Published : 08 Aug 2025, 01:17 PM
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হাইয়ার এডুকেশন একসিলারেশন অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন (হিট) প্রকল্পে অনিয়ম ও পক্ষপাতের অভিযোগ তুলেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষক।
এ প্রকল্পের গবেষণা প্রস্তাব বাছাই প্রক্রিয়ায় ‘নন-এক্সপার্টদের’ দিয়ে প্রস্তাব পর্যালোচনা করা এবং প্রেজেন্টেশন নেওয়া, রিভিউয়ারদের মতামত ও স্কোর উপেক্ষা করা, গবেষণা সাইটেশন (লেখার তথ্যসূত্র বা উৎস) ও সম্পকির্ত ফিল্ডে এক্সাপার্টদের মূল্যায়ন না করা, উচ্চ প্রোফাইলের গবেষকদের বাদ দিয়ে ‘নিম্ন প্রোফাইলের’ আবেদনকারীদের তহবিল দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে এ প্রকল্পের পূর্ণ মূল্যায়ন ও তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘বিক্ষুব্ধ শিক্ষক সমাজ’ ব্যানারে লিখিত বক্তব্যে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
হিট প্রকল্প একটি বড় পরিসরের উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি, যা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তত্ত্বাবধানে এবং বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত হয়।
এ প্রকল্পের একটি ‘রিভিউ বোর্ড’ থাকে, যাদের দায়িত্ব হল প্রকল্পের অধীনে জমা পড়া গবেষণা প্রস্তাব যাচাই-বাছাই করে কোনগুলো অর্থায়ন পাবে তা নির্ধারণ করা।
সেই রিভিউ প্রক্রিয়ার ‘অসঙ্গতির’ অভিযোগ তুলে শাহজালাল বিশবিদ্যালয়ের পুর ও পরিবেশ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, “রিভিউ বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া ছিল গোপনীয় ও অস্বচ্ছ। কারা রিভিউয়ার ছিলেন, কীভাবে নির্বাচিত হয়েছেন বা তাদের যোগ্যতা কী–এসব প্রকাশ করা হয়নি। এ প্রকল্পে অনেক শিক্ষক নিজ বিভাগের সহকর্মীদের প্রজেক্ট রিভিউ করেছেন, যা স্পষ্ট স্বার্থের দ্বন্দ্ব।”
তিনি বলেন, “ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীম উদ্দিন খান দাবি করেছেন, এ হিট প্রজেক্টে ‘ব্লাইন্ড পিয়ার রিভিউ’ (গবেষণাপত্র বা লেখার মান যাচাই করার জন্য লেখক এবং যিনি রিভিউ করছেন, তাদের মধ্যে পরিচয় গোপন রাখা) করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিটি আবেদনেই আবেদনকারীর নাম, বায়োডেটা ও গবেষণা প্রকাশনা সংযুক্ত ছিল, যা রিভিউয়াররা দেখতে পেয়েছেন। ফলে এটি কোনোভাবেই ব্লাইন্ড রিভিউ ছিল না।”
রিভিউয়ার কার প্রজেক্টে কত স্কোর দিয়েছেন এবং কেন দিয়েছেন–সেসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য বা রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়নি, যা পুরো প্রক্রিয়াকে ‘প্রশ্নবিদ্ধ করেছে’ বলে দাবি করছেন অধ্যাপক সাইফুল।
প্রেজেন্টেশন মূল্যায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হিট প্রকল্পের ৪.৬.১১ ধারা অনুযায়ী শুধু ইউন্ডো ৩ সাব-প্রজেক্টের ক্ষেত্রে প্রেজেন্টেশন গ্রহণযোগ্য ছিল, কিন্তু অন্যান্য উইন্ডোতেও প্রেজেন্টেশন নেওয়া হয়েছে, যা তার ভাষায় ‘নিয়মবহির্ভূত’।
“হিট প্রকল্পের মূল্যায়ন নির্দেশিকায় প্রেজেন্টেশনকে মূল্যায়নের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করার কোনো নির্দেশনা ছিল না। এরপরও অনেক মানসম্পন্ন গবেষণা প্রস্তাব কেবল উপস্থাপনার ভিত্তিতে বাদ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বোর্ডে উপস্থিত বিশেষজ্ঞরা উপস্থাপিত গবেষণার বিষয়ে অনভিজ্ঞ ছিলেন। তারা প্রাসঙ্গিক নয়–এমন প্রশ্ন করে গবেষকদের বিভ্রান্ত ও বিব্রত করেছেন।”
রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মো. আবুল হাসনাত বলেন, “একই বিভাগের একাধিক প্রকল্প প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হলেও শেষ পর্যন্ত শুধু একটি প্রকল্পকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, বাকিগুলোকে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়া বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও বাদ দেওয়া প্রকল্পগুলোর মানও ভালো ছিল। অথচ আবেদনকারীদের এই ধরনের নীতিমালার বিষয়ে আগে থেকে কোনো তথ্য বা জানানো হয়নি।”
তিনি বলেন, “হিট প্রকল্পে অনেক লো-প্রোফাইল আবেদনকারী ও গবেষককে প্রজেক্ট দেওয়া হয়েছে, যাদের উল্লেখযোগ্য গবেষণা বা আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা নেই। অনেকেরই পিএইচডি নেই। আবার যারা রিভিউ করেছেন, তাদের অনেকের প্রোফাইলও যাচাইযোগ্য নয়।”
জৈব প্রযুক্তি ও জিন প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “কিছু আবেদনকারী হয়ত আগেই বিশ্ব ব্যাংকের অন্য কোনো প্রকল্পে অনুমোদিত গবেষণা জমা দিয়েছিলেন। তারা সেই পুরনো গবেষণায় সামান্য পরিবর্তন করে নতুনভাবে আবার হিট প্রকল্পে জমা দেন; যা নৈতিক ও গবেষণানীতির পরিপন্থি।
প্রজেক্ট জমার শেষ সময় ছিল ১০ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু ‘কোনো ঘোষণা ছাড়া’ ১১ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ সময় বাড়ানো হয় বলে অভিযোগ করেন অধ্যাপক জাহাঙ্গীর।
তিনি বলেন, “এতে যারা সময়মত জমা দিয়েছেন, তারা প্রায় ১২ ঘণ্টা কম সময় পেয়েছেন, যা স্পষ্ট বৈষম্য এবং অনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করেছে।”
হিট প্রকল্পের রিভিউ ও ব্যবস্থাপনায় অর্থের অপচয়ের বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিভিন্ন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতাভিত্তিক রিভিউয়ার নিয়োগ ও অনৈতিকভাবে একাধিক প্রজেক্ট রিভিউ হয়েছে। এখানে অনেক রিভিউয়ারকে পরিচিতজনের প্রজেক্ট রিভিউ করানোর মাধ্যমে পক্ষপাতিত্ব করা হয়েছে। এছাড়া চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত প্রজেক্টগুলোর বাজেট থেকে ১০-১৫ শতাংশ অর্থ ইউজিসি কর্মীদের জন্য সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও প্রকিউরমেন্ট খাতে বাধ্যতামূলক রাখতে বলা হয়েছে, যা হিট প্রকল্পের ম্যানুয়ালে উল্লেখ ছিল না।
“এই নির্দেশনা এবং প্রক্রিয়া প্রমাণ করে যে, প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থের অনৈতিক অপচয় ও ব্যক্তিগত স্বার্থসাধনের জন্য এই ব্যবস্থাপনা পরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে।”
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষকরা তিনটি দাবি উত্থাপন করেন।
১. সুষ্ঠু প্রক্রিয়া অবলম্বন না করায় নির্বাচিত প্রজেক্টসমূহ বাতিল করতে হবে।
২. ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন, প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক আসাদুজ্জামান ও প্রকল্প পরামর্শক অধ্যাপক মোজাহার আলীকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাদের যথোপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
৩. নতুন করে যথাযথ প্রক্রিয়া অবলম্বন করে রিভিউ করে প্রজেক্ট নির্বাচন করতে হবে।
দাবি না মানা হলে উকিল নোটিস পাঠিয়ে আইনি প্রক্রিয়া অবলম্বন করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় সংবাদ সম্মেলনে থেকে।
শাহজালাল বিশবিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক রেজাউল করিম, পরিসংখ্যান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ও পলিটিক্যাল স্টাডিজের বিভাগের অধ্যাপক সাহাবুল হক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
এ বিষয়ে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক তানজিম উদ্দিনের মোবাইলে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।