Published : 27 Dec 2025, 07:01 PM
শীতের আবহ, সঙ্গে বড়দিন ও সাপ্তাহিক ছুটির টানা অবকাশে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে নেমেছে পর্যটকের ঢল। খালি নেই হোটেল-মোটেলের কোনও কক্ষ। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালেও সাগরতীরে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে পুরো সৈকত এলাকা।
সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে কলাতলী পর্যন্ত এলাকাজুড়ে শনিবার সকাল থেকে দেখা গেছে জনসমুদ্র। সূর্যের দেখা না মিললেও ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনায় উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে সাগরতটে।
টানা ছুটির সুযোগে কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে, কেউ বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে, আবার কেউ দলবেঁধে পাড়া-প্রতিবেশীসহ সৈকতে ভিড় জমিয়েছেন। সমুদ্রে সামনে দাঁড়িয়ে কেউ ঢেউ উপভোগ করছেন, কেউ ক্যামেরায় মুহূর্ত ধরে রাখছেন, আবার কেউ বিচ বাইক, ঘোড়া কিংবা জেটস্কিতে চড়ে আনন্দে মেতেছেন। তবে শীত উপেক্ষা করে সাগরের নেমে পড়েছেন অধিকাংশ পর্যটক।
তবে এ আনন্দের মাঝেই বাড়তি ভিড়ের কারণে ভোগান্তির কথাও বলছেন অনেক পর্যটক। তাদের অভিযোগ, হোটেল ভাড়া, খাবার ও পরিবহন খরচ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি আদায় করা হচ্ছে।

ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক মাহবুব হাসান বলেন, “অনলাইনে যে দামে হোটেল বুকিংয়ের কথা বলা হয়েছিল, এখানে এসে তার চেয়ে অনেক বেশি দিতে হয়েছে। খাবারের দামও অস্বাভাবিক। ছুটি কাটাতে এসে এমন অভিজ্ঞতা প্রত্যাশা করি না।”
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক নাসরিন আক্তার বলেন, “পর্যটক বেশি বুঝে সুযোগ নিচ্ছে অনেকে। অটোরিকশা, ইজিবাইক ও রিকশা থেকে শুরু করে খাবার- সবখানেই বাড়তি ভাড়া। প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করা দরকার।”
আরেক পর্যটক সাইফুল ইসলাম; যিনি বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “পর্যটকের ভিড় থাকলে কিছুটা দাম বাড়তে পারে, সেটা বুঝি। কিন্তু দ্বিগুণের বেশি নেওয়া কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। এতে কক্সবাজারের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।”

মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকরা
কক্সবাজার শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভেও টানা ছুটিতে ছিল পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়। পাহাড়, সমুদ্র আর আঁকাবাঁকা সড়কের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে সকাল থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে করে মেরিন ড্রাইভে ছুটে যান ভ্রমণপিপাসুরা।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক ফারহান কবির বলেন, “মেরিন ড্রাইভে দাঁড়িয়ে এক পাশে পাহাড় আর আরেকপাশে বিশাল সমুদ্র- এ দৃশ্য সত্যিই অসাধারণ। কক্সবাজারে এলেই এখানে আসা বাধ্যতামূলক মনে হয়।”
চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা সানজিদা রহমান বলেন, “সানসেটের সময় মেরিন ড্রাইভের সৌন্দর্য ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ছবি তুলতে তুলতেই সময় কেটে যায়। এই সড়ক কক্সবাজার ভ্রমণকে আরও বিশেষ করে তুলেছে।”

আরেক পর্যটক ইমরান হোসেন; যিনি পরিবার নিয়ে এসেছেন। বলেন, “শহরের কোলাহল থেকে একটু দূরে শান্ত পরিবেশে সমুদ্র দেখার সুযোগ মেরিন ড্রাইভে পাওয়া যায়। বাচ্চারাও এখানে বেশ উপভোগ করছে।”
পর্যটকদের মতে, পরিকল্পিত এই সড়ক শুধু যোগাযোগ নয়, কক্সবাজারের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হয়েছে। তারা বলছেন, পর্যাপ্ত পার্কিং, নিরাপত্তা ও বিশ্রামের ব্যবস্থা আরও উন্নত করা গেলে মেরিন ড্রাইভ আন্তর্জাতিক মানের দর্শনীয় স্থানে রূপ নিতে পারে।
ব্যবসায়ীদের আশা, তবে সতর্কতার পরামর্শ
পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা অবশ্য এই ভিড়কে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। কক্সবাজার হোটেল-মোটেল ও গেস্ট হাউজ মালিক সমিতির সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, “দীর্ঘদিন পর এমন পর্যটক সমাগম হচ্ছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে, চলতি মৌসুমে পর্যটন খাত ঘুরে দাঁড়াবে।

“তবে ভিড় বেশি হলে কিছু সমস্যা হয়, তাই পর্যটকদের পরিস্থিতি জেনে পরিকল্পনা করে আসার অনুরোধ করছি।”
নিরাপত্তায় তৎপর ট্যুরিস্ট পুলিশ
পর্যটকদের নিরাপত্তা ও হয়রানি রোধে সার্বিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজার অঞ্চলের ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক (এডিআইজি) আপেল মাহমুদ বলেন, “পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৈকতসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে টহল জোরদার করা হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও হয়রানির অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”
জেলার অন্য স্পটেও পর্যটকের ভিড়
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাশাপাশি প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন, বিশ্বের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝর্ণা, ইনানী ও পাটুয়ারটেকের পাথুরে সৈকত, ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, রামুর বৌদ্ধ বিহার এবং শহরের বার্মিজ মার্কেটেও পর্যটকের পদচারণা বেড়েছে।
পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও ভাড়ার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এই পর্যটক মৌসুম কক্সবাজারের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
কুয়াশায় আড়াল সূর্যাস্ত, হতাশ পর্যটকরা
বেড়াতে আসা পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা। কিন্তু এদিন ঘন কুয়াশার কারণে বিকাল থেকে সূর্যের দেখা না মেলায় সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সৈকতে ভিড় করা হাজারো পর্যটক অপেক্ষা করেও সূর্যাস্ত দেখতে না পেরে হতাশ হয়ে ফিরে যান।
বিকালে সৈকতে দেখা যায়, অসংখ্য পর্যটক আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ মোবাইলে ছবি তুলছেন, কেউ কুয়াশা কাটার আশায় সময় কাটাচ্ছেন। কিন্তু সন্ধ্যা নামার আগ পর্যন্ত সূর্যের দেখা না মেলায় হতাশাই বাড়তে থাকে।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক রাশেদ মাহমুদ বলেন, “কক্সবাজারে এলেই সূর্যাস্ত দেখার একটা আলাদা আকর্ষণ থাকে। আমরা সকাল থেকেই অপেক্ষা করছিলাম। বিকালে কুয়াশা একটু কাটবে ভেবেছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুই দেখা গেল না। একটু হতাশ লাগলেও প্রকৃতির ওপর তো আমাদের কোনো হাত নেই।”
চট্টগ্রাম থেকে পরিবার নিয়ে আসা পর্যটক নাজমা আক্তার বলেন, “শীত একটু বেশি মনে হচ্ছে, তবে সমুদ্রের ঠান্ডা বাতাসটা ভালো লাগছে। সূর্যাস্ত দেখতে না পারলেও বাচ্চারা সৈকতে খেলাধুলা করে অনেক আনন্দ পাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি সময়টা উপভোগ করতে।”
সি সেইফ লাইফগার্ডের জ্যেষ্ঠ কর্মী মোহাম্মদ ইউসূফ বলেন, “সারাদিনই কুয়াশা ছিল। বিকালের পর কুয়াশা আরও ঘন হয়ে যায়। এ কারণে সৈকতে আসা অনেক পর্যটক সূর্যাস্ত দেখতে পারেননি। গত কয়েক দিন ধরে শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।”
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার ভোরে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস; যা চলতি মৌসুমে সর্বনিম্ন। সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলেন, আরও দুই দিন কুয়াশাচ্ছন্ন ও শীতল আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।