Published : 10 Apr 2026, 07:24 PM
বরগুনায় দুই দিনের টানা বৃষ্টিতে তরমুজ ক্ষেত জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে ক্ষেতে পরিপক্ব তরমুজ পচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষি। জলাবদ্ধতা নিরসনে ক্ষেত স্যালো মেশিন বসিয়ে পানি অপসারণের চেষ্টা করছেন কেউ কেউ।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী দুদিন খরা থাকলে তেমন ক্ষতি হবে না। তবে বৃষ্টি হলে যত দ্রুত সম্ভব ক্ষেত থেকে পানি সরিয়ে ফেলতে হবে।

চাষিরা জানান, প্রতিবছর তরমুজ কিনতে ঢাকা, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা বরগুনায় আসেন। কিন্তু এ বছর ডিজেল সংকটের কারণে বড় ব্যবসায়ীরা তরমুজ কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। কারণ ট্রাক ভাড়া ৩৫ হাজার থেকে বেড়ে ৫০ হাজার হয়েছে। আবার দুই দিনের বৃষ্টির কারণে ব্যবসায়ীরা আসছে না।
সদর উপজেলা এম বালিয়াতলী এলাকার ইয়াসিন প্রতিবছর তরমুজ চাষ করেন। এবার বেশি লাভের আশায় অন্যের জমি বর্গা (লিজ) নিয়ে তিন কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন তিনি। তরমুজ চাষের জন্য বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণও নিয়েছেন।
এ ছাড়া বন্ধক রেখেছেন স্ত্রীর স্বর্ণালংকার। প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ করেছেন ইয়াসিন। কিন্তু ভাগ্য বিড়ম্বনায় তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যবসায়ী না পাওয়ায় ক্ষেতে বিক্রি উপযোগী হাজারো তরমুজ পড়ে রয়েছে।
এর মধ্যে টানা দুই দিন মাঝারি বৃষ্টির কারণে ক্ষেতে তরমুজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এখন লাভের আশা ছেড়ে উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে শঙ্কায় ইয়াসিন। কীভাবে এনজিওর ঋণ পরিশোধ করবেন বা স্ত্রীর স্বর্ণালংকার ছাড়িয়ে আনবেন সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

ইয়াসিনের মত শত শত তরমুজ চাষির স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি সংকটের কারণে তরমুজে ব্যবসায়ী না আসায় এবং বৃষ্টিতে তরমুজ খেতে পানি জমে ফল নষ্টসহ গাছের গোড়ায় পানি জমে বিভিন্ন রোগ দেখা দিয়েছে।
তরমুজ চাষি ইয়াসিন বলেন, “এনজিও থেকে ঋণ এবং বউয়ের স্বর্ণালংকার বন্ধক রেখে টাকা নিয়ে তরমুজের চাষ করেছি। ক্ষেতে বিক্রির উপযোগী তরমুজ পড়ে আছে। ব্যবসায়ী না আসায় এতে বড় ক্ষেত স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাচ্ছে না।
“বৃষ্টি না হলে আমার ক্ষেতে তরমুজ ১২-১৫ লাখ টাকায় বিক্রি হত। কীভাবে ঋণের টাকা শোধ করব জানি না। প্রতিমাসে ২০ হাজার টাকার কিস্তি দিতে হয়।”
জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জানা গেছে, এ বছর বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ছয় হাজার হেক্টর আবাদ হয়েছে শুধু সদরে। এখন পর্যন্ত বেচা-বিক্রি শুরু হয়নি।

এর মধ্যে দুই দিনের বৃষ্টিতে কিছুটা তরমুজের ক্ষেত নষ্ট হতে পারে বলে ধারণা করছেন কৃষি কর্মকর্তার। তবে বৃষ্টি আরও দুদিন যদি অব্যাহত থাকে তাহলে তরমুজ ক্ষেতে ব্যাপক ক্ষতি হবে।
সদর উপজেলার লাকুরতলা, লতাকাটা, বানাই ও পরীরখাল এলাকার তরমুজ চাষিরা ক্ষেতে স্যালো মেশিনের মাধ্যমে বৃষ্টির পানির অপসারণ করছেন। কেউ বা নালা কেটে পানি বের করে দিচ্ছেন। অনেকে আবার নালার পানিতে ডুবে থাকা তরমুজ ডাঙ্গায় তুলে দিচ্ছেন।
লাকুরতলা গ্রামের তরমুজ চাষি আবদুর রব মিয়া বলেন, “আমরা দুই ভাই একত্রে ছয় একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমাদের চার লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে না পারায় ক্ষেতে পড়ে আছে তরমুজ।
“এখন আবার বৃষ্টির কারণে ক্ষেতে পানি জমে তরমুজ নষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন ব্যয়ের টাকাও উঠবে না।”
একই গ্রামের আরেক তরমুজ চাষী মো. হারুন মিয়া (৫০) বলেন, দুই দিন ধরে বৃষ্টিতে তরমুজ ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যায়। মেশিন দিয়ে পানি সেচ করে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে পানিতে তলিয়ে যাওয়া তরমুজ ব্যবসায়ীরা কিনতে চায় না।

“আমি সাড়ে তিন কানি জমিতে তরমুজ চাষ করেছি। এতে আমার খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকা। বৃষ্টি না হলে ১৫ লাখ টাকায় তরমুজের ক্ষেত বিক্রি করতে পারতাম। এখন উৎপাদন খরচ তোলা নিয়ে চিন্তায় আছি। ক্ষেতে অন্তত ১৩ হাজার তরমুজ নষ্ট হয়েছে। আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি”, বলেন তিনি
মাঠ পরিদর্শন করে বরগুনা সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বৃষ্টির কারণে তরমুজের আংশিক ক্ষতি হতে পারে। আগামী দুই দিন যদি খরা থাকে তাহলে তেমন ক্ষতি হবে না।”