২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯ আশ্বিন ১৪৩৩

হাওরে ‘দাওয়ামারির’ বদলে হাহাকার

বলা হয়, ধান কাটা বা ‘দাওয়ামারি’র এই সময়ে হাওর ঘুমায় না। কিন্তু এবার সেই আমেজ অনেকটাই উধাও।

হাওরে ‘দাওয়ামারির’ বদলে হাহাকার
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উদগল হাওর পাড়ের মাঠ বা খলায় ভেজা ধান শুকানো হচ্ছে। সামনে বিস্তৃত হাওরের জলরাশির নিচে রয়েছে পাকা ধান। ছবিটি বুধবার দুপুরে তোলা।

বিডিনিউজ২৪

শামস শামীম. হাওরাঞ্চল থেকে ফিরে. সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 07 May 2026, 01:56 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:34 PM

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার উদগল হাওর পাড়ের গ্রাম কল্যাণী। এই গ্রামের যেমন ছোট-মাঝারি কৃষক আছেন; তেমনি বেশ কয়েকজন অবস্থাপন্ন কৃষকও আছেন। অনিল চন্দ্র দাস মোটামুটি স্বচ্ছল কৃষক। ৬০ কিয়ারের (৩০ শতাংশে এক কিয়ার) উপরে জমি রয়েছে তার। গত বছর ফসল ভালো হয়েছিল; এক হাজার ৩০০ মণের মত ধান ঘরে তুলেছিলেন তিনি।   

এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। বুধবার ভর ‘দাওয়ামারির’ সময়ও অনিলের বাড়ি গিয়ে বৈশাখের আমেজ পাওয়া গেল না। 

দাওয়ামারি হল হাওর অঞ্চলের বোরো ধান কাটার উৎসব। এ সময় হাওরে-হাওরে পতিত জমিতে ধান কাটার পর সিদ্ধ করে শুকানোর জন্য বিশেষ মাঠ প্রস্তুত করা হয়, যাকে বলে ‘খলা’।

কিন্তু অনিলের বাড়ির খলায় এবার সেই কর্মব্যস্ততা নেই। বাড়ি-ঘর-উঠোনজুড়ে ধানের ম ম গন্ধ নেই, হাঁকডাক নেই। অতিবৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতায় ফসল কাটার আগেই ডুবে গেছে হাওরের ধানের জমি।   

মন খারাপ করে অনিল চন্দ্র দাস বলছিলেন, “৬০ কিয়ারের মধ্যে ৪০ কিয়ার মত কাটতে পারছি। বাকি পানির তলে। যেটা কাটতে পারছি তারও একটা অংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ধান কাটা বাদে খরচ অইছে তিন লাক টেকা। সব মিলিয়ে কম করে হলেও এক হাজার ২০০ মণ ধান পাওয়ার কথা। ৩০০ মণও তো পাইছি না।”

খলায় থাকা ধানের দুই রং। হলুদ অংশে ক্ষেত থেকে কাটা পাকা ধান। আর বাকি অংশে বিবর্ণ ভেজা ধান। সব খলাতেই এমন ভেজা ধানের পরিমাণ বেশি।

খলায় থাকা ধানের দুই রং। হলুদ অংশে ক্ষেত থেকে কাটা পাকা ধান। আর বাকি অংশে বিবর্ণ ভেজা ধান। সব খলাতেই এমন ভেজা ধানের পরিমাণ বেশি।

যাদের ৫ থেকে ৪৯ শতক জমি আছে, তেমন কৃষক পরিবারগুলোকে সরকারি শুমারিতে ‘প্রান্তিক’, ৫০ থেকে ২৪৯ শতক জমি থাকলে ‘ক্ষুদ্র’, ২৫০ থেকে ৭৪৯ শতক জমি থাকলে ‘মাঝারি’ এবং ৭৫০ শতকের বেশি জমি থাকলে ‘বৃহৎ’ কৃষক পরিবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

জগৎ রায় কল্যাণী গ্রামের একজন ‘ক্ষুদ্র’ কৃষক। তার নিজের জমি বলার মত না। তাই উদগল হাওরে পাঁচ কিয়ার জমি বর্গা নিয়েছিলেন। 

তিনি বলছিলেন, “তিন কিয়ার কাটছি। দুই কিয়ার পানির তলে। তিন কিয়ারের অর্ধেক পইচ্যা নষ্ট অইছে।”

জগৎ রায়ের পরিবারের কৃষিই সম্বল। তার পরিবারের কেউ ব্যবসা বা চাকরিতে নেই। ফলে এবার সংসার চালানোর জন্য তাকে বেশ বেগ পেতে হবে। 

উদগল হাওর পাড়ের ‘বৃহৎ’ কৃষক অনিল দাস এবং ‘ক্ষুদ্র’ কৃষক জগৎ রায় দুজনই বলছিলেন, তাদের হাওরে কমবেশি সবারই একই অবস্থা। কেউ একটু বেশি ধান পেয়েছে, কেউ একটু কম। কিন্তু সবাই ক্ষতিগ্রস্ত। গড়ে কেউ অর্ধেকের বেশি ধান গোলায় তুলতে পারবেন না। 

দিরাই উপজেলা সদর থেকে শ্যামারচরের দিকে যে সড়ক গেছে, সেখানে ভেজা ধান রোদে দিয়েছেন এই দম্পতি। তারা পরীক্ষা করে দেখছেন, ভেজা ধানের কতটুকু খাবার উপযোগী রয়েছে।

দিরাই উপজেলা সদর থেকে শ্যামারচরের দিকে যে সড়ক গেছে, সেখানে ভেজা ধান রোদে দিয়েছেন এই দম্পতি। তারা পরীক্ষা করে দেখছেন, ভেজা ধানের কতটুকু খাবার উপযোগী রয়েছে।

রোদেও মলিন কৃষকের মুখ

দিরাই উপজেলা সদর থেকে শ্যামারচরের দিকে যে সড়ক গেছে। সেটা ধরে একটু সামনে এগোলেই ভরারগাঁও সেতু। তার সামনে সড়কের বাম অংশে উদগল হাওর জলে থৈ থৈ করছে। 

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখানকার এক হাজার ৩১৩ হেক্টর জমিতে এবার বোরো চাষ হয়েছে। দিরাই ও শাল্লা উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত এই হাওর। 

বুধবার দুপুরে গিয়ে দেখা গেল, হাওরের বাম তীরে অনেকে খলা করেছেন। সেখান ভেজা ধান রোদে শুকাচ্ছেন মলিন মুখের কৃষক। খলার কাছে চলে এসেছে পানি। 

কৃষকরা জানান, এক সপ্তাহ ধরে এই অবস্থা। এক সপ্তাহ আগে যারা ধান কাটতে পরেছিলেন তারাও রোদের অভাবে এতদিন ধান শুকাতে পারেননি। দুদিন ধরে কিছুটা রোদ ওঠায় এখন অঙ্কুর গজানো ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন তারা।  

এই হাওরের সড়ক ধরে মিলনবাজার হয়ে জয়পুর পর্যন্ত গিয়ে দেখা গেল, ছায়ার হাওর সাগরে রূপ নিয়েছে। পানি ছাড়া কিছু দেখা যায় না। ছায়ার হাওরটি সুনামগঞ্জের শাল্লা, কিশোরগঞ্জের ইটনা এবং নেত্রকোণার খালিয়াজুরি উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত। 

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাওরের দিরাই অংশে এক হাজার ৩১৩ হেক্টর, শাল্লা উপজেলায় চার হাজার ৬৩৮ হেক্টর, খালিয়াজুরি অংশে ৯০০ হেক্টর এবং কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় ১৫০ হেক্টর জমিতে এবার বোরো চাষ হয়েছে। 

দিন দশেক আগেও এ জায়গায় এসে হলুদ ধানের মনমতানো ঢেউ দেখা গিয়েছিল। আর এখন সেখানে রূপালি জলের ঢেউ। কচুরিপানা ভেসে যাচ্ছে। হাওরের পাড়ে দাঁড়ালে নাকে এসে লাগছে পচা ধানের গন্ধ।

কৃষকরা জানালেন, উদগল ও ছায়ার হাওরের জমি ২৬ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টিতে তলিয়ে গেছে। 

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা সুনামগঞ্জে ১৯৩টি ছোট-বড়ো হাওর ও বিলে বোরো আবাদ হয়। চলতি বছর জেলায় দুই লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর আবাদ হয়েছে। 

এর মধ্যে হাওরে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর ও নন-হাওরে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ১৪ লাখ টন, যার বাজার মূল্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। 

•    জেলায় ‘বৃহৎ’ কৃষকের সংখ্যা ১২ হাজার ২৫১ জন। ‘মাঝারি’ কৃষক আছেন ৬৭ হাজার ৮৯৮ জন। এক লাখ ৪৬ হাজার ৮৪০ জন ‘ক্ষুদ্র’ কৃষক। আর ‘প্রান্তিক’ কৃষকের সংখ্যা এক লাখ দুই হাজার ৫৮৪ জন। পাঁচ শতকের নিচে যাদের জমি, তারা ‘ভূমিহীন’ কৃষক। তাদের সংখ্যা ৪৯ হাজার ১২৪ জন।

•    কৃষি বিভাগের হিসাবে, সুনামগঞ্জ জেলায় ২০ হাজার ১২০ হেক্টর আবাদকৃত জমি ডুবে নষ্ট হয়েছে। 

•    ৫০ হাজার ৯১৩টি কৃষক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্য সংখ্যা প্রায় দুই লাখ ৫৭ হাজার ৪৬০ জন। 

•    পাউবো জানিয়েছে, চলতি বছর হাওরে ৭১৮টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছে। খরচ হয়েছে প্রায় দেড়শ কোটি টাকা।

•    গত বছর এপ্রিল মাসে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১১০ মিলিমিটার; আর এ বছর এই সময়ে হাওরাঞ্চলে ২০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। এ কারণেই হাওরে জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হয়েছে। 

‘দাওয়ামারি’র আমেজ নেই

দেশের খাদ্যশস্যের একটি বড় জোগান আসে হাওর থেকে। এ জমির পুরোটাই এক ফসলি। এই ফসলের ওপর নির্ভর করেই হাওরের কৃষক সারা বছরের খাওয়া-পরা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, সামাজিক অনুষ্ঠানাদি চালায়।

তাই ফসল কাটার সময় হলে পরিবারের বাইরে থাকা সদস্যরাও বাড়ি ফিরে আসেন। দিনে ধান কাটা, শুকানোর পর রাতভর উঠানে গৃহিণীরা ধান সিদ্ধ করেন। বাড়ি ভর্তি থাকে অন্য জেলা থেকে আসা শ্রমিকে, তাদের বলে ‘ভাগালো’।

বলা হয়, ধান কাটা বা ‘দাওয়ামারি’র এই সময়ে হাওর ঘুমায় না। কিন্তু এবার সেই আমেজ অনেকটাই উধাও। 

জলে ভাসছে চার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত ছায়ার হাওর। তার নিচে কৃষকের বছরের একমাত্র বোরো ফসল।

জলে ভাসছে চার উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত ছায়ার হাওর। তার নিচে কৃষকের বছরের একমাত্র বোরো ফসল।

ছায়ার হাওরের আনন্দপুর গ্রামের কৃষক কালাই মিয়া তালুকদার এবার নিজের ২২ কিয়ার জমি চাষ করেছিলেন। ধান পাওয়ার কথা ছিল ২৫০ মণ। কিন্তু ৫০ মণ ধানও ঘরে তুলতে পারেননি তিনি। তার প্রতি কিয়ারে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। 

তিনি বলেন, “আমি বিরাট ক্ষতির মুখে। ব্যবসা বা চাকরিজীবী কেউ নাই। আমরার কৃষিই ভরসা।”

মুক্তারপুর গ্রামের কৃষক মাখন চন্দ্র দাস ৫০ কিয়ার জমি চাষ করেছিলেন ছায়ার হাওরে। এর মধ্যে অর্ধেক তলিয়ে গেছে। বাকি যা কেটেছিলেন, তার ৩০-৪০ শতাংশ পচে নষ্ট হয়েছে।

তিনি ১০০ মণ ধানও পাননি। কৃষির পাশাপাশি ছোটখাট ব্যবসা আছে তার। ব্যবসার বিনিয়োগ দিয়েই চাষাবাদ করেছিলেন।

অপরদিকে আনন্দপুর গ্রামের ক্ষুদ্র চাষি প্রাণেশ দাস ১৫ কিয়ার ক্ষেত করেছিলেন বর্গা নিয়ে। কৃষিই তার একমাত্র পেশা। তার সব জমি তলিয়ে গেছে। প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছে তার। এবার নিঃস্ব। ব্যবসা বা পরিবারের কেউ চাকরিজীবী নাই। তাই খোরাকি নিয়ে চিন্তিত তিনি।

প্রাণেশ দাস বলেন, “আমি জমিনে পোছ দিতাম পারছি না। সব তলাইছে। কীভাবে চলবো পাঁচজনের সংসার?”

লৌলারচর গ্রামের সাবেক মেম্বার ও ছায়ার হাওরের কৃষক রূপ মিয়া বলেন, “পাঁচ কিয়ারের মধ্যে আড়াই কেয়ার কাটছি। নষ্ট অইছে অর্ধেক। কাটা ধানও অর্ধেক পচে নষ্ট অইছে।”

তার পরিবারেও কেউ চাকরীজীবী নেই। নিজের কৃষি আয়েই সংসার চলে।

দুদিনের কিছুটা রোদে মাথা তুলেছে ছায়ার হাওরে পানির নিচে থাকা ধান। সেই বিবর্ণ ধানই কেটে বাড়ি নিচ্ছেন কৃষক; যদি কিছুটা ধান মেলে এই আশায়।

দুদিনের কিছুটা রোদে মাথা তুলেছে ছায়ার হাওরে পানির নিচে থাকা ধান। সেই বিবর্ণ ধানই কেটে বাড়ি নিচ্ছেন কৃষক; যদি কিছুটা ধান মেলে এই আশায়।

‘বউ চাকরি না করলে চলা মুশকিল হইত’

দিরাই উপজেলার নাছিরপুর গ্রামের উদগল হাওরের কৃষক আলী নূর ও তার স্ত্রী সৈয়দা নূরকে মিলনবাজার সড়কে পচা ও অঙ্কুর গজানো ধান শুকাতে দেখা যায়। লম্বা অঙ্কুর গজিয়েছে কাটা ধানে। মাড়াই করা ধানে অঙ্কুর গজানোর পর শুকাতে দেওয়ার পর ভেঙে যাচ্ছে। তারপরও ফসলের মায়ায় তীব্র গরমেও স্বামী-স্ত্রী সড়কে এসে পচা ধান বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।

আলী নূর বলেন, “নয় কিয়ার খেত করছিলাম। চাইর কিয়ার কাটছি। বাকি ধান ডুবছে। হাইব্রিড ধান ‘ঝলক’ ভাইস্যা গেছে। যা কাটছিলাম খেতো ঝরছে। তারপর গ্যাড়া আইয়া নষ্ট অইছে।”

তিনি বলেন, “আর কোনো কাজ জানি না। কৃষিই ভরসা। হাতের জমা টাকা দিয়া চাষ করছিলাম। নিঃস্ব অইগিছি। যা কাটছি তা দিয়া খোরাকিও অইতো না।”

একই হাওরের দিরাই উপজেলার কল্যাণী গ্রামের প্রান্তিক চাষি অধীর দাস ২৪ কিয়ার ক্ষেত বর্গা চাষ করেছিলেন। মালিককে কিয়ার প্রতি দিয়েছেন সাত থেকে আট হাজার টাকা। নিজের খরচ হয়েছে কিয়ার প্রতি পাঁচ হাজার কাটার আগ পর্যন্ত। ১২ কিয়ার কেটেছেন, ১২ কিয়ার ডুবছে।

যা কাটছেন তারও ছয় আনা পচে নষ্ট হয়েছে। ধান কাটতে গিয়ে ‘বেফারিকে’ (শ্রমিক) কিয়ার প্রতি তিন মণ ধান, নগদ ২০০ টাকা ও তিন কেজি চাল দিতে হয়েছে বলে জানান অধীর দাস।

তবে তিনি বৈশাখের আগেই দেশি ধান লালডিঙ্গা কেটে তুলতে পেরেছিলেন। তাতে কিয়ার প্রতি সাত থেকে আট মণ ধান পাওয়া গেছে। 

তার স্ত্রী সুলেখা দাসকে পচা ধান শুকাতে ও খড় শুকাতে দেখা গেল খলায়।

একই হাওরের হাসিমপুর গ্রামের কৃষক নিরাপদ দাস একজন মাঝারি চাষি। তার স্ত্রী স্কুলে দপ্তরির কাজ করেন। এবার ১৬ কিয়ার জমি করেছিলেন। এর মধ্যে তলিয়েছে অর্ধেক। বাকি অর্ধেকের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের পর পচে অর্ধেক নষ্ট হয়ে গেছে। 

সঞ্চয় থেকেই প্রায় দেড় লাখ টাকায় জমি বর্গা নিয়ে আরো লাখ টাকা খরচ করে চাষ করেছিলেন নিরাপদ। কিন্তু তার অর্ধেক ক্ষেতের মধ্যে কাটা অর্ধেকেরও ছয় আনা পচে নষ্ট হয়ে গেছে। 

তিনি বলেন, “বউ দপ্তরির কাজ না করলে চলা মুশকিল হইত।”

কৃষি বিভাগের তথ্য নিয়ে ক্ষোভ

মঙ্গলবার জেলা সার্কিট হাউসে একটি অনুষ্ঠানে কৃষি সম্প্রাসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক হাওরে ৮০ ভাগ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে বলার পর ক্ষোভ জানান বিএনপির স্থানীয় নেতারা। তখন সেখানে কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবও ছিলেন।  

কৃষি বিভাগ থেকে বুধবার জানানো হয়, হাওরে ৮২.২৯০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। এ পর্যন্ত হাওরে এক লাখ ৩৬ হাজার এবং নন-হাওরে ৪৪.৮৫৪ ভাগ বা ২৬ হাজার ১২১ হেক্টর কাটা হয়েছে। গড় কর্তনের পরিমাণ ৫২.৫৩৩ শতাংশ।

সেখানে উপস্থিত জেলা বিএনপির সদস্য ও সরকারি আইনজীবী সেরে নূর আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গতকাল কৃষি, দুর্যোগ মন্ত্রী, অর্থ উপদেষ্টা, মুখ্যসচিব, বিভাগীয় কমিশনারের সামনে কৃষি অফিসার হাওরের ক্ষতির যে তথ্য দিয়েছেন তা সঠিক নয়। আমরা প্রতিবাদ করেছি। হাওরে এখন পর্যন্ত অর্ধেকের বেশি ক্ষতি হয়েছে। প্রকৃত চিত্র না পাঠানো হলে আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হবে।”

সুনামগঞ্জ কৃষি সস্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, “রোদ ওঠায় কৃষকরা কাটা ও মাড়াই করা ধান শুকাচ্ছেন। যে এলাকায় জমি ভাসছে তাও কাটার চেষ্টা করছেন। ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য পেতে আরো সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে।”

সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, “প্রতিটি হাওরে এবার ক্ষতি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী গতকাল তিন মন্ত্রী, মুখ্যসচিবসহ সরকারের বড়ো একটা ইউনিট পাঠিয়েছেন হাওরের দুর্যোগ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। সহাযতার উদ্বোধনও করা হয়েছে। 

“কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন ক্ষযক্ষতির যে পরিসংখ্যান দিযেছে তা সঠিক নয়। আমরা সঠিক তথ্য পাঠানোর কথা বলেছি। কিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের আগামী ফসল উঠানো পর্যন্ত সহায়তা করা যায় সরকারের উপর মহলে কথা বলেছি।”

আরও পড়ুন:

করচার হাওর: এক জায়গায় ক্ষয়-ক্ষতির দুই চিত্র

হাওর: অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হচ্ছে কাটা ধান

হাওরে কৃষকের স্বপ্ন ডুবেছে কতটা?

হাওরে ফসলডুবি: যত্রতত্র বাঁধ এখন গলার কাঁটা

'খোরাকি'র আশায় কাঁচা ধানই সিদ্ধ করছে হাওরের কৃষক

'আউরে আমার সব ধান ডুবি গ্যাছে, খোরাকির বুঝও নাই'

'আউরে আমার সব ধান ডুবি গ্যাছে, খোরাকির বুঝও নাই'