Published : 13 Jul 2026, 06:10 PM
বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে থাকে টানটান উত্তেজনা। সেই সব দুর্দান্ত লড়াইয়ের মাঝেও অদ্ভুত, অবিশ্বাস্য আর মজার ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়।
এবারের আসরের সেমি-ফাইনালের আগে অতীতের বিভিন্ন ঘটনা সামনে এনেছে ফিফা।
ফ্রান্স ১৯৩৮

১৯৩৮ বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে ইতালি। এই ম্যাচে জুজেপ্পে মেয়াৎসা করেন জয়সূচক পেনাল্টি। ‘ইল বালিল্লা’ নামে পরিচিত মেয়াজ্জাকে পেনাল্টি নেওয়ার সময় স্নায়ুচাপের পাশাপাশি সামাল দিতে হয়েছিল তার শর্টসকেও!
ম্যাচের শুরুর দিকে খানিকটা ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া তার শর্টসের ইলাস্টিক পুরোপুরি ছিড়ে যায় পেনাল্টি নেওয়ার মুহূর্তে। ইন্টার মিলান তারকা এক হাতে শর্টস সামলে পেনাল্টি থেকে করেন গোল। সেটাও পেনাল্টি ঠেকাতে বিশেষজ্ঞ গোলরক্ষক ওয়াল্তারকে পরাস্ত করে।
চিলি ১৯৬২

১৯৬২ বিশ্বকাপ সেমি-ফাইনালে চিলির বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪-২ গোলে জয়ের নায়ক গারিঞ্চা। তার দারুণ ড্রিবলিং, জোড়া গোল আর এক অ্যাসিস্টে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে স্টেডিয়ামের দর্শকরা। ফলে, স্বাগতিকদের হারিয়ে দেওয়ার পরও ঘৃণা নয়, ভালোবাসা পান গারিঞ্চা। দর্শকদের এমন ভালোবাসা পাওয়ার দিনেও তাকে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল লাল কার্ড দেখে।
এই লাল কার্ডের জন্য তিনি ফাইনালে খেলতে পারবেন না, এটা জানার পর চিলিজুড়ে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়। তাকে খেলাতে স্বয়ং চিলি প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রির নেতৃত্বে তাকে খেলাতে গণআবেদন করা হয়। শেষ পর্যন্ত গারিঞ্চাকে ফাইনালে খেলার সুযোগ দেয় ফিফা। পরে ফাইনালে চেকোস্লোভিয়াকে ৩-১ ব্যবধানে হারিয়ে শিরোপা জেতে ব্রাজিল।
স্পেন ১৯৮২
টনি শুমাখার গোলপোস্ট থেকে ছুটে এসে ফ্রান্সের পাত্রিক বাতিস্তোঁকে সজোরে আঘাত করেন। ফলে কয়েক মিনিট আগে নামা এই ফুটবলারের দুটি দাঁত ভেঙে যায়, পাঁজরে তিনটি চিঁড় ধরা পড়ে এবং মেরুদণ্ডে আঘাত পান। এ ঘটনার পরও পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষককে পেতে হয়নি কোনো শাস্তি!
স্ট্রেচারে করে সরিয়ে আনার আগে কয়েক মিনিট ধরে বাতিস্তোঁকে মাঠে দেওয়া হয় প্রাথমিক চিকিৎসা। চোট পাওয়া প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের প্রতি এ সময় কোনো ধরনের সহমর্মিতা দেখাননি শুমাখার, বরং অধৈর্যের মতো আচরণ করেন। এতে ক্ষোভে ফুসে ওঠে ফরাসি সমর্থকরা।
ওই ম্যাচে টাইব্রেকারে দুটি শট ঠেকিয়ে দলকে ফাইনালে তোলেন শুমাখার।
ইতালি ১৯৯০

যে জাতি ‘ব্রিটলম্যানিয়ায়’ বুঁদ হয়েছিল, তারা ভেসেছিল ‘গাজ্জাম্যানিয়ায়’। ২৪ বছরের মধ্যে ইংল্যান্ডকে প্রথমবার বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে তুলতে পল গ্যাসকোইনের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ‘গাজ্জা’ নামে পরিচিত এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের ফুটবলশৈলীতে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে পুরো দেশ।
সেমি-ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ৯৮তম মিনিটে হলুদ কার্ড দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন গ্যাসকোইন। কারণ, কার্ড দেখায় ইংল্যান্ড ফাইনালে উঠলে তার খেলার সুযোগ ছিল না।
এই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে গ্যাসকোইন বলেন, ‘যখন ছোট ছিলাম, যুব দলে খেলতাম, প্রতি রাতে বিশ্বকাপে খেলার স্বপ্ন দেখতাম। ইতালিতে সেই স্বপ্ন পূরণ করেছিলাম। যখন আমাকে হলুদ কার্ড দেখানো হলো, তখন বুঝলাম এখানেই শেষ আমার স্বপ্নযাত্রা।”
সেই সময়ের ইংল্যান্ড কোচ ববি রবসন বলেন, “আমি দমে গিয়েছিলাম। কারণ, তখনই বুঝেছি, পল গ্যাসকোইনের জন্য ফাইনাল শেষ। এটা তার জন্য, দলের জন্য, দেশের জন্য এবং ফুটবলের জন্য ট্র্যাজেডি। কারণ, সে প্রতিভাবান ছিল এবং ওই ম্যাচে দারুণ খেলছিল।
সেমি-ফাইনালে ওই কান্নার পর গ্যাসকোইনের জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হয়েছিল। ইংলিশ পত্রিকা দা ইন্ডিপেন্ডেন্ট লিখেছিল, “পল গ্যাসকোইনের আগে কেউ এভাবে কেঁদে কখনও জাতীয় নায়ক বা নিশ্চিত কোটিপতি হয়েছে? চমৎকার, আপনি কাঁদুন, পুরো বিশ্ব আপনার সঙ্গে কাঁদবে।”
ফ্রান্স ১৯৯৮

দেশের হয়ে ১৪২ ম্যাচের কেবল একটিতেই জালের দেখা পেয়েছেন লিলিয়ান থুরাম। ক্লাব ফুটবলে ১১ মৌসুমে মাত্র একটি গোল করেছিলেন তিনি। বিস্ময়করভাবে ফ্রান্সের ভীষণ প্রয়োজনের সময় তিনি করলেন জোড়া গোল।
এই ডিফেন্ডার ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমি-ফাইনালে হয়ে ওঠেন জাত স্ট্রাইকার। একবার ডান পায়ে, আরেকবার বাম পায়ে গোল করে ২-১ ব্যবধানে স্বাগতিকদের ফাইনালে নিয়ে যান তিনি।
জোড়া গোলের খবরে মাঠেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তার মা। এই অভিজ্ঞতা জানিয়ে থুরাম বলেন, “মা গ্যালারিতে ছিলেন। লোকজন তাকে বলেছিল, তার ছেলে প্রথম গোল করেছে। তখন তিনি কিছুই বোঝেনি। পরে যখন জানাল ফের গোল করেছি, তিনি অজ্ঞান হয়ে যান। আমি মোটেও মজা করছি না।”
কোরিয়া-জাপান, ২০০২

কোয়ার্টার-ফাইনালে চোট পেয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ ছাড়ার পর, ব্রাজিলের তারকা ফরোয়ার্ড রোনালদোকে নিয়ে হচ্ছিল নানা আলোচনা। তিনি সেমি-ফাইনালে খেলতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে হচ্ছিল নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হওয়া এই ফুটবলার নিজের হেয়ারস্টাইলই বদলে ফেলেন।
“সবাই আমার পায়ের চোট নিয়ে কথা বলছিল, প্রশ্ন তুলছিল সেমি-ফাইনালে খেলতে পারব কি-না। এই প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে পড়ি। সে কারণে ওইভাবে চুল কেটেছিলাম। সতীর্থদের জিজ্ঞেস করছিলাম, কেমন লাগছে? তারা বলেছিল, বিশ্রি। তুমি এইভাবে রাখতে পারো না।”
“আমি ভেবেছিলাম, ‘এটা কাজ করবে।’ সাংবাদিকরা রীতিমতো আমার চোট ভুলে গিয়ে, চুল নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল। আমি অবশেষে স্বস্তি পেয়েছিলাম।”
সেমি-ফাইনালে তুরস্কের বিপক্ষে রোনালদোর একমাত্র গোলে ফাইনাল নিশ্চিত করে ব্রাজিল। এরপর রোনালদো বলেন, “এটা সত্যিই কুৎসিত ছিল। সেসব মায়েদের কাছে আমি ক্ষমা চাচ্ছি, যারা সন্তানের হেয়ারস্টাইল আমার মতো দেখেছিলেন।”
২০০৬, জার্মানি
উচ্চতার দিক থেকে ফাবিও কান্নাভারোর সঙ্গে জার্মানির পের মের্টেস্কারের তুলনাই চলে না। কিন্তু ২২ সেন্টিমিটার উচ্চতার ব্যবধান কান্নাভারো ঘুচিয়ে দেন সেমি-ফাইনালের যোগ করা সময়ে। মের্টেস্কারের সঙ্গে জিতে হেডে জার্মানির একটি ক্রস ক্লিয়ার করেন ইতালি অধিনায়ক।
হেড থেকে বল পান জার্মানির লুকাস পোডলস্কি। তার কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে কান্নাভারো। যেটা থেকে ম্যাচে নিজেদের দ্বিতীয় গোল পায় ইতালি। জার্মানির হৃদয় ভেঙে জায়গা করে নেয় ফাইনালে।