Published : 02 Dec 2025, 05:50 PM
পাহাড়ে যে কোনো ধরনের অরাজক পরিস্থিতি এড়াতে এবং অস্তিত্ব রক্ষায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের বিকল্প নেই বলে মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি নেতারা।
পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার সকালে বান্দরবান শহরের রাজার মাঠে জনসংহতি সমিতির জেলা কমিটির আয়োজনে গণসমাবেশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এতে জেএসএসের জেলা এবং কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশে জেএসএসের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাধারণ সম্পাদক উইন মং মারমা জলি বলেন, “চুক্তির ২৮ বছর পর আনন্দ এবং খুশি মনে বর্ষপূর্তি পালন করার কথা। কিন্তু মনে পাহাড়সমান ক্ষত রেখে, বেদনা নিয়ে গণসমাবেশ করতে হচ্ছে।
“তার কারণ চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্য অর্থনৈতিক, উন্নয়ন এবং সামরিক সমস্যা নয় উপলব্ধি করেই পার্বত্য চুক্তি করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, এরশাদ আমল থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ শাসন পর্যন্ত মোট ২৬ বার বৈঠক করার পর পার্বত্য চুক্তি করা হয়। চুক্তির শুরু থেকে শাসকগোষ্ঠীর একটা অংশ ‘ষড়যন্ত্র’ করে আসছে। চুক্তির দিনে কড়া নিরাপত্তার মধ্যেও সেদিন খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে কারা কালো পতাকা প্রদর্শন করেছিল সবাই জানে।
অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য এগুলো তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে করেন জেএসএস নেতা উইন মং মারমা।
চুক্তি বাস্তবায়নের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে বলা হত, চুক্তির ৭২টির ধারার মধ্যে ৬৯টির বাস্তবায়ন করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে ২৫টি ধারা সম্পূর্ণ, ১৯টি আংশিক এবং বাকি ধারাগুলো এখনও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
চুক্তির প্রথমে বলা হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চল’ করা হবে; যা খর্ব করে এখানকার বাসিন্দাদের আরও প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে দাবি জেএসএস নেতার।
সিএইচটি হেডম্যান নেটওয়ার্কের আইন বিষয়ক সম্পাদক মংনু মারমা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা, আত্ম-নিয়ন্ত্রণ অধিকারবোধ নিয়ে পার্বত্য চুক্তি করেছিল। কিন্তু চুক্তির শুরু থেকে শাসকগোষ্ঠীরা ইউপিডিএফ সৃষ্টি করে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।

“বিগত আওয়ামী লীগ সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের ২০ বছর সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু তারা যেভাবে এগিয়ে আসার কথা, সেভাবে আসেনি। শুধু তাই নয়, চুক্তি বাস্তবায়নকে বানচাল করার জন্য রুমায় কেএনএফ, মগ পার্টি এবং ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সৃষ্টি করে এখনও ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছে।”
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি ভূমি কমিশনে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দিয়েছে। তারা একটি সভা ডেকেছিল। কিন্তু চুক্তি বিরোধীরা হরতাল ডেকে বানচাল করেছে। চুক্তির ২৮ বছর অনেক ধৈর্য ও সহনশীলতা দেখানো হয়েছে।
“কিন্তু এভাবে আর কত। চুক্তির আলোকে জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। কিন্তু সেই জেলা পরিষদের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে পরিষদে বসেই চুক্তি বিরোধিতা করছেন অনেকে।”
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বর্তমান সরকার ‘জুলাই সনদ’ করেছে; সেখানেও পার্বত্য চুক্তি এবং পাহাড়ে মানুষের কথা বলা হয়নি বলে অভিযোগ করেন মংনু মারমা।
আলোচনা সভায় আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য মিঞোচিং মারমা, জনসংহতি সমিতির জেলা শাখার সদস্য থুইমংপ্রু মারমা ও সিংওয়াইমং মারমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের জেলা সভাপতি উলিসিং মারমা বক্তব্য দেন।
আলোচনা সভা শেষে রাজার মাঠ থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে শহরে গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ঘুরে আবার একই স্থানে এসে শেষ হয়। এতে বিভিন্ন উপজেলার মানুষ অংশ নেন।
এ ছাড়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটে (কেএসআই) জেলা পরিষদের উদ্যোগে পার্বত্য চুক্তি বর্ষপূর্তি পালন করা হয়।
সকালে ইনস্টিটিউটের সামনে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন বান্দরবান জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক থানজামা লুসাই।
পরে কেএসআই মিলনায়তনে আলোনা সভায় সেনাবাহিনী সদর জোনের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হুমায়ন রশিদ, জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম এবং জেলা প্রশাসনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাসান বক্তব্য দেন।