চালক সিগন্যাল না মানায় নীলসাগর এক্সপ্রেস দুর্ঘটনা, ধারণা রেলওয়ের
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে রেলের প্রধান পরিবহন কর্মকর্তার নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে৷
চালক সিগন্যাল না মানার কারণে ঢাকা থেকে নীলফামারীর চিলাহাটিগামী নীলসগর এক্সপ্রেস ট্রেনটি বগুড়ার আদমদীঘিতে লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে বলে ধারণা করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
বুধবার দুপুরে দুর্ঘটনার পর রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম সিদ্দিকী রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান।
তিনি বলেন, “ট্রেনটি ঢাকা থেকে চিলাহাটির উদ্দেশে সকাল পৌনে ৭টায় ছেড়ে যায়। সান্তাহার (২৮৩ কিলোমিটার) স্টেশন পার হয়ে তিলকপুর স্টেশনের দিকে যাওয়ার সময় ব্যানার সিগন্যাল অনুসরণ না করায় ২৮৬ কিলোমিটারে, তথা বগুড়া জেলার আদমদিঘি উপজেলার বাগমারি এলাকায় নয়টি কোচ লাইনচ্যুত (ডিরেইলড) হয়।
“দুর্ঘটনার প্রাক্কালে প্রকৌশল বিভাগের লোকজন ব্যানার ফ্ল্যাগ ধরে ও কশান মেসেজ দিয়ে রেল চেঞ্জের কাজ করছিল। স্টেশন হতেও কশান অর্ডার দেওয়া হয়। তা লোকো ড্রাইভার অনুসরণ না করায় ডিরেইলমেন্টের কারণ হিসাবে ধারণা করা হচ্ছে।”
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এতে আহত হয় ৬৬ জন। এর মধ্যে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ২০ জন চিকিৎসাধীন। ৪০ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে এবং ছয় জনকে বগুড়া আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, রেলের প্রধান পরিবহন কর্মকর্তার নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে৷ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন যন্ত্র প্রকৌশলী, প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান সংকেত প্রকৌশলী।
কমিটির সদস্য রেলওয়ের রাজশাহী বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী আহমেদ হোসেন মাসুম ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, “সিগন্যাল যেহেতু দেওয়া হইছে, মনে হচ্ছে একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। চালক হয়ত সিগন্যালকে সুনির্দিষ্টভাবে অনুসরণ করেননি। কিংবা এমনও হতে পারে যে সিগন্যাল হয়ত তিনি পাননি।”
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্থানীয় এক যুবক (২৫) বলেন, “আমি সকাল ৬টার দিকে এখানে আসি। দেখি (রেললাইনে) ছোটখাট একটা ফাটা। সেটার ভিডিও করি, রেলওয়ের লোকজনকে জানাই। তার আসতে একটু সময় লেগেছে। তখন আমরা দুটি ট্রেনকে স্লো করে পার করে দেই। তারপর রেলওয়ের লোকজন এসে সংস্কার কাজ শুরু করে।
“দুপুর ২টার দিকে ঢাকা থেকে নীলসাগর এক্সপ্রেস আসে। তখন যেখানে কাজ করছিল, সেখান থেকে দুদিকেই এক কিলোমিটার দূরে লাল নিশান টানিয়ে দেওয়া হয়। তারপরও ট্রেনের চালক সেই লাল ব্যানার মানেনি, সে চলে এসেছে। আসার পর অনেক চেষ্টা করছে আটকানোর জন্য। সেটাও মানেনি। না মানার কারণেই এখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে।”
স্থানীয় আরেক কিশোর (১৫) বলছিল, “সকাল থেকে এখানে মিস্ত্রিরা কাজ করিচ্ছে। দুপুরে নীলসাগর ট্রেনটা আসিচ্ছে। তারপর ট্রেনের রেললাইন ফাটা ছিল। ট্রেনের ড্রাইভার রেড ফ্ল্যাগ মানেনি। না মানার কারণে ট্রেন স্পিডে যাচ্ছে। তারপর ট্রেন লাইন থেকে পড়ে গেছে। অনেক লোক তখন আহত হইছে। পরে ফায়ার সার্ভিসের লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করিচ্ছে।”
ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের নিয়ে সকাল পৌনে ৭টায় ঢাকা থেকে নীলফামারীর চিলাহাটি যাচ্ছিল ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’। বেলা ২টার দিকে ট্রেনটি বগুড়ার সান্তাহার স্টেশনে থামে। সেখান থেকে ট্রেনটি তিলকপুর স্টেশনের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
কিছু সময় পর আদমদিঘি উপজেলার বাগমারি এলাকায় ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। ট্রেনের নয়টি বগি লাইন থেকে বেরিয়ে যায়।
ঈশ্বরদী ও পার্বতীপুর থেকে রিলিফ ট্রেন দুর্ঘটনাস্থল আদমদীঘির বাগমারি এলাকায় এসে বুধবার রাত পৌনে ৮টার দিকে উদ্ধার কাজ শুরু করে।
সেখানে দায়িত্বরত একজন রেলওয়ে কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মাত্র কাজ শুরু হল। বগিগুলো লাইনে তুলতে তুলতে সারারাত লেগে যেতে পারে। বগি তুলে লাইন ক্লিয়ার করতে করতে হয়ত (বৃহস্পতিবার) সকাল ৯-১০টা বেজে যেতে পারে।”
ঈদযাত্রার চূড়ান্ত মুহূর্তে বুধবার দুপুরে এ দুর্ঘটনার পর উত্তরবঙ্গের যাত্রীরা; বিশেষ করে যারা রাতে যাত্রা করবেন তারা ভ্রমণ নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যে পড়েন।
কারণ বগুড়ার সান্তাহার জংশনের যে জায়গায় ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে সেই পথ ধরেই উত্তরবঙ্গের ট্রেনগুলোকে চলাচল করতে হয়। দুর্ঘটনার পর থেকে ওই পথ দিয়ে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এই অবস্থার মধ্যে রেলওয়ে মন্ত্রণালয় যাত্রীদের ঈদযাত্রার কথা ভেবে বিকল্প পদ্ধতিতে ঢাকা-উত্তরবঙ্গে পথে ট্রেন চলানোর কথা জানিয়েছে।
তারা বলছে, পঞ্চগড় থেকে আসা এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ট্রেনের যাত্রীরা দুর্ঘটনাস্থলের দুই প্রান্তে নেমে একে অপরের ট্রেনে উঠে যাত্রা সম্পন্ন করবেন।
ঈদের মধ্যে যাত্রীদের সাময়িক অসুবিধার জন্য রেল কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে বলে মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
