Published : 05 Apr 2026, 01:15 PM
শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলায় রাস্তার পাশে রেখে যাওয়া ট্রাংক থেকে নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধারের ঘটনায় এক দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
লাশ উদ্ধারের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও জড়িত থাকার অভিযোগে দুইজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জামালপুরের পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত।
গ্রেপ্তাররা হলেন, মো. নিয়ামুর নাহিদ (২৬) ও তার স্ত্রী মোছা. রিক্তা মনি (২৬)। তারা গাজীপুর জেলার শ্রীপুরে ভাড়া বাসায় থেকে স্থানীয় টেক্সটাইলে চাকরি করেন।
গ্রেপ্তারের পর শেরপুর আদালতে পাঠানো হলে এ দম্পতি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পরে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠিয়েছেন।
অন্যদিকে নিহত ডলি আক্তার (৩৫) নেত্রকোনা মোহনগঞ্জ উপজেলার মো. আলাল মিয়ার মেয়ে। তিনি ভালুকা উপজেলার স্কয়ার মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় পয়েন্ট এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে স্থানীয় সোয়েটার কোম্পানিতে চাকরি করতেন। একই প্রতিষ্ঠানে ডলির দুই ভাইও চাকরি করেন, তারা পাশাপাশি এলাকায় ভাড়াটিয়া হিসাবে বসবাস করেন।
শনিবার দুপুরে শেরপুর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে পিবিআই আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত বলেন, গত ১ এপ্রিল সকালে শ্রীবরদী পৌরসভার তাঁতিহাটি পশ্চিম নয়াপাড়া ঢালিবাড়ী তিন রাস্তার মোড়ে তালাবদ্ধ একটি বড় ট্রাংক পড়ে থাকতে দেখা যায়।
খবর পেয়ে পুলিশ ট্রাংক থেকে তোশকে মোড়ানো হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাতনামা নারীর অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে। এ সময় পিবিআই, জামালপুর জেলার একটি চৌকস টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ওই নারীর পরিচয় শনাক্ত করে।
পরে নিহতের ভাই মো. শফিকুল ইসলাম শফিক মিয়া বাদী হয়ে শ্রীবরদী থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

মামলার পর পিবিআইয়ের অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল ও জামালপুর ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার পংকজ দত্তের সার্বিক তত্ত্বাবধানে এসআই (নি.) মো. আব্দুস সালাম মামলার তদন্ত শুরু করেন।
এরই ধারাবাহিকতায় লাশের ট্রাংক বহনকারী নীল রংয়ের পিকআপ গাড়িটি তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় শনাক্ত করা হয়। এবং শেরপুর জেলার শ্রীবরদীর ভেলুয়া ইউনিয়ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে সেটি উদ্ধার ও জব্দ করা হয়।
সেসঙ্গে পিকআপ চালক মো. আশরাফ আলীকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়। তার দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে ঘটনায় জড়িত ২ আসামিকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় অভিযান পরিচালনা করা হয়।
ধারাবাহিক অভিযানে শনিবার ভোরে শেরপুর-ময়নসিংহ মহাসড়কের শেরপুর সদর উপজেলার ভাতশালা পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের সামনে চেকপোস্ট বসিয়ে বাসে তল্লাশি চালিয়ে নিয়ামুর নাহিদ ও রিক্তা মনি দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তাদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাতে পুলিশ সুপার পঙ্কজ দত্ত বলেন, গত ৩০ মার্চ রাত ৮টার দিকে নিয়ামুর নাহিদের সঙ্গে ডলি আক্তারের পরিচয় হয়। তাৎক্ষণিক পরিচয়ের সূত্র ধরে এবং স্ত্রী বাসায় না থাকার সুযোগে নাহিদ ডলিকে তার বাসায় নিয়ে যায়।
পরে সেখানে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে ডলি চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলে লোক জানাজানির ভয়ে নাহিদ তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে ধরে রাখে, একপর্যায়ে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন ডলি।
পরবর্তীতে স্ত্রী রিক্তা মনিকে রাত অনুমান সাড়ে ১০টার দিকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানায় নাহিদ। এ সময় তারা উভয়ে মিলে হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি গোপন করা ও লাশ গুমের পরিকল্পনা করে।
এর অংশ হিসেবে বড় প্লেইনশিটের ট্রাংক কিনে নিয়ে আসেন নাহিদ এবং ডলির মরদেহ হাত-পা বেঁধে তোশক দিয়ে পেঁচিয়ে ওই ট্রাংকে রেখে দেয় তারা। পরবর্তীতে একটি পিকআপ ভাড়া নিয়ে ট্রাংকটি শ্রীবরদীর সড়কে রেখে পুনরায় গাজীপুর চলে যায়।
সুপার পঙ্কজ দত্ত বলেন, “এই ঘটনার সংবাদ প্রাপ্তির পরপরই আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে টিম প্রেরণ করি এবং মামলার রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা অব্যাহত রাখি।
“এরই ধারাবাহিকতায় ওই ইউনিটের চৌকস সদস্যদের কয়েকটি টিমে ভাগ করে তাদের আলাদা আলাদা দায়িত্ব প্রদান করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিকভাবে তাদের কার্যক্রম তদারকি করি এবং সর্বশেষে আমি নিজেই অভিযান টিমে নেতৃত্ব প্রদান করি।
“সর্বোপরি ওই ইউনিটের অভিযান টিমগুলোর কঠোর পরিশ্রমের অংশ হিসেবে ওই মামলার মূল রহস্য এত দ্রুত সময়ে উদঘাটন করা সম্ভব হয়।”
আসামিদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে এবং মামলাটির পরবর্তী তদন্ত চলমান আছে বলেও জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।
আগের সংবাদ