Published : 06 Jul 2024, 03:03 PM
সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আবার মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সিনেট ভবন সংলগ্ন প্যারিস রোডে মানববন্ধন করেন তারা। পরে মিছিল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের সামনের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা এবং পুনরায় উপাচার্যের বাসভবন সংলগ্ন প্যারিস রোডে অবস্থান নেয়।
এর মধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি শুরু হলেও প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়ক অবরোধ করে রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। এ সময় কোটাপদ্ধতির সংস্কার চেয়ে ৪ দফা দাবি তুলে ধরা হয়।
প্রথমত, ২০১৮ সালের পরিপত্র বহাল সাপেক্ষে কমিশন গঠন করে সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কার করতে হবে। কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা কোটায় শূন্যপদ পূরণ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি তার জীবদ্দশায় সব ধরনের সরকারি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় একবার কোটা সুবিধা ব্যবহার করতে পারবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
তৃতীয়ত, প্রতি জনশুমারির সঙ্গে অর্থনৈতিক সমীক্ষার মাধ্যমে বিদ্যমান কোটার পুনর্মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে
সর্বশেষ দফা হল, দুর্নীতিমুক্ত, নিরপেক্ষ ও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ফারজানা তন্বী বলেন, “নারী হয়েও আমি চাই না যে, নারী কোটা থাকুক। কেননা প্রতিটি মানুষই মেধাবী এবং তা চর্চার বিষয়। আমি মনে করি, যারা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বা পোষ্য তারাও যথেষ্ট মেধাবী। কোটার সুবিধা দিয়ে বরং তাদের মেধার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে।

“তাছাড়া যে, প্রেক্ষাপটে এ পদ্ধতির বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সে প্রাসঙ্গিকতা এখন আর নেই। তাই আমরা চাই কোটা পদ্ধতির দ্রুতই সংস্কার করা হোক।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ সায়েস বিভাগের শিক্ষার্থী জনি চন্দ্র রায় বলেন, “একটা দেশের সরকারি চাকরিতে যদি সব মিলিয়ে ৫৬ শতাংশ কোটা থাকে তাহলে সে জাতির কোনোদিন উন্নতি হতে পারে না।
“এর ফলে মেধার মূল্যায়ন তো হচ্ছেই না বরং একটা মেধাহীন জাতি তৈরি হচ্ছে। যদি এভাবে চলতে থাকে ভবিষ্যতে আরও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি হবে। আমরা যেনো আর কোনো বৈষম্যের শিকার না হই, তাই আজ এখানে দাঁড়িয়েছি।”
একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের শিক্ষার্থী শাহাবুদ্দিন আহমেদ সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে বলেন, “আমি চাই এ কোটা সংস্কার আন্দোলন সফল হোক। কারণ, আমি যেমন বর্তমানে বিসিএস এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, তেমনি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও নিচ্ছে।
“এখন আমি যদি চাই তাহলে চাকরি ক্ষেত্রে কোটা প্রয়োগ করে তাদের থেকে এগিয়ে যেতে পারব। আমি চাই না তারা আমার থেকে পিছিয়ে পড়ুক।”
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রে সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনে চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করা হয়।

মুক্তিযোদ্ধা কোটার পাশাপাশি বাতিল হয় ১০ শতাংশ করে নারী ও জেলা কোটাও।
তবে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল হলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে কোটা ব্যবস্থা আগের মতই বহাল থাকবে বলে ওই পরিপত্রে বলা হয়।
ওই পরিপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০২১ সালে রিট করেন চাকরিপ্রত্যাশী ও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অহিদুল ইসলামসহ সাতজন। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর হাই কোর্ট রুল দেয়।
রুলে ওই পরিপত্র কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত রুল অ্যাবসলিউট বা যথাযথ ঘোষণা করে রায় দেয় বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের ও বিচারপতি খিজির হায়াতের হাই কোর্ট বেঞ্চ।
এর ফলে সরকারি দপ্তর, স্বায়ত্তশাসিত বা আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন করপোরেশনে চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেড মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিলসংক্রান্ত পরিপত্র অবৈধ হয়ে গেছে।
এরপর থেকেই ২০১৮ সালের পরিপত্র পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীরা।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার সকালে সরকারি চাকরির প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পদ্ধতি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করে হাই কোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি মুলতবি হয়েছে। প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে আপিল বেঞ্চ চেম্বার আদালত এ আদেশ দেন। ফলে আপাতত হাই কোর্টের রায় বহাল রয়েছে।
এর প্রতিবাদে সকালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল ও ক্যাম্পাস সংলগ্ন অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন।
আরও পড়ুন:
কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ রাবি শিক্ষার্থীদের
মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের রায় আপাতত বহাল
কোটার রায় বহাল: জাবি শিক্ষার্থীদের ৩০ মিনিট ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবর
কোটা বাতিলের দাবিতে কুমিল্লা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ, তীব্র যানজট