Published : 28 Mar 2026, 03:14 PM
‘বেটাই দিবে হামাক মাটি, আজকে হামাক দেওয়া নাকছে বেটাক মাটি’ এমন আহাজারি করতে করতেই ছেলে ও স্ত্রীর জানাজায় অংশ নিয়েছেন গাইবান্ধার নিজপাড়া গ্রামের রাজমিস্ত্রি মো. হামিদুজ্জামান।
প্রতিবেশীদের কাঁধে ভর করে যেতে যেতে নিজের ভাষায় তিনি আরও বলেন “হামার বউ-ছোল সগি গেল, পাঁচদিন আগোত ব্যাটাক বিয়া করাচি, ব্যাটার শাশুড়িও মরি গেল। একসাতে সগলে মলো।”
শুক্রবার রাতে টাঙ্গাইলে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায় হামিদুজ্জামানের স্ত্রী নার্গিস বেগম (৩৫), ১১ বছর বয়সী ছেলে নীরব মিয়া এবং তার বড় ছেলের শাশুড়ি দোলা বেগম (৩৫)।
একসঙ্গে পরিবারের তিন সদস্যকে হারানো হামিদুজ্জামানের আহাজারি থামছিলই না। এছাড়াও একই ঘটনায় ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন এ গ্রামের আরও দুজন।
গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার ধাপেরহাট ইউনিয়নের নিজপাড়া গ্রামটি জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে।

শনিবার সকালে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামজুড়েই চলছে শোকের মাতম। নিহতদের বাড়িতে চলছে কান্না ও আত্মীয় স্বজনদের আহাজারি।
হামিদুজ্জামানের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানায়, হামিদুজ্জামান রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্ত্রী নার্গিস বেগম পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। এই দম্পতির বড় ছেলে নাঈম মিয়ার সঙ্গে পাঁচ দিন আগে বিয়ে হয় দোলা বেগমের মেয়ে জুই মনির।
পাশের ছত্রগাছা গ্রামের জাকির হোসেনের স্ত্রী দোলাও পোশাক শ্রমিক। নতুন দম্পতিকে এলাকায় রেখে দুই বেয়াইন নার্গিস ও দোলা পোশাক কারখানায় কাজে যোগ দিতে একসঙ্গে বাসযোগে ঢাকা রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তাদের এই আনন্দযাত্রা পরিণত হয় আর বিষাদময় ঘটনায়।
ওই গ্রামের বাসিন্দা ধাপেরহাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আমিনুর রহমান মিলন বলেন, এই ঘটনার পর ঈদ ও বিয়ের আনন্দমুখর গ্রামটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া।
একই গ্রামের আরেক নিহত রিপা খাতুনও (২০) পোশাক শ্রমিক। অষ্টম শ্রেণির পাশ করে চার বছর ধরে টাঙ্গাইলের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। রিপার বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ভাই বিদ্যুৎ একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ছোট দুই ভাই সবুজ (৮) ওমর (৬)।
রিপার বাবা আবদুর রশিদ কান্না জড়িত কন্ঠে বলছিলেন, “আমি কৃষক মানুষ। কোনমতে সংসার চলে। মেয়ে রিপা চার বছর ধরে পোশাক কারখানায় চাকরি করছে। টাকা উপার্জন করে সংসারে দেয়। আশা ছিল, কিছুদিন পর মেয়েকে বিয়ে দেব। সব আশা মাটি হয়ে গেল। ”
তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা কেন মরল। আমরা এর বিচার চাই।”
এ সময় রিপার মা বিলকিস বেগম অবাক হয়ে বসে ছিলেন।

নিজপাড়া গ্রামের আরেক নিহত সুলতান মিয়ার (৩০) বাড়িতেও চলছিল আহাজারি। তার বাবা আজিজুর রহমান ও মা শাহানা বেগম পাশাপাশি বসে কান্নাকাটি করছিলেন।
শাহানা বেগম কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন, “আমি ছেলেটাকে বলেছিলাম এলাকাতে কাজ কর, চাকরি করতে নিষেধ করেছিলাম। চাকরি করতে না গেলে আমার ছেলেটা মরতো না।
“হামার ছোলটা কেমন করে মরল, তোমরা হামার ছাওয়াক আনি দাও।”
ঘরের পাশে আঙিনায় মুখে কাপড় দিয়ে কান্নাকাটি করছিল নিহত সুলতানের স্ত্রী শামসুন্নাহার। তার তিন বছরের মেয়ে নাজিফা শুধু বাবাকে খুঁজছে।
সুলতানের বাবা আজিজুর রহমান বললেন, “আমার ছেলেটা চাকরি করে প্রতি মাসে টাকা পাঠাত। সেই টাকায় আমাদের সংসার চলত। এখন কে টাকা পাঠাবে।”
শুক্রবার রাত আটটার দিকে ঢাকাগামী একটি বাস টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার ধলাটেংগর এলাকায় পৌঁছালে বাসটির তেল ফুরিয়ে যায়। তখন বাসটি মহাসড়কের পাশে থেমে যায়। এ সময় বাসের কয়েকজন যাত্রী নিচে নেমে পাশের রেললাইনে বসেছিলেন। ঠিক তখনই উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকাগামী সিরাজগঞ্জ এক্সপ্রেস ট্রেন তাদের ধাক্কা দেয়।
এতে ট্রেনে কাটা পড়ে একই পরিবারের মা-ছেলেসহ পাঁচজন নিহত হন।
আগের সংবাদ