Published : 16 Jun 2026, 09:25 PM
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, হামলায় অংশগ্রহণ এবং মদদ দেওয়ার অভিযোগে ১২ শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
২০২৪ সালের ১৪, ১৫ ও ১৭ জুলাইয়ে ক্যাম্পাসে সংগঠিত বিভিন্ন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের করা কমিটি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও সুপারিশ নিয়ে সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের কাউন্সিল কক্ষে বৈঠকে বসে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। প্রায় ১২ ঘণ্টার বৈঠকে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৈঠকে সাত শিক্ষক ও এক কর্মকর্তাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোর সাড়ে ৪টার দিকে উপাচার্যের সম্মেলন কক্ষে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে বৈঠকের সিদ্ধান্তের বিষয়টি জানান সিন্ডিকেট সভাপতি ও উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান।
তিনি বলেন, “শিক্ষক ও কর্মকর্তার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হয়েছে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না পান এবং কোনো অপরাধী দায়মুক্তি না পান।”
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে।
নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে পদাবনতি দিয়ে প্রভাষক করা হয়েছে। একই বিভাগের অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে।
এ ছাড়া, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল হোসেন তালুকদারের দুই বছরের বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) বাতিল করে নিম্নতর বেতনস্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনেরও দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক আলমগীর কবিরের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছর তিনি কোনো প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসানের বেতনও প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে দুই বছর পর তিনি পুনরায় পদোন্নতির জন্য আবেদন করতে পারবেন। একই সঙ্গে পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে তাকে।
একই বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তার বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন শিকদারের বেতনও প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে আনা হয়েছে। পাশাপাশি দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রেখে তাকেও পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান জানান, সাবেক উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন দ্বিতীয় গ্রেডে অবনমিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হোসনে আরাকে সতর্ক করা হয়েছে।
পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্ক করার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
তবে তদন্ত শেষে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ) সহকারী অধ্যাপক পলাশ সাহা, পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ তারেক, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম খোন্দকার, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ছায়েদুর রহমান ও সহযোগী অধ্যাপক মনির উদ্দিন শিকদার, অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ার খসরু পারভেজ অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
অপরদিকে দুই কর্মকর্তার মধ্যে একজনকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী রেজিস্ট্রার করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে দুই বছর পর পুনরায় পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য বলেন, প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল আলম, সাবেক উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মনজুরুল ইসলাম এবং সাবেক কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক রাশেদ আখতারের ভূমিকা পৃথকভাবে তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট। এ লক্ষ্যে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি ‘স্ট্রাকচারাল কমিটি’ গঠন করা হবে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাদের সংশ্লিষ্টতা ও ভূমিকা বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
১৪ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের সামনে, ১৫ জুলাই তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে এবং উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ১৭ জুলাই বিকাল ৪টার মধ্যে হল ছাড়ার নির্দেশ দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপাচার্যসহ সিন্ডিকেট সদস্যদের অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়।