১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

গর্তে পড়ে মৃত্যু: অশ্রুসিক্ত নয়নে সাজিদকে শেষ বিদায় জানাল হাজারো মানুষ

শুক্রবার সকালে নেককিড়ি কবরস্থানের সামনে ফাঁকা মাঠে জানাজা শেষে সাজিদের মরদেহের দাফন সম্পন্ন হয়।

রাজশাহী প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 12 Dec 2025, 01:24 PM

Updated : 26 Aug 2026, 05:17 PM

রাত থেকেই রাজশাহৗর পাচন্দর ইউনিয়নের কোয়েলহাট পূর্বপাড়া যেন শোকে স্তব্ধ। বেদনায় ভারী হয়ে ওঠা গ্রামের বাতাসে বারবার ভেসে আসছিল মসজিদের মাইকের ঘোষণা- রাকিব উদ্দীনের দুই বছরের শিশু সাজিদ আর নেই।

আর শুক্রবার সকাল থেকেই গ্রামের রাস্তা ধরে ধীর পায়ে মানুষ আসছিল সাজিদের বাড়ির দিকে- কারো গায়ে পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি, কেউ হালকা শীতের পোশাক জড়িয়ে। 

সকালের দিকেই নেককিড়ি কবরস্থানের সামনে বিশাল ফাঁকা মাঠে সাজিদের জানাজায় নেমে আসে মানুষের ঢল। গ্রামের বৃদ্ধ, মাঝবয়সী মানুষ থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া ছেলেরা- সবার চোখেই জল। 

সবাই একটিবার দেখতে চায় সেই নিষ্পাপ মুখটি; যে মুখে প্রতিদিন ছিল হাসি, আজ সেখানে নিথর নীরবতা।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে যখন সাদা কাপড়ে মোড়ানো ছোট্ট দেহটি মাঠে আনা হলো, মুহূর্তেই কান্নার রোল ছড়িয়ে পড়ে। 

ছুটে যেতে চাইছিলেন সাজিদের মা রুনা খাতুন চিৎকার করে আহাজারি করছিলেন। স্বজনেরা তাকে ধরে রেখেছিল, কিন্তু থামাতে পারেনি তার হৃদয়বিদারক কান্না।

পরে সাজিদের জানাজার নামাজ পড়ান কাজী মাওলানা মিজানুর রহমান। তাকবির শেষে দোয়ার সময় ছোট্ট শিশুটির জন্য হাজারো হাত একসঙ্গে উঠল আকাশের দিকে। 

সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে জানাজা শেষে তাকে নেককিড়ি কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজা শেষে যখন ছোট্ট শিশুটির খাটিয়া কবরের দিকে নেওয়া হচ্ছিল, মনে হচ্ছিল পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু ভেসে আসছিল স্বজনদের কান্না। গ্রামের মানুষ বলছেন- এত মানুষের অংশগ্রহণে কোনো শিশুর জানাজা তারা আগে কখনো দেখেননি।

এর আগে বুধবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে কোয়েলহাট পূর্বপাড়া গ্রামে মায়ের সঙ্গে বাড়ির পাশে বিলে যাওয়ার সময় একটি পরিত্যক্ত গভীর নকলকূপে পড়ে যায় সাজিদ।

এদিন শিশুটির মা রুনা খাতুন বলেন, “দুই শিশুকে নিয়ে ওই মাঠে ধানগাছের খড় নিতে যাচ্ছিলাম। এ সময় সাজিদকে কোল থেকে নামিয়ে দেই। সে আমার পেছনে পেছনে হাঁটছিল। পরে পেছনে তাকিয়ে দেখি ছেলে নেই। এরপর দেখি গর্তের ভেতর থেকে মা মা বলে ডাকছে।”

স্থানীয়রা শিশুটিকে উদ্ধারের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ফায়ার সার্ভিসে খবর দেয়। পরে স্থানীয় প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিস শিশুটিকে উদ্ধারের পদক্ষেপ নেয়। ঘটনার পর উপজেলা প্রশাসনসহ পুলিশের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। 

পরে ফায়ার সার্ভিসের তানোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী সদর স্টেশনের তিনটি ইউনিট গিয়ে উদ্ধারে কাজ শুরু করে। রাতভর উদ্ধার চেষ্টার মধ্যে গর্তের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়।

উদ্ধার কাজ শুরুর পর ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা বলেন, আট ইঞ্চি ব্যাসার্ধের সরু গর্ত দিয়ে মাটির গভীরে শিশুটি পড়ে গেছে। শিশুটিকে জীবিত রাখতে পাইপের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

একই সঙ্গে শিশুটিকে উদ্ধারে গর্তের পাশে স্কেভেটর দিয়ে মাটি খনন করা শুরু হয়। বুধবারের পর বৃহস্পতিবার দিনভর কাজ করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। টানা ৩১ ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে ৪৫ ফুট মাটি খুঁড়ে বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ৫ মিনিটে অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে। 

পরে তানোর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর রাত ৯টা ৪০ মিনিটে চিকিৎসক শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

শুক্রবার শিশুটির দাফন শেষে সাংবাদিকরা যান সাজিদের বাবা রাকিব উদ্দীনের সামনে। এ সময় তিনি বলেন, “যাদের অবহেলার কারণে আমার দুই বছরের অবুঝ সন্তানের এই অবস্থা তাদের আমি বিচার চাই।”

এ ঘটনায় মামলা করবেন কি না জানাতে চাইলে তিনি বলেন, “সবাই যে সিদ্ধান্ত দিবে সেটির আমি করব।”

আগের সংবাদ

রাজশাহীর গর্ত থেকে উদ্ধার সেই শিশুকে মৃত ঘোষণা

৩২ ঘণ্টা পর গর্ত থেকে তোলা হল রাজশাহীর সেই শিশুকে

গর্তের ভেতরে শিশু: ৩৫ ফুট গভীরেও খোঁজ মেলেনি, সুড়ঙ্গ খুঁড়ছে ফায়ার সার্ভিস