানে উল্লেখিত অনগ্রসর গোষ্ঠীর জন্য কোটাকে ‘ন্যূনতম পর্যায়ে’ এনে সংসদে আইন পাস করে কোটা পদ্ধতিকে সংশোধন করতে হবে৷
ওই ‘ন্যূনতম পর্যায়’ বলতে প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ অনগ্রসর লোকদের জন্য ৫ শতাংশ পর্যন্ত কোটা ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে করছে তারা।
আন্দোলনকারীরা গত রবি ও সোমবার বিকালে ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় অবরোধ করে ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি পালন করেন। এরপর বুধবার সকাল-সন্ধ্যা সারা দেশে তাদের একই কর্মসূচি চলে। তাতে যানজট এবং পরিবহন না পেয়ে দুর্ভোগে পড়ে মানুষ।
এই আন্দোলনের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ বুধবার কোটা নিয়ে স্থিতাবস্থা জারির আদেশ দেয়।
কিছু পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা দিয়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, কোটা নিয়ে এখন কোনো কথা বলা যাবে না। হাই কোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে আপিল বিভাগ আবার বিষয়টি শুনবে।
বৃহস্পতিবার সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও করপোরেশনে চাকরিতে সরাসরি নিয়োগে দুটি গ্রেডে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ের মূল বা বাস্তবায়নের অংশ প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট।
সেখানে বলা হয়েছে, এ রায় পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পাশাপাশি আগে থাকা অন্যান্য কোটাও বহাল করতে হবে। তবে সরকার চাইলে বিভিন্ন কোটার হার কমাতে, বাড়াতে বা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করতে পারবে।
আন্দোলনকারী ও সরকারের তরফে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের যে কথা বলা হচ্ছে, এই রায়ের মধ্য দিয়ে তার পথ প্রশস্ত হল।
আরও পড়ুন
কোটা: কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া
স্থিতাবস্থা জারির পরও রাবি শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ
কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ফের মহাসড়ক অবরোধ রাবি শিক্ষার্থীদের
কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে ফের মহাসড়ক অবরোধ রাবি শিক্ষার্থীদের
কোটার বিরোধিতা: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধ