Published : 29 Sep 2024, 10:49 PM
ভয়াবহ বন্যার প্রভাবের মধ্যেই এবার ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার নয়টি ইউনিয়নের ছয়টিতেই দেখা দিয়েছে নদী ভাঙন।
গত তিন সপ্তাহে মুহুরী, ছোট ফেনী ও কালিদাস পাহালিয়া নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়েছে অন্তত দুই শতাধিক পরিবার।
ছোট ফেনী নদীতে নির্মিত ‘মুছাপুর রেগুলেটর’ বন্যায় ভেঙে বিলীন হওয়ায় সাগরের পানি ভেতরে ঢুকে এবং বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর বাড়িঘর ও সড়কের মাটি নরম হয়ে নতুন করে বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি।

ছোট ফেনী নদী ও কালিদাস পাহালিয়া নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নদীর তীরে বসবাসকারী অন্তত কয়েক হাজার পরিবার দুঃশ্চিন্তায় রয়েছে।
অনেকেই অন্যত্র চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছেন। বন্যা ও সাগরের পানির চাপে গত ২ সেপ্টেম্বর উপজেলার উত্তর চর সাহাভিকারী এলাকায় গ্রামীণ সড়কের একটি সেতু ভেঙে বদর মোকাম খালে পড়ে গেছে।
সাগরের পানি ঢোকায় এবং বন্যার পানি কমে যাওয়ার পর বাড়িঘর ও সড়কের মাটি নরম হয়ে নতুন করে উপজেলার চর দরবেশ, চর চান্দিয়া, চর মজলিশপুর, বগাদানা, নবাবপুর ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সোনাগাজী উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর এলাকার বাসিন্দা দুই বোন শাহীনা আক্তার ও লাইলী আক্তার। কালিদাস পাহালিয়া নদীর ভাঙনে হারিয়েছেন তাদের বসতঘর।
সাংবাদিক দেখে এগিয়ে এসে তারা বলেন, দুই বোনের কোনো জমিজমা না থাকায় দীর্ঘদিন কাটা মোবারকঘোনা-রঘুনাথপুর সড়কের পাশে বসবাস করছেন তারা। গত সপ্তাহ তিনেক আগে ঘরের একাংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এর কিছু দিন পর পাশের রাস্তাও ভেঙে গেছে।
ঘরের কিছু জিনিসপত্র অন্য এক বাড়িতে নিয়ে রেখেছেন তারা।

একই গ্রামের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম বলেন, “বন্যা পরবর্তী সময় যেন আমাদের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর তীরে বাড়ি থাকায় সব সময় ভয়ে ভয়ে বসবাস করছি। প্রতিটি মুহূর্তে যেন সংকেত দিচ্ছে, কখন বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। আমরা পরিবার নিয়ে কোথায় আশ্রয় নেব?”
একই ইউনিয়নের মজুপুর গ্রামের বাসিন্দা নুর মোহাম্মদ বলেন, “বন্যার পর পানি নেমে যাওয়ায় কালিদাস পাহালিয়া নদীর ভাঙনে তার বাড়ির তিনটি পরিবার নিঃস্ব হয়ে গেছেন। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে তারা এখন মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। কেউ তাদের কোনো খোঁজও নিচ্ছেন না।”
সোনাগাজী উপজেলার চর দরবেশ ইউনিয়নের উত্তর চর সাহাভিকারী গ্রামের বাঁশপাড়া এলাকায় বাসিন্দা আয়েশা আক্তার। বন্যার পানিতে গত ২২ অগাস্ট থেকেই ঘরছাড়া ছিলেন তিনি। ছোট ফেনীর ভাঙনে তার ঘরটি বিলীন হয়ে যায় নদীগর্ভে।
আয়েশা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামীর অসুস্থতার কারণে সংসারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। পরে তিনি বাবার বাড়ির জায়গায় ঘর তোলে বসবাস করছিলেন। বন্যার পর ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে সেই ঘরটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কোথায় আশ্রয় নেবেন, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।
উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জহিরুল আলম বলেন, বন্যার পর পানি কমে যাওয়ায় তার ইউনিয়নের পাঁচটি ওয়ার্ডে কালিদাস পাহালিয়া ও মুহুরী নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সুলতানপুর, রঘুনাথপুর, ফতেহপুর, মজুপুর ও মোবারকঘোনা এলাকার বাসিন্দারা।
গত দুই সপ্তাহের ভাঙনে অন্তত ২০০ পরিবার বাড়িঘর হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন।
পাশাপাশি রাস্তাঘাট ভেঙে এক এলাকার সঙ্গে অন্য এলাকার মানুষের যাতায়াত ও যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। তার ইউনিয়নের বাসিন্দাদের নদী ভাঙন থেকে রক্ষা করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সুদৃষ্টি কামনা করেন।

উপজেলার চরদরবেশ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ বলেন, তার ইউনিয়নের কয়েকটি এলাকায় ছোট ফেনী নদীর ভাঙনে বাড়ি-ঘর বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, নদী ভাঙন ঠেকানোর একমাত্র সমাধান হল নদীতে চ্যানেল খনন করা। তাহলে পানির গতিপথ ঠিক থাকবে।
তা না হলে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে ঘর-বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাবেন বলে তার দাবি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সেকশন কর্মকর্তা এ এম রকি বলেন, “সোনাগাজী উপজেলার নদী ভাঙনের স্থানগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
সোনাগাজী উপজেলার ইউএনও কামরুল হাসান বলেন, “বন্যায় ভেঙে যাওয়া মুছাপুর রেগুলেটর পুনর্নির্মাণ ও সাহেবেরঘাট সেতুর ভেঙে যাওয়া সংযোগ সড়কের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি।
“এরই মধ্যে ঘরবাড়ি বিলীন হওয়া পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। নদী ভাঙন রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়ে আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেব।”
জেলা প্রশাসক মোসাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, “বন্যা পরবর্তী পুনবার্সনের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কাজ চলমান রয়েছে। নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার দাঁড়াবে।”