২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

চাইছিলেন একটু বৃষ্টি, কিন্তু টানাবর্ষণে ভেসে গেছে আমন

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মেহেরপুরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

চাইছিলেন একটু বৃষ্টি, কিন্তু টানাবর্ষণে ভেসে গেছে আমন

টানা বৃষ্টিতে মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার অনেক কৃষকের ফসল তলিয়ে গেছে।

মেহেরপুর প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 09 Oct 2023, 04:14 PM

Updated : 09 Oct 2023, 04:14 PM

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার চর কল্যাণপুর গ্রামের রুবেল হোসেনের পরিবার বাড়ির পাশের বিলে নয় বিঘা জমিতে আমন রোপণ করেছিলেন। ফসলের মাঝামাঝি সময়ে এসে একটু বৃষ্টির দরকার হয়। কিন্তু তখন কোনো বৃষ্টি ছিল না। ফলে ধানগুলো পুষ্ট হতে পারছিল না। সারাদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে একটু বৃষ্টির জন্য হাহাকার করেছিলেন তিনি।

কিন্তু শুক্র আর শনিবারের টানা বর্ষণে সেই বিল তলিয়ে গিয়ে ক্ষেতের আমন ধান ভেসে গেছে। সেই ক্ষেতের পাশে গিয়ে নিরবে অশ্রু ফেলেছেন রুবেল হোসেন।   

বলছিলেন, “১৫ দিন আগেও আমরা বৃষ্টির জন্য হাহাকার করেছি। দোয়া চেয়েছি আল্লাহ যেন একটু বৃষ্টি দেন। বৃষ্টি হইল। কিন্তু দুইদিনের বৃষ্টিতেই সব ডুবে গেল।

“৬ অক্টোবর রাত থেকে ৭ অক্টোবর রাত পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে মেহেরপুরের অনেক জায়গায় ফসলের মাঠ এভাবে ডুবে গেছে। বিলে যাদের জমি আছে, তাদের সবার অবস্থাই আমার মত”, যোগ করেন রুবেল হোসেন।

দুইদিনের টানা বৃষ্টিতে রুবেলের মত মেহেরপুরের অনেক কৃষকের ধান, মাসকলাই, মিষ্টি কুমড়াসহ ফসল ও সবজির ক্ষেত পানিতে ডুবে গেছে। কৃষকের স্বপ্ন এখন পানিতে ভাসছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিজয় কৃষ্ণ হালদার সাংবাদিকদের বলেন, “আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের ৬০ ভাগ ক্ষতি হয়েছে। পানি দ্রুত না সরাতে পারলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।

“সব মিলিয়ে কৃষি বিভাগ আনুমানিক ৩০০ কোটি টাকার ফসলহানির আশঙ্কা করছে। প্রাকৃতিক এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগ পরবর্তীতে ফসল উৎপাদনে নানামুখী পরামর্শ নিয়ে কৃষকের কাছে যাচ্ছে”, বলেন কৃষি কর্মকর্তা।

রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, গাংনী উপজেলার তেরাইল, দেবীপুর, চর কল্যাণপুর, চান্দামারী, পলাশীপাড়া, সদর উপজেলার রাইপুর গ্রামের অনেক মাসকলাই ক্ষেত পানিতে তলিয়ে আছে। এ ছাড়া কিছু মাঠের আমন ধান ও মৌসুমী সবজি ক্ষেত এখনও পানির নীচে।

চর কল্যাণপুর গ্রামের মাসকলাই চাষি হাবিবুর রহমান বলেন, “আমার এক বিঘার উপরে কালাই মাঠ পানির নীচে। সব নষ্ট হয়ে গেছে, কিছুই ঘরে উঠবে না। আমার সবমিলিয়ে আনুমানিক ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হল। বিলের ধারে ১০ বিঘা ধানও বৃষ্টিতে ডুবে গেছে।”

তেরাইল মাঠের মাসকলাই চাষি রহিদুল ইসলাম বলেন, তার বিলের ধারে সাত বিঘা কলাই ছিল। বেশি অর্ধেক পানির নীচে আর কিছু কলাইয়ের পাতা দেখা যাচ্ছে, তবে ফলন হবে না। বৃষ্টিতে তার মিষ্টি কুমড়ার ক্ষেতেও পচন ধরছে।

গাংনী উপজেলার ধানখোলা ইউনিয়নের চান্দামারী গ্রামের মহাম্মদ আলী বলেন, “আমার ছয় বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়ার চাষ ছিল। গাছে কুমড়াও বেশ ভাল ধরেছিল। কিন্তু দুদিনের বৃষ্টিতে কুমড়ায় পচন ধরেছে।”

একই গ্রামের কৃষক মহাম্মদ আলী অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ছয় বিঘা জমিতে মিষ্টি কুমড়া লাগিয়ে লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। এখন সেই স্বপ্ন পানির নীচে। 

দেবীপুর গ্রামের নাজির আলী বলেন, “একদিনের বৃষ্টিতে আমার উঠানসহ প্রাচীর ভেঙে পুকুরে চলে গেছে। দ্রুত ভাঙন ঠেকাতে না পারলে বাড়ি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছি। মাটি দিয়ে ভরাট করতে এক থেকে দেড় লাখ টাকা লাগবে।”

সদর উপজেলার রাইপুর গ্রামের রাইসুল হাজী বলেন, টানা বৃষ্টিতে যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা কল্পনার অতীত। কলাইয়ের পুরো মাঠ দুই হাত পানিতে ডুবে গেছে। আমন ধান এখন কান্নার কারণ হয়েছে। ডুবে যাওয়া এই ধানের ফলন হবে না।

গাংনী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসেন বলেন, “বৃষ্টিতে অনেক মাঠের ফসল ডুবে গেছে। কৃষি কার্যালয় থেকে ক্ষতির পরিমাণ জানার চেষ্টা করা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা হচ্ছে।”