৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

বীরশ্রেষ্ঠসহ ৭ শহীদের সমাধি ঘিরে জাদুঘর চান মুক্তিযোদ্ধারা

যশোরের কাশীপুর গ্রামের এক পুকুরপাড়ে সমাহিত হয়েছেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদসহ সাত বীর মুক্তিযোদ্ধা।

বীরশ্রেষ্ঠসহ ৭ শহীদের সমাধি ঘিরে জাদুঘর চান মুক্তিযোদ্ধারা

শার্শা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম কাশিপুরে সাত বীর মুক্তিযোদ্ধার সমাধি

আসাদুজ্জামান আসাদ

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Dec 2022, 06:36 PM

Updated : 11 Dec 2022, 06:46 PM

যশোরের শার্শা উপজেলার সীমান্তঘেঁষা গ্রাম কাশিপুর। ওপারে ভারতের চব্বিশ পরগনার বয়রা। কাশিপুরের এক পুকুরপাড়ে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদসহ সাত শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। 

একজন বীরশ্রেষ্ঠ, একজন বীর বিক্রম, একজন বীর প্রতীকসহ এই সাত সূর্যসন্তানের সমাধি ও স্মৃতিস্তম্ভ অবহেলায় পড়ে আছে উপজেলা সদর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার উত্তরের এই গ্রামে। 

দীর্ঘদিন ধরেই মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয়রা এখানে একটি জাদুঘর গড়ে তোলার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু জাদুঘর তো দুরাশা বরং এই সাত শহীদের সমাধিস্থলই পড়ে থাকে অযত্ন-অবহেলায়। 

এখানে নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী, নেই তদারকি কিংবা দেখভালের কেউ। নেই দর্শনার্থীদের বসার বা বিশ্রামের কোনো ব্যবস্থা। বিষয়টি একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানালেও কোনো সুরাহা না হওয়ার অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধাদের। 

উপজেলার গোবিনাথপুর আর কাশিপুর মৌজার সীমানার এই পুকুরপাড়ে ঘুমিয়ে আছেন শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, শহীদ সিপাহী আব্দুস ছাত্তার বীর বিক্রম (প্রাক্তন ইপিআর), শহীদ সিপাহী এনামুল হক বীর প্রতীক (প্রাক্তন ইপিআর), সৈয়দ আতর আলী (তদানীন্তন গণপরিষদ সদস্য), শহীদ সুবেদার মনিরুজ্জামান (প্রাক্তন ইপিআর), শহীদ বাহাদুর আলী এবং স্বাধীনতার পরে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আহাদ। 

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ছেলে এসএম গোলাম মোস্তফা কামাল বলেন, “বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন আমার বাবা। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ। অথচ অযত্ন অবহেলায় সারা বছর পড়ে থাকে তার স্মৃতিস্তম্ভ। আমি স্মৃতিস্তম্ভটি সংরক্ষণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।” 

শার্শার ডিহি ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নূর ইসলাম মল্লিক  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিস্তম্ভ আজ বনে-জঙ্গলে ঢেকে গেছে। তাদের স্মরণে এখানে একটি মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপন করার কথা থাকলেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। 

“এছাড়া সরকারিভাবে তদারকির জন্য এলাকাবাসী এখানে একজন কেয়ারটেকার রাখার দাবি করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।” 

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ-শার্শা উপজেলা কমান্ড কাউন্সিলের বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাসির উদ্দিন, মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল গফুর মাস্টার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আহম্মদ আলি, মুক্তিযোদ্ধা গিয়াস উদ্দিন মাস্টার, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নুর ইসলাম মল্লিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা আনছার আলি, বীর মুক্তিযোদ্ধা শওকত আলি ও শহীদদের স্বজনদের সঙ্গে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয়। তাদের কথায় উঠে আসে কাশিপুরে সমাহিত এই শহীদদের বীরত্বগাথা। 

তারা জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় ১৯৭১ সালে কাশীপুর অনেকটা মুক্ত এলাকার মতো ছিল। তাই স্বাধীনতা যুদ্ধে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের এখানে সমাহিত করা হয়। 

এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষুদ্র একটি দল কাশীপুরে গোপনে অবস্থান করত। এই সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতেন। 

মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নির্বাহী সদস্য ফারুক হোসেন উজ্জ্বল বলেন, “এগুলো বাঙালির সংগ্রামের চিহ্ন। আর পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর নির্মমতার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। এগুলো সংরক্ষণ করা সম্ভব না হলে আগামী প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে ভুলে যাবে।” 

শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল হক মঞ্জু বলেন, “এর মধ্যে উপজেলা থেকে একটি প্রস্তাবনা পাঠানো হয়েছে। সাত শহীদের স্মৃতিস্তম্ভ সরকারিভাবে সংরক্ষণ করে এখানে একটি মুক্তিযোদ্ধা মিউজিয়াম স্থাপন করা হলে আগামী প্রজন্মের সন্তানেরা দেশ স্বাধীনের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবেন।” 

যশোর জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান সাংবাদিকদেরকে বলেন, “আমরা এই জেলায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসম্বলিত যে সমস্ত স্থাপনা রয়েছে বা যে সমস্ত বিষয়গুলো রয়েছে সেগুলো সংরক্ষণের জন্য ব্যবস্থা নিচ্ছি। এর মধ্যে কিছু কিছু জায়গায় কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। 

“বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদের যে স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে, সেটা যথাযোগ্য মর্যাদায় আমরা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিব এবং এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমরা অবহিত করব। 

“আর মিউজিয়ামের বিষয়টি তো আপনারা জানেন – এটা সময়সাপেক্ষ; সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আমি বিষয়টি জানাব।”