Published : 10 Jan 2026, 04:12 PM
কয়েক বছর ধরে ভাইরাসের আক্রমণে পাঙাশ মাছের মড়কে দিশেহারা খামারিরা। এবারও ময়মনসিংহে কয়েকশ কোটি টাকার মাছ মরেছে।
‘মড়ক’ ঠেকাতে ভাইরাস প্রতিরোধে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন উদ্ভাবন করেছেন; যার সফলতাও মিলেছে। শিগগির খামারি পর্যায়ে তা সরবরাহের কথা রয়েছে। আর এতে নতুন করে আশার আলো দেখছেন মৎস্যচাষিরা।
ময়মনসিংহকে বলা হয় ‘মাছের রাজধানী’। বিশেষ করে ত্রিশাল, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া ও ভালুকা উপজেলার গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো পাঙাশ চাষ। জেলায় বছরে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার মাছ উৎপাদন হয়। এই সমৃদ্ধির অধিকাংশ আসে পাঙাশ চাষ থেকে।
কিন্তু বর্তমানে মরণঘাতী ভাইরাসের আক্রমণে দিশেহারা প্রায় পাঁচ লাখ মৎস্যজীবী। তবে এই হতাশার মাঝে আশার আলো ছড়াতে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের নতুন পাঙাশ ভ্যাকসিন।
মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. সিরাজুম মনির বলেন, কয়েক বছর ধরে ময়মনসিংহের পাঙাশ খামারিদের প্রধান শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ‘ব্যাকটেরিয়াল হেমোরেজিক সেপ্টিসেমিয়া’ নামক ভাইরাস।
শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যখন পানির তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে তখন পাঙাশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে যায়। এই সুযোগে আক্রমণ করে বসে আরোনোমাস হাইড্রোফিলা নামক এক শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া।
পাঙাশ চাষিরা বলছেন, এ রোগে আক্রান্ত মাছের পেটের নিচে রক্তাক্ত দাগ দেখা দেয়। ভেতর থেকে লিভার বা কলিজা পচে যায়।
সিরাজুম মনিরের দীর্ঘ গবেষণায় জানা যায়, পাঙাশের আরও একটি ঘাতক রোগ হলো ‘ইন্টারিক সেপ্টিসেমিয়া অফ ক্যাটফিশ-ইএসসি’। এর জীবাণু অ্যাডওয়ার্ডসিলা ইক্টালুরি। এটি মাছের মাথায় ছোট ছিদ্র করে ফেলে, যাকে স্থানীয়রা ‘মাথা পচা’ রোগ বলেন।

মৎস্য চিকিৎসকদের মতে, পুকুরের তলদেশে ময়লা জমে অ্যামোনিয়া গ্যাস বেড়ে এই রোগের প্রকোপ দেখা দেয়।
অতিরিক্ত ঘনত্ব ও পরিবেশগত বিপর্যয়
মৎস্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অধিক মুনাফার লোভে খামারিরা ‘ওভার স্টকিং’ বা অতিরিক্ত ঘনত্বের ফাঁদে পা দিচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী, এক বিঘা জলাশয়ে তিন থেকে চার হাজার পোনা থাকার কথা। কিন্তু সেখানে ১০ থেকে ১২ হাজার পোনা ছাড়া হচ্ছে।
পাঙাশ মাছ প্রচুর বর্জ্য ত্যাগ করে। এই বর্জ্য পচে পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমিয়ে দেয়। যখনই অক্সিজেন ৩ দশমিক ০ পিপিএম-এর নিচে নামে, তখনই মাছ প্রচণ্ড চাপে পড়ে এবং সুপ্ত থাকা জীবাণুগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে।
রোগের পাশাপাশি খামারিদের পিঠ ঠেকেছে দেওয়ালে। পাঙাশ চাষের খরচের ৮০ শতাংশই যায় খাবারে। গত দুই বছরে মাছের খাবারের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা বেড়েছে। এক কেজি পাঙাশ উৎপাদন করতে এখন খরচ হচ্ছে ১১০ থেকে ১২০ টাকা।
অথচ বাজারে তা বিক্রি করতে হচ্ছে ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায়। এর মধ্যে যদি ভাইরাসজনিত মড়ক দেখা দেয়, তবে খামারিকে সরাসরি লোকসান গুণতে হয়। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে দাদন ব্যবসায়ী ও এনজিওরা। ঋণের কিস্তি শোধ করতে না পেরে অনেক খামারি এখন সর্বস্বান্ত।
বিএফআরআইয়ের ভ্যাকসিন উদ্ভাবন
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘মিঠাপানির মাছের রোগ প্রতিরোধে ভ্যাকসিন উদ্ভাবন’ প্রকল্পের আওতায় তৈরির দ্বারপ্রান্তে রয়েছে পাঙাশের বিশেষ ভ্যাকসিন। এটি কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নেই। মাঠ পর্যায়েও এর অভাবনীয় সাফল্য পাওয়া গেছে বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের।
ভ্যাকসিন তৈরির নেপথ্যের গল্প
গবেষকরা মাঠ পর্যায় থেকে আক্রান্ত মাছ সংগ্রহ করেন। এরপর মাছের কিডনি, লিভার, ব্রেইন ও প্লীহা থেকে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া আলাদা করা হয়। ল্যাবে সেগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে একটি ‘নিষ্ক্রিয়’ ভ্যাকসিন প্রস্তুত করা হয়। এতে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক ন্যানো পার্টিকেল প্রযুক্তি।
কীভাবে কাজ করে এই ভ্যাকসিন
ভ্যাকসিনটি মূলত দুই ধাপে প্রয়োগ করা হচ্ছে। প্রথমে বড় বা ব্রুড পাঙাশ মাছকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়। এতে ওই মাছ থেকে যে পোনা উৎপন্ন হয় তার শরীরে জন্মগতভাবেই দুই মাস পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়।
এ ছাড়া সাধারণ খামারিদের সুবিধার্থে মাছের খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে এই ‘ওরাল ভ্যাকসিন’ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের ফলাফল
বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সিরাজুম মনির বলেন, ময়মনসিংহের ত্রিশাল এবং ঈশ্বরগঞ্জের পাঁচটি খামারে এই ভ্যাকসিনের ট্রায়াল চালানো হয়েছে। ফলাফল ছিল রীতিমতো চমকপ্রদ। সাধারণ পোনার বেঁচে থাকার হার যেখানে ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ; সেখানে ভ্যাকসিন নেওয়া পোনার ক্ষেত্রে তা ৮০ শতাংশের বেশি।
বিএফআরআইয়ের পরীক্ষায় দেখা গেছে, ভ্যাকসিন দেওয়া মাছের রক্তে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া পুরো চাষকালীন সময়ে ভ্যাকসিন দেওয়া মাছের মধ্যে কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ দেখা যায়নি।

বিএফআরআইয়ের মৎস্য বিজ্ঞানীদের মতে, কেবল ওষুধ ছিটিয়ে বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়। খামারিদের ‘গুড অ্যাকুয়াকালচার প্র্যাকটিস’ বা উত্তম মৎস্য চাষ পদ্ধতিতে ফিরতে হবে। এক্ষেত্রে ভ্যাকসিন হবে প্রধান হাতিয়ার। চলতি বছরের জুনের দিকে এই ভ্যাকসিন বাজারজাত করা সম্ভব হবে।
যা বলছেন খামারিরা
ত্রিশাল উপজেলার হ্যাচারি ব্যবসায়ী আব্দুল কাইয়ুম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে হ্যাচারি ব্যবসায় আছি, কিন্তু গত কয়েক বছরে পাঙাশের মড়ক আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। বিএফআরআইয়ের পরামর্শে ব্রুড (মা-বাবা) মাছগুলোকে ইনজেকশনের মাধ্যমে ভ্যাকসিন দেই।
“অবাক হয়ে দেখলাম, এ মা মাছ থেকে উৎপাদিত পোনাগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। আগে যেখানে পোনা ছাড়ার পর বড় হওয়া পর্যন্ত অর্ধেক মাছই মারা যেত এখন সেখানে লোকসান নেই বললেই চলে। জেলার অন্য খামারিরাও এখন এ ভ্যাকসিন দেওয়া পোনার খোঁজ করছেন।”
ভালুকার পাঙাশ চাষি আশরাফুল আলম বলেন, “এ অঞ্চলে পাঙাশ চাষ এখন অনেকটা জুয়া খেলার মতো হয়ে গিয়েছিল। খাবার কিনতে গিয়ে পকেটে টাকা থাকে না, তার ওপর যদি মড়ক লাগে তবে পথে বসা ছাড়া উপায় ছিল না।
“আমি ট্রায়াল হিসেবে আমার পুকুরে ওরাল ভ্যাকসিন (খাবারের সঙ্গে মেশানো) ব্যবহার করেছি। এবার শীতের শুরুতে যখন আশপাশের পুকুরে ‘মাথা পচা আর ‘লাল দাগ’ রোগ ছড়ায়। তবে আমার পুকুরের মাছ তখনো একদম সুস্থ ছিল।
“মাছের বৃদ্ধিও হয়েছে, চোখে পড়ার মতো। এই ভ্যাকসিন বাণিজ্যিকভাবে বাজারে আসলে আমাদের মতো সাধারণ চাষিরা নতুন জীবন পাবে।”
ত্রিশালের আরেক খামারি সাইফুল ইসলাম বলেন, “অজানা রোগে এবারও পুকুরের ৫০ হাজার পাঙাশ মরে গেছে। ওষুধ প্রয়োগ করেও কোনো লাভ হয়নি। শুনছি বাজারে পাঙাশের মড়ক রোধে ভ্যাকসিন আসছে। তবে তা যদি কাজে লাগে তাহলে, পাঙাশ চাষ করব না হয় ছেড়ে দেব।”
১২ জন গবেষকের তিন বছরের প্রচেষ্টায় সফলতার কথা জানিয়েছে গবেষণা দলের সদস্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ফারজানা জান্নাত আঁখি। তিনি বলেন, “মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় কোম্পানির মাধ্যমে অচিরেই বাজারে ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হবে।
“এতে খামারিরা সাশ্রয়ী মূল্যে ভ্যাকসিন ক্রয় করে পাঙাশ চাষে বিপ্লব ঘটাতে পারবে। এর মধ্যে আমাদের সঙ্গে ভ্যাকসিন নিতে যোগাযোগ শুরু করেছেন অনেকেই।”