Published : 21 Apr 2026, 05:09 PM
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেরপুর-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হয়ে দুবার পরাজিত হন। তবু হাল ছাড়েননি। অবশেষে সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সংসদে যাচ্ছেন।
সোমবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সংরক্ষিত নারী আসনে ৩৬ জনের তালিকা ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
পরোক্ষ ভোটের এই নির্বাচনে পদ্ধতিগত কারণে ভোটাভুটির দরকার হবে না। অর্থাৎ, দল যাদের মনোনয়ন দিচ্ছে, বাছাইয়ে বাদ না পড়লে তাদের এমপি হওয়া কার্যত নিশ্চিত।
বিএনপির এই মনোনয়নে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া তিন নারী আছেন, তাদেরই একজন সানসিলা জেবরিন, যিনি ‘ডাক্তার প্রিয়াঙ্কা’ নামেই বেশি পরিচিত।
তিনি শেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হযরত আলী এবং নিলুফা খানম দম্পতির মেয়ে। তার স্বামী রাহেমীন চৌধুরী পেশায় একজন আইনজীবী।
এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা ধানের শীষের প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। নির্বাচনি প্রচারে ভোটের মাঠ চষে বেড়িয়েছেন তিনি।
কিন্তু নির্বাচনে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে নামেন জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) শফিকুল ইসলাম মাসুদ। এতে বিএনপির ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার কারণে নির্বাচনে জয় পান জামায়াতের প্রার্থী হাফেজ রাশেদুল ইসলাম।
তবে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে প্রিয়াঙ্কা জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও বর্তমান জেলা প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তুলে ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশনে লিখিত আবেদন করেন।

এর আগে, ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন প্রিয়াঙ্কা। সেময় হযরত আলী কারাবন্দি থাকায় তার পরিবর্তে মেয়ে প্রিয়াঙ্কাকে মনোনয়ন দিয়েছিল বিএনপি। তখন ‘সর্বকনিষ্ঠ’ প্রার্থী হয়েও তিনি সাহসী ভূমিকা পালন করায় ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রিয়াঙ্কা আওয়ামী লীগ দুর্গের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের হামলা-ভাঙচুর উপেক্ষা করে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নির্বাচনি প্রচার চালিয়ে গেছেন।
তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ও আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাবেক হুইপ ও এমপি আতিউর রহমান আতিক ও তার সমর্থকদের বিরুদ্ধে তার গাড়িবহরে হামলা, নেতাকর্মীদের ওপর আক্রমণ এবং মিথ্যা মামলার অভিযোগের বিষয়গুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকে তুলে ধরে এলাকার মানুষের প্রশংসা কুড়ান।
অনিয়ম, কারচুপি আর দলীয় নেতাকর্মীদের উপর হামলার অভিযোগ এনে ভোটের দিন দুপুর ১২টায় তিনি নির্বাচন বর্জন করেন। পরে ভোট গণনা শেষে দেখা যায়, তিনি ৩৫ হাজার ভোট পেয়েছেন।
৩২ বছর বয়সী সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা এমবিবিএস পাশের পর লন্ডন থেকে এমআরসিএস ডিগ্রি অর্জন করেছেন। পেশাগত জীবনে তিনি চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি অনলাইন স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গেও যুক্ত।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রিয়াঙ্কার নামে বর্তমানে কোনো মামলা নেই এবং তার নামে ব্যাংক ঋণেও নেই ।
কর প্রদানেও তিনি নিয়মিত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৬৩ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৩ টাকার রিটার্ন দাখিলের বিপরীতে তিনি ২৪ হাজার ৯১০ টাকা আয়কর প্রদান করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি শেরপুরের শহর, ও প্রত্যন্ত গ্রাম-গঞ্জের বিভিন্ন স্থান, শ্রমিকের কর্মস্থল ও কৃষকের মাঠে নিয়মিত গণসংযোগ করেন।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনে সরাসরি ভোটে পরাজিত হলেও তিনি থেমে থাকেননি। সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন পেতে ঢাকায় দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ অব্যাহত রাখেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি এবার সংরক্ষিত নারী আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেন।

ডাক্তার সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া তিনি আমার মনের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। আমার দীর্ঘদিনের কাজের মূল্যায়ন করা হয়েছে।
“প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমার ওপর আস্থা ও ভরসা রেখে নতুন দায়িত্বটা দিয়েছেন। আমি তা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করব। আমার অবহেলিত শেরপুর জেলার মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর লক্ষ্যে কাজ করব।”
তিনি আরও বলেন, “গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এলাকার মানুষকে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা শতভাগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করব।
“বিশেষ করে শেরপুর জেলার অবকাঠামগত উন্নয়ন যথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল স্থাপন এবং শেরপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ বাস্তবায়ন করার আপ্রাণ চেষ্টা করব।”
তাকে মনোনয়ন দেয়ায় শেরপুর জেলা বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীও দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
শেরপুর জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও শেরপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ এবিএম মামুনুর রশিদ পলাশ বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যোগ্য মানুষকে মনোনয়ন দিয়েছেন। তিনি শেরপুরের মানুষের মৌলিক দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হবেন বলে মনে করি। যেহেতু শেরপুর সদর আসনে বিএনপির কোনো এমপি নেই। তাই এ মনোনয়ন খুবই সময়োপযোগী হয়েছে।
আরও পড়ুন
শেরপুর-১ আসনের ফল নিয়ে 'আপত্তি', আদালতে যাবেন বিএনপির প্রার্থী
শেরপুর-১: বিএনপির ‘কনিষ্ঠ’ প্রিয়াঙ্কার সামনে ‘স্বতন্ত্রের বাধা’, মরিয়া জামায়াত