Published : 06 Sep 2025, 12:07 PM
পাহাড়ি এলাকায় আগে কেবল সমান জমিতেই সবজি চাষ হত। বেশির ভাগ জমি একেবারে খাড়া ও ঢালু হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা সম্ভব ছিল না। কেউ কেউ কেবল নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে চাষ করতেন।
ঢালু জায়গার জমি উঁচুনিচু হওয়ায় সার দেওয়া, কীটনাশক ছেটানো ও পরিচর্যার ক্ষেত্রে বেশ অসুবিধায় পড়তে হত চাষিদের। কিন্তু দিন দিন কৃষিজমি কমে আসায় এবং জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়ে নিজেদের চাষাবাদ পদ্ধতিও বদলে ফেলছে পাহাড়ের কৃষকরা। তারা এখন ঝুঁকছেন ‘মাচাং’ পদ্ধতিতে।
মাচাং মানে হলো উঁচু করে বাঁশ, কাঠ বা দড়ির সাহায্যে একটি মাচা তৈরি করা। এই মাচার তিতা করলা, শসা, চিচিঙ্গা, শিম, বরবটি ইত্যাদি চাষ করা হয়। নিচে খালি জায়গায় অন্য সবজি লাগানো যায়।
কৃষি বিভাগ বলছে, কোনো ফলন মাটির কাছাকাছি থাকলে বিভিন্ন রোগবালাই হয়; পোকা আক্রমণ করে। ‘মাচাং’ পদ্ধতির চাষে মাটি থেকে পাঁচ-ছয় ফুট দূরত্ব হওয়ায় সবজি সেসব রোগবালাই থেকে রক্ষা পাচ্ছে। ফলনও হচ্ছে ভাল। তাছাড়া কোনো বছর অতিবৃষ্টি হলেও পানি জমে থাকার সম্ভাবনা নেই।
বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে উপ-পরিচালক এম এম শাহ নেওয়াজ বলেন, ‘মাচং’ পদ্ধতিতে সবজি চাষে অসুবিধার চাইতে সবিধাটাই বেশি। রোগবালাই কম হওয়ায় ফলনও বেশি। তবে এই পদ্ধতির সবজি চাষের প্রচলন জেলায় খুব বেশি দিন হয়নি।”

মাচাং পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে ফলন বেশি পাওয়ার কথা কৃষকরাও জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও ঠিকমত পরিচর্যা করতে পারলে ঢালুর জায়গাতেও এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে ‘ভালো’ লাভ হচ্ছে।
সম্প্রতি বান্দরবান সদর উপজেলার সুয়ালক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারপাশে পাহাড়ি ঢালুতে সারি সারি মাচাং পদ্ধাতিতে চাষ করা সবজি ক্ষেত। ঢালু এই জায়গায় বিশেষ করে করলা, শসা, শিম, বরবটি ও মিষ্টি কুমড়া চাষ হয়। সেখানে কেউ শসা তোলায় ব্যস্ত; কেউ ব্যস্ত করলা তুলতে। কেউ ক্ষেত থেকে সবজি তুলে থুরুংয়ে (ঝুড়ি) রাখছেন। কেউ বা পাইকারদের কাছে সবজি বিক্রি করে গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন।
থুরুং থেকে করলা বের করে রাস্তায় জড়ো করে রাখতে দেখা গেল কয়েকজন নারী চাষিকে। তাদের মধ্যে সুয়ালক আমতলি তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার বাসিন্দা মল্লিকা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, তার কয়েকটি করলার ক্ষেত রয়েছে। মাচাং পদ্ধতিতে চাষ করে মে থেকে অগাস্টের শেষ পর্যন্ত ৬০ মণের কাছাকাছি করলা পাওয়া গেছে। এ সবজি এখন শেষের দিকে। মণ প্রতি করলা দুই হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন; সেগুলো পাইকাররা এসে নিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “এরপর সেখানে শিম ও বরবটি পাওয়া যাবে। এবারে ফলন বেশ সন্তোষজনক ছিল। মজুরি, সার, কীটনাশকের খরচ বাদ দিয়ে মোটামুটি লাভ থাকবে।”
একই পাড়ার সুমন তঞ্চঙ্গ্যা নামে আরেক চাষি বলেন, তিনি মাচাং পদ্ধতিতে একসঙ্গে করলা ও শসার চাষ করেছেন। তার মধ্যে ২০ মণ করলা ও ১৫ মণ শসা পাওয়া গেছে। ঠিকমত যত্ন নিতে না পারায় কিছু করলা নষ্ট হয়েছে।

“পরিবারে সদস্য কম হওয়ায় বাইরে থেকে দিনমজুর আনতে হয়েছে। ফলে মজুরি বাবদ অনেক টাকা খরচ হয়েছে। তা নাহলে লাভ আরও বেশি থাকত। এখন বরবটি ও শিমের জন্য মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে বেশি।” বলেন তিনি।
সুয়ালক আমতলি মারমা পাড়ার বাসিন্দা চিংক্য মারমা বলছিলেন, এক ব্যক্তির কাছ থেকে ইজারা নেওয়া তিন একরের জায়গায় মাচাং পদ্ধতিতে শসা ও করলা চাষ করেছিলেন। তিনি ২০ মণ করলা ও ১৫ মণের মত শসা ফলন পেয়েছেন।
তিনি বলেন, “মাটির উর্বরতা থাকায় ফলন ভাল হয়েছে। কিন্তু অতিবৃষ্টি কারণে অর্ধেক ক্ষতিও হয়েছে। আর না হলে লাভ আরও বেশি পাওয়া যেত। আবার কেউ বেশি পরিমাণ জমিতে চাষ করলেও কম ফলন পেয়েছে।”
আমতলি মারমা পাড়ার আরেক বাসিন্দা মংচিংহ্লা মারমা বলেন, পাহাড়ি ঢালুর জায়গায় আগেও চাষ করা হত। কিন্তু পরিচর্যা করা অসুবিধা এবং ফলন কম হবে মনে করে লোকজন কম চাষ করত। এখন ঢালুর জায়গাতেও সবজির চাষ বাড়ছে। ফলনও বেশ ভাল।
তিনি বলেন, “আমার চার একরের জায়গায় ২৫ মণ তিতা করলা হয়েছে। আর ২০ মণ শসা পাওয়া গেছে। এখন বরবটি চাষ শুরু হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১৫ মণ বরবতি পাওয়া গেছে। মণ প্রতি ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম জেলার কেরানীহাট থেকে আসা দিদারুল আলম নামে এক পাইকার বলেন, “প্রত্যেক বছর সুয়ালক এলাকার একেক পয়েন্ট থেকে বিভিন্ন পাইকাররা এসে ফসল নিয়ে যায়। একটা মিনি ট্রাকে তিন টন করে লোড করা যায়। এভাবে করে দিনে দুবার করে করলা ও শসা নিয়ে চট্টগ্রাম জেলার শহর এবং কেরানীহাটে নিয়ে যাওয়া হয়।
“কোনো কোনো পাইকার ব্যবসায়ী কুমিল্লা পর্যন্ত নিয়ে যায়। অন্য এলাকার তুলনায় পাহাড়ি এলাকার সবজি হিসেবে একটু কদর থাকে।”
চিম্বুক পাহাড়ের ১১ মাইল ও ১২ মাইল এলাকা, সুয়ালক মাঝের পাড়া ও আর্মি ক্যাম্পে এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হাকিম বলেন, এসব এলাকার ৪০০ একর জায়গায় বিভিন্ন মৌসুমী সবজি চাষ করা হচ্ছে। সেখানে মাটির উর্বরতা ভাল। ২৫-২৬ অর্থ বছরে ৪৮ হেক্টরে শসা ও ১৩ হেক্টরে করলা চাষ করা হয়েছে। শসার মৌসুম শেষে বরবটি ও শিমের চাষ শুরু হয়েছে। মিষ্টি কুমড়া হয়েছে ১৭ হেক্টর জমিতে।

তিনি বলেন, “জুনে চাষ করা করলা জুলাই শেষ সপ্তাহ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। শসা রোপন নির্ভর করে বৃষ্টির ওপর। মে মাসে যখনই বৃষ্টি শুরু হয় তখন থেকে শসা রোপন করা শুরু হয়। চাষিরা এখন এক সঙ্গে দুই তিন-চার প্রকারের সবজি চাষ করে থাকে। মে মাসে প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শসা রোপন করলে জুনের শেষের দিকে ফলন পাওয়া যায়। কিন্তু শসা বেশি দিনের ফসল না।
“এ কারণে শসা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরবটি ও শিমের চাষ শুরু হয়ে যায়। অগাস্টের মাঝামাঝি থেকে বরবটি পাওয়া যাচ্ছে। এখনও শসা ও করলা ফলন একেবারে শেষের দিকে। বরবটি ও শিম শুরু হচ্ছে।”
এসব বিষয়ে কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে জানান কৃষি বিভাগের এই কর্মকর্তা।
জেলা বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এম এম শাহ নেওয়াজ বলেন, “তিন-চার বছর আগে রোয়াংছড়ি উপজেলার দেবতাকুমে যাওয়ার পথে পাহাড়ি ঢালুতে প্রথম মাচাং পদ্ধতিতে সবজি চাষ দেখি। দেখতেও বেশ সুন্দর লেগেছিল। মনে হয়েছিল, পুরো পাহাড়টাই একটা মাচাং।
তিনি বলেন, “শসা, করলা, এবং চিচিংঙ্গা সবজি মাটির কাছাকাছি থাকায় পোকামাকড়ের উপদ্রব বেশি হয়। মাচাং পদ্ধতিতে সবজি যেহেতু মাটি থেকে অন্তত চার-পাঁচ ফুট দূরত্বে থাকে তাই পোকামাকড়ের উপদ্রব কম হয়। এ পদ্ধতির মাটি গর্ত করে সবজির বীজ একটা থেকে আরেকটা পাঁচ-সাত ফুট দূরে রোপন করা।
“আগে আদা-হলুদ চাষের ফলে পাহাড়ি জমিতে মাটি ক্ষয় হতো বেশি। কিন্তু এখন মাচাং পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে সেই ক্ষয় অনেকটাই কমে এসেছে। ঝড়-বৃষ্টির সময়ও গাছ বাধা সৃষ্টি করায় ভূমিক্ষয় রোধে সহায়ক হচ্ছে এই পদ্ধতি।”