১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

কুমিল্লায় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬২ ট্রান্সফর্মার, ভেঙেছে ৮৪ খুঁটি

বৃহস্পতিবার রাত থেকে পুরো জেলা জুড়ে যে বিদ্যুৎ বিপর্যয় শুরু হয়, তা দুদিন পরেও শতভাগ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি।

কুমিল্লায় ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৬২ ট্রান্সফর্মার, ভেঙেছে ৮৪ খুঁটি
ঘূর্ণিঝড়ের কবলে কুমিল্লায় ট্রান্সফরমারসহ ভেঙে পড়া খুঁটি।

কুমিল্লা প্রতিনিধি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 01 Jun 2025, 12:04 PM

Updated : 10 Sep 2026, 12:43 PM

ঘূর্ণিঝড়ের কবলে লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে কুমিল্লার বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। কোথাও খুঁটি ভেঙে গেছে, কোথাও হেলে পড়েছে। আবার কোথাও ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বা তার ছিঁড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। 

এতে বৃহস্পতিবার রাত থেকে পুরো জেলা জুড়ে যে বিদ্যুৎ বিপর্যয় শুরু হয়, তা দুদিন পরেও শতভাগ সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। 

কুমিল্লায় বিদ্যুৎ বিতরণে জড়িত চারটি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘূর্ণিঝড়ে তাদের ৮৪টি খুঁটি ভেঙে গেছে। ট্রান্সফরমার বিকল হয়েছে ৬২টি এবং প্রায় সাড়ে চারশ স্থানে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গেছে।

এছাড়াও দুইশতাধিক স্থানে খুঁটি হেলে যাওয়া, শতাধিক স্থানে ক্রস আর্ম ভেঙে, দেড়শতাধিক স্থানে ইনসুলেটর ও তিন শতাধিক স্থানে মিটার ভেঙে বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটে। প্রাথমিকভাবে অন্তত আড়াই কোটি টাকার ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করছে সমিতিগুলো। 

এছাড়া প্রতিটি সমিতির ৩০ শতাংশ লাইনম্যান আন্দোলনে অংশ নিতে ঢাকায় যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগ মেরামতে হিমশিম খাচ্ছে সমিতিগুলো। 

এর আগে বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে ঝড়ো বাতাসে কুমিল্লা জেলার প্রায় উপজেলার বৈদ্যুতিক লাইন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে প্রান্তিক অনেক এলাকা। 

বরুড়া উপজেলায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনে খুঁটি ভেঙে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে পুরো উপজেলা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশেও বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক খুঁটি হেলে পড়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। 

পরে শুক্রবার ২৪ ঘণ্টায়ও জেলার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ লাইন চালু করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এতে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ দেখা দেয়। বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল ফোনের চার্জ বন্ধ হয়ে যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। 

পরে শনিবারে ব্যাপক চেষ্টার পর অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ সচল করা হলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে ভোগান্তির অভিযোগ করেছেন অনেকে।

কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার শ্রীমন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, “বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় ঘুর্ণিঝড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর শনিবার রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত আমাদের এলাকায় বিদ্যুৎ আসেনি। মোবাইল ফোন বন্ধ হয়ে গেছে আগেরদিন। ফ্রিজ থেকে পানি বের হয়ে সব মালামাল নষ্ট হয়ে গেছে।” 

চান্দিনা উপজেলার সব্দলপুর গ্রামের বাসিন্দা সোহেল রানা বলেন,  বৃহস্পতিবার বিকাল থেকেই আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যায় একটু উঁকি দিয়ে ঘণ্টাখানেক ছিল। তারপর সেই বিদ্যুৎ আসে শুক্রবার বিকালে। ততক্ষণে আমার হেচারীর শতশত মুরগীর ডিম নষ্ট হয়ে গেছে।

জানা গেছে কুমিল্লা মহানগরীসহ ১৭টি উপজেলা এবং পাশের দুটি জেলার আরও দুই উপজেলায় বিদ্যুৎ বিতরণ করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এবং পল্লী বিদ্যুতের চারটি সমিতি।

তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন কুমিল্লা মহানগরী এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ স্বাভাবিক আছে। ঘূর্ণিঝড়ে এ এলাকায় বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির কথা জানা যায়নি। 

কুমিল্লার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক আবু রায়হান বলেন, তার অধীনে থাকা চারটি উপজেলায় ২৫টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙ্গে ১৯টি ট্রান্সফরমার বিকল হয় এবং ১৫৫ স্থানে বিদ্যুতের তার ছিড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয় চান্দিনা উপজেলায়। ওই উপজেলাতেই আটটি বিদ্যুতের খুঁটি ভেঙে গেছে। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর জেষ্ঠ্য মহাব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, তার সমিতির অধীনে থাকা ছয়টি উপজেলায় সাতটি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে এবং ১৩টি ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৩ এর মহাব্যবস্থাপক মুজিবুল হক বলেন, তার সমিতির অধীনে থাকা ছয় উপজেলায় সর্বোচ্চ ৪৩টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে এবং ১৮টি ট্রান্সফরমার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই সমিতির অধীনে ১৮০টি স্থানে বৈদ্যুতিক তাঁর ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪ এর মহাব্যবস্থাপক শহীদ উদ্দীন বলেন, তার অধীনে থাকা তিনটি উপজেলায় ৯টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে ১২টি ট্রান্সফরমার বিকল হয় এবং ১৭৬টি স্থানে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়- প্রতিটি সমিতিতে ১-২শ লাইনম্যান নিয়োজিত। কিন্তু আন্দোলন করতে তারা ঢাকায় আছে ৩০ শতাংশ। তাই এই বিপর্যয়ের সময় লাইনম্যানের সংকটে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ঘুর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ লাইন সংস্কারে বহিরাগত লোকজন দিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। 

কুমিল্লা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মহাব্যবস্থাপক মো. আবু রায়হান বলেন- ঘূর্ণিঝড়ে বৈদ্যুতিক লাইন অনেক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তবে ঝড়ের রাত থেকেই আমাদের লোকজন কাজ করছে। বর্তমানে আমাদের সবগুলো লাইনই চালু আছে, তবে বিভিন্ন সেকশন বন্ধ থাকায় কিছু কিছু এলাকায় গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। দ্রুতই সেসব এলাকায় সমস্যার সমাধান করা হবে।