Published : 01 Sep 2025, 11:15 PM
বহিরাগতদের হামলার পর প্রশাসনের হল ছাড়ার নির্দেশনা প্রত্যাখ্যান করে উপাচার্যের ক্ষমা চাওয়াসহ ছয় দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যেতে অনড় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) শিক্ষার্থীরা।
সোমবার দিনভর আন্দোলনের মধ্যে সন্ধ্যার পর থেকে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে ক্যাম্পাসে। আর শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং জেলা প্রশাসন একে অপরকে দায়ী করছে।
রোববারের হামলার ঘটনায় উপাচার্যের ক্ষমা চাওয়াসহ ছয় দফা দাবিতে সাড়া না মেলায় বিকাল ৪টায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। আড়াই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে যাত্রীদের দুর্ভোগ বিবেচনা রেলপথ থেকে সরে আসেন শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ কে এম ফজলুল হক ভূঁইয়া বলছেন, বিষয়টি তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, জেলা প্রশাসক যা ভালো মনে করবেন তাই হবে।
আর ময়মনসিংহের ডিসি মুফিদুল আলম বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই দেখবে। সেখানে তাদের বলার কিছু নেই।

প্রশাসনের নির্দেশ প্রত্যাখ্যান, শিক্ষার্থীদের ৬ দফা
প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী সোমবার ভোর থেকে কিছু ছাত্রী হল ত্যাগ করলেও ছাত্ররা আগের দিনের হামলার ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে এতে নারী শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে বিকাল ৪টার দিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন হলের শিক্ষার্থীরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে কে আর মার্কেটের সামনে জড়ো হন। সেখান থেকে বিক্ষোভ করে প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমতলায় সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশুপালন অনুষদের শিক্ষার্থী এ এইচ এম হিমেল ২টার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে হল ত্যাগের নির্দেশনা প্রত্যাখ্যানসহ ছয় দফার আলটিমেটাম দেন।
দাবির মধ্যে রয়েছে-
হল ছাড়ার নির্দেশনা প্রত্যাহার, হলগুলোতে সকল সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে, প্রক্টরিয়াল বডিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পদত্যাগ, হামলার ঘটনায় উপাচার্যকে প্রকাশ্যে ক্ষমা, হামলার সঙ্গে জড়িত শিক্ষক কৃষি অনুষদের আসাদুজ্জামান সরকার, তোফাজ্জল, শরীফ, রাফি, বজলুর রহমান মোল্লা, মনির, আশিকুর রহমান, কামরুজ্জামানসহ বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’ অনতিবিলম্বে প্রদান করতে হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো সাড়া না আসায় বিকাল ৪টার দিকে জব্বারের মোড় এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথ অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় বিভিন্ন স্টেশনে বেশ কয়েকটি ট্রেন আটকা পড়ে। এতে ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।

সাধারণ যাত্রীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে অবরোধের আড়াই ঘণ্টা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রেলপথ ছেড়ে দেন শিক্ষার্থীরা। পরে রেল চলাচল স্বাভাবিক হয়।
শিক্ষার্থী মাহফুজুর রহমান বলেন, “যৌক্তিক দাবিতে আন্দোলন চলছে। প্রশাসনের সাড়া না পাওয়ায় রেলপথ অবরোধ করতে বাধ্য হয়েছি। কষ্টের বিষয় বহিরাগতের দিয়ে প্রশাসন আমাদের ওপর হামলা চালিয়েছে। আমরা নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। তবে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।”
যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
আগের দিন শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখা নিয়ে সোমবার বিকালে বিবৃতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার হেলাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পশুপালন ও ভেটেরিনারি অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের দীর্ঘদিনের ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’র দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৩১ অগাস্ট অনুষ্ঠিত অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল সভায় সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ গৃহীত হলেও পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
সভা চলাকালে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তিন শতাধিক শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে তালাবদ্ধ করে রাখেন বলে বিবৃতিতে বলা হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ওইদিন বেলা ১১টায় অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভার আহ্বান করা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন ২৫১ শিক্ষক। কমিটির দেওয়া ছয় দফা সুপারিশ নিয়ে আলোচনার পর তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।
শুরুতে শিক্ষার্থীরা সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হয়ে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর প্রস্তুতি নিলেও একটি ‘স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে’ পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায় বলে দাবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফজলুল হক ভূঁইয়া বলেন, “শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া নিয়ে এককভাবে আমার কিছু করার নেই। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের জরুরি সভায় সুন্দর সিদ্ধান্ত হয়েছিল কিন্তু শিক্ষার্থীরা তা না মেনে বিপথে হেঁটেছে।
“উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হল ছাড়ার নির্দেশনা না মেনে তারা আন্দোলন করছে। বিষয়টি এখনো আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, জেলা প্রশাসক যা ভালো মনে করবেন তাই হবে।”
কী বলছেন ডিসি
ঘটনার বিষয়ে জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রক্টরের পক্ষ থেকে তাদের উদ্ধারের জন্য অনুরোধে আমরা সেখানে যাই। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে কনভেন্স করার চেষ্টা করছিলাম। হঠাৎ একজন শিক্ষক অচেতন হয়ে গেলে তাকে বের করে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিলাম।
“এ সময় ধর ধর বলে একদল লোক মিছিল নিয়ে ছাত্রদের ওপর চড়াও হয়। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে বলে আমাকে আশ্বস্ত করেছ। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যাচাই বাছাই করে দেখবে তারা (হামলাকারী) কারা।
হামলা ঠেকাতে পুলিশকে পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “পুলিশ তো বলতে গেলে একদম নিরস্ত্র। সেখানে হাতে গোনা কয়েকজন পুলিশ ছিল। পুলিশ তো সেখানে যেতেই চায়নি। কারও হাতে অস্ত্রও ছিল না। ছাত্ররা পুলিশকে এলাউ করছিল না।
“পুলিশের জানের একটা ভয় আছে না, ওখানে সবার হাতে লাঠিসোঁঠা ছিল। ওই মুহূর্তে প্রটেস্ট করে পুলিশ কী বেরিয়ে আসতে পারত? আমরা নিজেরাও তো অ্যাসল্ট হয়ে যেতাম। ওদের (হামলাকারীদের) মোকাবেলা করার মত সক্ষমতা সে সময় পুলিশের ছিল না।”
তবে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই দেখবে; সেখানে জেলা প্রশাসনের বলার কিছু নেই বলে জানান মুফিদুল আলম।
যেভাবে আন্দোলনের শুরু
ভেটেরিনারি অনুষদ এবং পশু পালন অনুষদের শিক্ষার্থীদের প্রায় এক মাস ধরে ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’র দাবিতে আন্দোলন করছেন। দুই অনুষদের ডিগ্রিকে একীভূত করে একটি ‘কম্বাইন্ড ডিগ্রি’র দাবি তাদের।
এ নিয়ে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভোটাভুটি অনুষ্ঠিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
রোববার অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় বিষয়টি সমাধান না হওয়ায় দুপুরের পর থেকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন মিলনায়তনে উপাচার্যসহ আড়াই শতাধিক শিক্ষক-কর্মকর্তাকে আটকে রেখে সামনে তালা মেরে দেন শিক্ষার্থীরা।
এক পর্যায়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে উপাচার্যের বাসভবনের পাশ থেকে ২৫০ থেকে ৩০০ জন বহিরাগত অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া দেয়। এতে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লে বহিরাগতরা তালা ভেঙে দিলে অবরুদ্ধরা বেরিয়ে যায়। এ সময় সাংবাদিকসহ ১০ শিক্ষার্থী আহত হন।
এ ঘটনার প্রতিবাদে তাৎক্ষণিক হল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বের হয়ে উপাচার্যের বাসভবন ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেন।
এমন পরিস্থিতিতে রাত সাড়ে ৯টায় অনলাইনে জরুরি সিন্ডিকেট সভা করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সেইসঙ্গে সোমবার সকাল ৯টার মধ্যে শিক্ষার্থীতের হল ত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে মোতায়েন করা হয় দুই প্লাটুন বিজিবি, সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশ।
বাকৃবি শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধ, ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেন বন্ধ
উপাচার্যকে ক্ষমা চাইতে বললেন বাকৃবি শিক্ষার্থীরা, অন্যথায় ‘কঠোর আন্দোলন’
হল ছাড়ার নির্দেশের প্রতিবাদে বাকৃবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
বাকৃবিতে কঠোর নিরাপত্তা, হল ছাড়ছেন শিক্ষার্থীরা
বহিরাগতদের হামলার পর বাকৃবি বন্ধ ঘোষণা, হল ছাড়ার নির্দেশ
বাকৃবিতে অবরুদ্ধ শিক্ষকদের উদ্ধারে হামলা, শিক্ষার্থীসহ আহত ১০
বাকৃবিতে ভিসিসহ দুই শতাধিক শিক্ষককে অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ