Published : 08 Aug 2025, 08:30 AM
‘জুলাই অভ্যুত্থানের’ পর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও স্বপ্ন দেখেছিল নিপীড়নমুক্ত, স্বচ্ছ ও গণতান্ত্রিক একটি ক্যাম্পাসের। তাদের সে আশা অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পদ্ধতিতে প্রশাসনের দায়িত্বে আসা শিক্ষকরা।
তবে বছর পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বরং আবাসন সংকট, নিম্নমানের খাবার, রাজনৈতিক সহাবস্থানের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন অনেক শিক্ষার্থী।
কতদূর এগোল ‘শতভাগ আবাসিকতার’ প্রতিশ্রুতি?
প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর মিলিয়ে শিক্ষার্থী রয়েছেন প্রায় ৩২ হাজার।
এর বিপরীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭টি আবাসিক হলে আসন রয়েছে ১০ হাজারের মতো। অর্থাৎ প্রতি তিনজন শিক্ষার্থীর দুজনই শিক্ষাজীবনে আবাসিক হলে থাকার সুযোগ পান না।
তবে গত বছরের জুলাইয়ের পট পরিবর্তনের পর দ্বায়িত্ব নেওয়া প্রশাসন জানিয়েছিল, তারা শিক্ষার্থীদের আবাসিক সমস্যার নিরসনে বিশেষ গুরুত্ব দিবে।
তবে বছর ঘুরে দেখা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ আমলের প্রশাসনের সময় থেকে নির্মাণাধীন দুটি হলের কাজ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আবাসন সমস্যা দূরীকরণে কোনো ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বরং গত মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার হলে গণরুম থেকে ১১ শিক্ষার্থীকে বের হতে নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে নমনীয় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় প্রশাসন।
এদিকে হলের সিট বরাদ্দের ক্ষেত্রে এখনও পক্ষপাতের অভিযোগও তুলেছেন অনেকে।
দীর্ঘদিন ধরে ‘জুলাই ৩৬’ হলের (পুরাতন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল) গণরুমে বসবাসরত উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তিসা খাতুন বলেন, “তৃতীয় বর্ষে উঠেও এখনও হলের রুমে সিট পাইনি। গণরুমে দমবন্ধ করা পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা, ডাবলিং প্রথা ও ব্যক্তিগত পরিসরের অনুপস্থিতি এখনো বিদ্যমান।”
শহীদ জিয়াউর রহমান হলের শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম বলেন, অগাস্ট পরবর্তী সময় দুই মেয়াদে ফলাফলের মাধ্যমে একশ পঞ্চাশের অধিক আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেও বিভিন্ন রাজনৈতিক সুপারিশে অনেককেই অবৈধভাবেও আবাসিকতা প্রদান করা হয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
অন্যদিকে হলগুলোতে মেধার ভিত্তিতে আসন বরাদ্দ নিয়েও সমালোচনা করেন অনেক শিক্ষার্থী।
শামসুজ্জোহা হলের শিক্ষার্থী শাকিল আহমেদ বলেন, “যারা একবার মেধার পরিচয় দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলো, তাদের আসন পেতে আবার কেন মেধার পরিচয় দিতে হবে?
“নিম্নবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা টিউশন করতে গিয়ে পড়ালেখায় সময় দিতে পারে না। তখন ফলাফল খারাপ হওয়ায় হলে সিট না পাওয়াটা তাদের প্রতি অবিচার।”
তবে বিজয় ২৪ হলের প্রাধ্যক্ষ ও হল প্রাধ্যক্ষ পরিষদের আহ্বায়ক জামিরুল ইসলাম দাবি করেন, “আবাসনে এখন পুরোপুরি মেধার ভিত্তিতে সিট বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আবেদনকারীদের স্কোর করে তালিকা তৈরি করা হয়েছে, যাতে স্বচ্ছতা বজায় থাকে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ফরিদ খান বলেন, “আবাসন ব্যবস্থাপনায় একটি শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। শিক্ষার্থীরা এখন আবেদনের মাধ্যমে সঠিক নিয়মে হলে সিট বরাদ্দ পাচ্ছে। চারটি নতুন হলের বিষয়ে প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরির পর্যায়ে আছে। এ ছাড়া নির্মাণাধীন হল দুটির কাজ চলমান। আশা করি দ্রুত হল দুটিতে শিক্ষার্থীরা আবাসনের সুযোগ পাবে।”
অন্যদিকে অভিযোগ রয়েছে, ‘মেস ব্যবসা’ টিকিয়ে রাখতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষকই শতভাগ আবাসিকতা চান না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, “আমাদের অধিকাংশ শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশে কাজলা, বিনোদপুর, মেহেরচণ্ডীর মতো জায়গায় মেস রয়েছে। শতভাগ আবাসিক হলে এই মেস ব্যবসার কী হবে? আমি মনে করি, এ কারণেই প্রশাসন শতভাগ আবাসিকতার উদ্যোগই গ্রহণ করে না।”

ডাইনিংয়ে ‘ভর্তুকি’র প্রতিশ্রুতি, কী খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় প্রতিটি হল থেকেই খাবার নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা উঠে এসেছে। বিভিন্ন হলের ডাইনিং বন্ধ হয়ে কেটারিং সিস্টেম চালু হলেও খাবারের মানে কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
হবিবুর হলের শিক্ষার্থী শহিদুল ইসলাম বলেন, “খাবারের মান আগেও যেমন ছিল এখনো তেমনই আছে। আন্দোলনের পরে খাবারের তালিকায় শুধু কিছু ভর্তা যুক্ত করা হয়েছে। যেগুলো শিক্ষার্থীরা মূল টাকার বাহিরে কিনে খেতে পারে। এর বাইরে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না।”
আমির আলী হলের আবাসিক শিক্ষার্থী শাহিদ আলী বলেন, “এগুলো এক ধরনের ভোগান্তি। সারাদিন ক্লাস শেষে রুমে এসে আবার বাইরে খেতে যেতে ইচ্ছা হয় না। আবার বাইরের খাবারের মূল্য এত বেশি যে, বাধ্য হয়ে এসব নিম্নমানের খাবারই খেতে হয়। সত্যি বলতে এখানে পড়াশোনার চেয়ে খাবারের চিন্তাই বেশি কাজ করে।”
বেগম রোকেয়া হলের শিক্ষার্থী আসিয়া আকতার কটাক্ষ করে বলেন, “হলের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকা অবশ্যই সম্ভব। পুষ্টি নিশ্চিত করার দায় তো প্রশাসনের নেই! তারা মাঝেমাঝে বিভিন্ন হলের ডাইনিং এ শিক্ষার্থীদের সাথে একবেলা খেয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলেই আমরা খুশি!”
তবে প্রাধ্যক্ষ জামিরুল ইসলাম বলেন, “খাবারে সরাসরি ভর্তুকি না থাকলেও অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভর্তুকি থাকে। আগে যারা পেশিশক্তির জোরে বাকি খেত, তাদের সংখ্যা এখন শূন্যের কোটায়। ফলে খাবারের মানে পরিবর্তন হয়েছে বলেই শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে।”
রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিতে প্রশাসন কেবলই 'দর্শক'?
জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের প্রধান দাবি ছিল ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করা। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সহাবস্থানের প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।
এর মধ্যেই ৩৫ বছর পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-রাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে কয়েক দফা পিছানোর পর ১৫ সেপ্টেম্বর ভোট গ্রহণের তারিখ রেখে এই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। তার মধ্যে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কা আছে শিক্ষার্থীদের।
এর মধ্যেই ছাত্রদলের সঙ্গে আলোচনা না করেই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে এমন অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেছেন, “জীবন দিয়ে হলেও ষড়যন্ত্রমূলক রাকসু নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।”
এদিকে, ২৭ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাম সংগঠনগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক ছাত্রজোটের’ মিছিলে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘শাহবাগবিরোধি জোটের’ নেতাকর্মীরা হামলা চালায় বলে অভিযোগ উঠেছিল।
এ ঘটনায় ২ পক্ষই বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জানায়। তবে তা নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও উদ্যোগ দৃশ্যমান হয়নি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান বলেন, "তদন্ত কমিটি এই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে কাজ করেছে। তদন্তের রিপোর্ট আশা করি কয়েকদিনের মধ্যে দিয়ে দিতে পারবো।"
সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, “আগে যেমন ছাত্রলীগ ছিল, এখনো একটি বিশেষ ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য রয়েছে। ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত হয়নি। আমাদের কর্মসূচিতে শিবিরের হামলার বিচার প্রশাসন এখনো করেনি। আশ্বাস দিলেও পদক্ষেপ নেয়নি।”
ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, “জুলাই পরবর্তীতে রাজনৈতিক সহাবস্থান তৈরির সুযোগ ছিল। কিন্তু আজও তদন্ত করে হামলাকারীদের বিচার করতে পারেনি প্রশাসন। এই দায়সারা আচরণ ভবিষ্যতে অস্থিরতা ডেকে আনবে।”
ছাত্রশিবির সভাপতি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, “শাহবাগবিরোধী ঐক্যের ওপর গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটই হামলা করেছিলো। আমাদের কাছে ভিডিও প্রমাণ আছে। প্রশাসনের উচিত দলের ক্ষুদ্রতার কথা না ভেবে অপরাধের ব্যাপকতা দেখে পদক্ষেপ নেয়া।
তিনি আরও বলেন. “৫ আগস্টের পূর্বের একনায়কতান্ত্রিক ধারার তুলনায় এখন ক্যাম্পাস অনেকটাই উন্নতির দিকে। তবে সবাইকে দায়িত্ব নিয়ে ভূমিকা রাখতে হবে।”
ছাত্রদল সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, “প্রশাসন শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে কিছুই করেনি। বরং চাকরি, হলের সিট প্রাপ্তি ও অন্যান্য সুযোগে দলীয় ও আর্থিক লেনদেনকে প্রশ্রয় দিয়েছে। রাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে মাত্র দুইবার বসে দায়সারা আলোচনা করেছে।”

নিরাপত্তাহীনতা, বহিরাগতের হস্তক্ষেপেও নীরবতা
গত ৩০ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের (রুয়া) নির্বাচন ঠেকাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ইফতিখারুল ইসলাম মাসুদের বাসায় হাতবোমা ছোঁড়া হয়।
বিএনপি-ছাত্রদলের হুমকির মুখে নির্বাচন কমিশনার পদত্যাগ করেন বলে জানা গেছে। তখন ছাত্রশিবির সভাপতি ‘অহিংস থেকে সহিংস’ হবার হুমকি দিয়েছিলেন।
তবে হাতবোমা ঘটনায় মামলা ও তদন্ত নিয়ে প্রশাসন কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, “এই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মতিহার থানা দেখভাল করছে। প্রচলিত আইনে মামলা দায়ের হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেটি নিয়ে কাজ করে না।”
এ ছাড়াও ১৭ জুলাই ও ৩০ জুলাই দুটি ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন কর্মকর্তা এবং একজন চিকিৎসককে নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে বহিরাগতদের বিরুদ্ধে।
চিকিৎসাকেন্দ্রে একজন ফিজিওথেরাপিস্টকে বিবস্ত্র করে মারধর করা হয়। কিন্তু এসব প্রশাসন এখনও নীরব। এমনকি কোনো মামলাও করতে পারেনি।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট থাকার কথা জানিয়ে প্রক্টর বলেন, “কর্মকর্তাদের পুলিশে দেওয়ার ঘটনার পর আমরা নিরাপত্তা জোরদার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করেছি। আর চিকিৎসা কেন্দ্রের ঘটনায় ভুক্তভোগী মামলা করতে রাজি হননি।
“এক্ষেত্রে প্রশাসন মামলা করতে চাইলেও কেউ সাক্ষ্য দিতে রাজি নয়। তবে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি।”
জানতে চাইলে উপ-উপাচার্য ফরিদ খান বলেন, “আমরাও এই বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন। বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে ঢুকে অরাজকতা সৃষ্টি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাপারে আমরা পুলিশ প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি এবং ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
“মেডিকেল সেন্টারের বিষয়টি অত্যন্ত আতঙ্কের। এভাবে কর্মক্ষেত্র থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে পেটানো অত্যন্ত দুঃখজনক। এই ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বরদাস্ত করা হবে না। এই বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কথা চলছে। সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া এবং গ্রেপ্তারের বিষয়ে আলোচনা চলছে।"