Published : 09 Aug 2025, 03:41 PM
সংবিধান সংস্কারের প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলি ‘বহুত্ববাদের বিরোধিতা’ করেছেন অভিযোগ করে এই বিরোধিতাকে আদিবাসী জনগণের সঙ্গে প্রহসন বলে মন্তব্য করেছেন আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব সুজন চাকমা।
শনিবার সকালে আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে খাগড়াছড়িতে আয়োজিত সমাবেশে একথা বলেন তিনি।
আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির উদ্যোগে ‘আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও ভবিষ্যৎ গঠনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সার্থক প্রয়োগ' প্রতিপাদ্যে এদিন জেলায় অনুষ্ঠিত হয়েছে নানা আয়োজন।
এর মধ্যে শনিবার সকালে মহাজন পাড়া সূর্যশিখা ক্লাব থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের হয়।
ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের মানুষের অংশগহণে শোভাযাত্রাটি শহরের শাপলা চত্বর, আদালত সড়ক, কদমতলী, নেন্সী বাজার হয়ে খাগড়াপুরে এসে শেষ হয়। পরে খাগড়াপুরের জেবিসি রেস্টুরেন্ট সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এসময় আয়োজকরা জাতিসংঘ ঘোষিত আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষরসহ সাতদফা দাবি জানান।
এসব দাবির মধ্যে আছে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান, পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীদের সঠিক ইতিহাস, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্ত করা, মাতৃভাষায় পাঠদান এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও দ্রুত বাস্তবায়ন।
এছাড়া, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্য ও প্রথাগত ভূমি অধিকার নিশ্চিত, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে সংঘটিত ধর্ষণের বিচার, নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কারাগারে অন্তরীণ নিরপরাধ বম সম্প্রদায়ের লোকদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবি জানান তারা।
সমাবেশে উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও জনসংহতি সমিতি সমর্থিত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)র সভাপতি সুজন চাকমা (ঝিমিট) বলেন, “বঞ্চনা এবং বৈষম্যের মধ্য দিয়ে আমরা আদিবাসী দিবসটি পালন করছি।পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রতিনিয়ত নারী নির্যাতন, শিশু নিপীড়ন থেকে শুরু করে ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পর্যটনের নামে ভূমি দখল হচ্ছে।
“নিরাপত্তাহীনতায় সামগ্রিকভাবে আমাদের জীবনযাত্রা ব্যহত হচ্ছে, আদিবাসী মানুষ আমরা ভালো নেই। আমরা বাংলাদেশে বৈষম্যের শিকার হচ্ছি।”

তিনি আরও বলেন, “২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীরা প্রত্যাশা করেছিল নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ হবে এবং তাতে আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি থাকবে। কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যে প্রক্রিয়া তাতে দেশের সকল রাজনৈতিক দলই ‘বহুত্ববাদ’-র বিরোধিতা করেছেন।
“এমনকি জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠা রাজনৈতিক দল এনসিপিও। আজকে যেখানে দেশের বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা সভা-সমাবেশে মুখে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের অর্ন্তভুক্তির কথা বলেন সেখানে বহুত্ববাদের বিরোধিতা আদিবাসী জনগণের সাথে প্রহসন ছাড়া কিছু নয়।”
সমাবেশে উদযাপন কমিটির সদস্য জ্ঞান চাকমা বলেন, “২০০১ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম গঠিত হওয়ার পর থেকে বেসরকারিভাবে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিন্তু ৩০ জুন ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতির দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।
“২০২২ সালের ১৯ জুলাই তথ্য ও প্রচার মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে অফিস-আদালত, সংবাদ মাধ্যমসহ মিডিয়ায় আদিবাসী শব্দটি ব্যবহার না করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। যা এখনো বলবৎ রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী শব্দ সম্বলিত জনপ্রিয় গ্রাফিতি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে ১৫ জানুয়ারি আদিবাসী ছাত্র-জনতার ব্যানারে মতিঝিলে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড শান্তিপূর্ণ ঘেরাও কর্মসূচিতে হামলা চালায় স্টুডেন্ট ফর সভারেন্টি নামক সংগঠন। এতে বহু ছাত্র-জনতা মারাত্মক আহত হলেও তার যথাযথ বিচারও আমরা আজো পাইনি।”
সমাবেশের প্রধান বক্তা আদিবাসী নেতা সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, “আদিবাসী ইস্যু পার্বত্য চট্টগ্রাম বা বাংলাদেশের কোনো ইস্যু না। এটা আর্ন্তজাতিক ইস্যু।
“হয়তো অতি নিকট ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসবে। আমাদের জোর দাবি থাকবে যাতে আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি পাই। যদি তার ব্যাত্যয় হয়, আমাদের যদি আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া না হয় তাহলে আমরা লাগাতার কর্মসূচি পালন করার জন্য জনগণকে সংগঠিত করব।”
আর্ন্তজাতিক আদিবাসী দিবস উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক সাথোয়াই অং মারমার সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, সাংস্কৃতিক কর্মী কৃপায়ন ত্রিপুরা, ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের খাগড়াছড়ি সদর থানা কমিটির সভাপতি আকাশ ত্রিপুরা, পানছড়ি উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান রত্না তঞ্চঙ্গ্যা।
এদিকে আদিবাসী দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দাবিতে আদিবাসী ফোরাম খাগড়াছড়ির উদ্যোগে শহরের য়ংড বৌদ্ধ বিহার থেকে র্যালি বের হয়। পরে শহরের শাপলা চত্বরে সমাবেশ করে।
এতে সভাপতিত্ব করেন ফোরামের সভাপতি চাইথোয়াইং মারমা।