Published : 12 Sep 2025, 03:08 AM
প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন পদে পদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (জাকসু) নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছে অভিযোগ করে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস) বলছে, ‘খারাপ’ ভোট হলেও তারা বর্জন করবে না।
বৃহস্পতিবার রাত দেড়টায় ক্যাম্পাসে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসে জুলাই অভ্যুত্থানের সামনের সারিতে থাকা শিক্ষার্থীদের সংগঠনটির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা ভোট নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন।
ভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সবরকম অপচেষ্টার অভিযোগ করে তারা নির্বাচন বর্জন করা সংগঠন ও প্যানেলের প্রতি সমর্থন ও সহানুভূতি থাকার কথা তুলে ধরেন।
তারা বলেন, নানা প্রতিকূলতার মধ্যে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী ভোট দিয়েছেন। ভোটারদের প্রতি সম্মান দেখিয়েই তারা নির্বাচন বর্জন করছেন না, ফলাফল যাই হোক তারা মেনে নেবেন।
তাদের ভাষ্য, “এত কিছুর পরও একটি ব্যাড ইলেকশনও ৩৩ বছরের ‘নো জাকসুর’ চেয়ে ভালো। অন্তত ভোটের খড়াটা তো কেটেছে।”
এতদিন কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিকে দায়ী করেছেন বাগছাস নেতারা।
অনিয়মের অভিযোগ তুলে ছাত্রদলসহ পাঁচটি প্যানেলের ভোট বর্জনের পর সিনেট ভবনে ভোট গণনা চলমান থাকা অবস্থায় রাত দেড়টার সংবাদ সম্মেলনে আসেন বাগছাস সমর্থিত শিক্ষার্থীদের প্যানেলের নেতারা।
‘শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরাম’ এর ভিপিপ্রার্থী আরিফুজ্জামান উজ্জল ও জিএস প্রার্থী আবু তৌহিদ মো. সিয়াম সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে জিএস প্রার্থী সিয়াম বলেন, “আমরা নির্বাচনের ফলাফল চাই এবং পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনের অনিয়মকে অ্যাড্রেস করছি। যে সাড়ে ৭ হাজার বা আট হাজার ভোটার ভোট দিয়েছে আমরা তাদেরকে সম্মান জানাচ্ছি যে তারা এত প্রতিকূলতা কাটিয়ে…(ভোট দিয়েছে)। নির্বাচন কমিশন যেখানে প্রত্যেক পদে পদে বাধা দিয়েছে যাতে ভোটারের সংখ্যা কম থাকে, ভোট কাস্ট কম হয়।
“আমরা সেই ভোটারদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে নির্বাচনটা বর্জন করছি না। যারা বর্জন করেছে তাদের প্রতিও আমাদের সহানুভূতি আছে, সমর্থন আছে। এই ভোটের ফলাফল যাই হোক আমরা মেনে নিব।”
তিনি বলেন, “নির্বাচন আয়োজন করার জন্য কমিশন মোটেও প্রস্তুত ছিল না। তারা চেয়েছে হতাশ হয়ে প্রার্থীরা বা প্যানেলগুলো যেন নির্বাচন বানচালের জায়গাটাতে যায়। সেই জায়গা থেকে এত কিছুর পরেও একটি ব্যাড ইলেকশনও ভাল ৩৩ বছরের নো জাকসুর চেয়ে।”

সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি অভিযোগগুলো তুলে ধরে ভিপি প্রার্থী উজ্জল বলেন, “আমাদের আশা ছিল সকলের জন্য লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করবে প্রশাসন। কিন্তু শুরু থেকেই নানা গরমিল দেখছি আমরা।
“তফসিলে ঘোষিত মনোনয়ন দাখিলের সর্বশেষ দাখিলের আগের রাতে সময় বাড়ায় একটি দলকে সুবিধা দিতে। ভোটার ও প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের বেশ কয়েকদিন পর একটি প্যানেলের ভিপি প্রার্থীর প্রার্থীতা বাতিলের মতো নজিরবিহীন ঘটনা ঘটে। এবং পরবর্তীতে আইনি নানা প্রক্রিয়ায় নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।”
ব্যালটপেপার ছাপানো নিয়ে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রশাসনের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে তুলে ধরে তিনি বলেন, “ডোপটেস্টের নিয়ম রাখা হলেও আমরা এখনো জানি না সব প্রার্থীর ডোপ টেস্ট করিয়েছেন কী না এবং এর ফলাফলও জানানো হয়নি। যদি কোনো প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর ডোপ টেস্টে পজিটিভ আসে তাহলে যে জটিলতা তৈরি হবে সে বিষয়ে সুরাহার কোনো উপায় জানায়নি নির্বাচন কমিশন।
“নির্বাচনের আগের রাতে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে ছাত্রদলের সাবেক নেতাদের উপস্থিতি নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ তৈরি করে।”
তার অভিযোগ, “পুলিশি পাহারা ছাড়া ভোটকেন্দ্র থেকে ব্যালট বাক্স নেওয়ার বিষয়েও কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। ভোটকেন্দ্রে পোলিং এজেন্ট দেওয়ার জন্য বারবার আবেদনের পরও নির্বাচনের আগের দিন নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত দেয়নি। নির্বাচনের দিন ভোর রাত ৩টায় পোলিং এজেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় নির্বাচন কমিশন। এত স্বল্প সময়ের মধ্যে পোলিং এজেন্ট দেওয়া সব প্রার্থীর পক্ষেই কঠিন কাজ।
“এর ফলে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষ অতিরিক্ত সুবিধা পেয়েছে বলে আমরা মনে করি। বিস্ময়ের সঙ্গে আমরা দেখেছি যে আবার পোলিং এজেন্ট দেওয়ার সিদ্ধান্ত সব পোলিং অফিসারকে জানানো হয়নি। ফলে বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে নির্বাচন শুরু হয় পোলিং এজেন্ট ছাড়া।
তার অভিযোগ, “নির্বাচন আচরণবিধি অনুযায়ী প্রচারণা চালানো নিষেধ হলেও অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রের বাইরে লিফলেট বিলি করে প্রচারণা চালাতে দেখা যায় ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল সমর্থিত প্রার্থীদের। এর প্রতিবাদ করলে সেখানে মব তৈরি করে শিবির কর্মীরা ও নিস্ক্রিয় ভূমিকা রাখে কর্তৃপক্ষ।”

অনেকগুলো ভোটকেন্দ্রে পরিচয় নিশ্চিত না করেই ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে ঢুকেছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হয়নি অমোচনীয় কালি। ভোটারদের পরিচয় নিশ্চিতের জন্য তালিকায় কোনো ছবিও ছিল না। কোনো কেন্দ্রে ভোটারদের টিক দিতে হয়েছে কলমের পরিবর্তে পেন্সিল দিয়ে।
“তাই নির্বাচনে এক ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল এবং কেউ এই সুযোগ নিয়েছেন কী না তা আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। সালাম-বরকত হলে অনেক ভোটারের ভোট আগেই দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কেন্দ্রগুলোতে ১০ শতাংশ অতিরিক্ত ব্যালট পেপার দেওয়ারও অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে নির্বাচন কমিশনের যথাযথ প্রস্ততি ছিল না।”
ছাত্রী হলে ভোট বুথ আটকে রেখে জট তৈরি করে ভোট প্রক্রিয়া ধীরগতি করার চেষ্টা চালায় ইসলামী ছাত্রী সংস্থার কর্মীরা এমন অভিযোগও তোলেন উজ্জ্বল।
জাকসু নির্বাচন না হওয়ার পেছনে অতীতে শিক্ষক রাজনীতির ভূমিকা থাকার কথা দাবি করে তিনি বলেন, “এবারও তা (শিক্ষক রাজনীতি) জাকসু নির্বাচনকে প্রভাবিত করেছে। তবে এত প্রতিকূলতা অতিক্রম করে ভোট দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।”
আরও পড়ুন:
জাকসু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা ছাত্রদলের
জাকসু নির্বাচন: রাতে জাহাঙ্গীরনগর ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের বিক্ষোভ
জাকসু: ভোট বর্জন করে পুনরায় নির্বাচনের দাবি চার প্যানেলের
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা হলে সোয়া ঘণ্টা ভোট বন্ধ, নিরাপত্তা জোরদার
জাকসু: এবার নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনাস্থা 'সম্প্রীতির ঐক্যের'
জাকসু নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা 'সংশপ্তক পর্ষদের'
জাকসুর ব্যালট-মেশিন ‘জামায়াতের কোম্পানির’, পক্ষপাতের অভিযোগ ছাত্রদলের